AkramNadwi

শিরোনাম : বুদ্ধির প্রান্তর ও বিতর্কের ডেকে আনা সংশয়

শিরোনাম : বুদ্ধির প্রান্তর ও বিতর্কের ডেকে আনা সংশয়

|৩০ |নভেম্বর|২০২৫|

بسم الله الرحمن الرحيم.
গতকাল “নদওয়াতুল ইলমি ওয়াল আদাবি ”–এর আসরে মুনাজারা বা বিতর্কের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আমি বলেছিলাম :
“পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে প্রমাণ করে দেখাতে পারে, খোদা আছেন; আবার এমনও কেউ নেই, যে নির্দ্বিধায় দেখাতে পারে, খোদা নেই। যদি তা সম্ভব হতো, তবে সব দার্শনিকই আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন; অথচ আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে সর্বাধিক সংশয় তো দার্শনিকদেরই মধ্যে। এই বিষয়ে বিতর্ক কখনোই আল্লাহ-অস্বীকারকারীদের ক্ষতি করে না; বরং তাদেরই উপকার হয়, আর সংশয়ের আগুন আরও উসকে ওঠে।”

কয়েকজন বিদ্বান পাঠক এ কথার আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তাঁদের অনুরোধেই নিচের পংক্তিগুলো লিখছি।

মানব-চিন্তার বিশাল আকাশে আজ পর্যন্ত এমন কোনো ব্যক্তিত্ব উদ্ভাসিত হয়নি, যিনি কেবল নিরেট বুদ্ধির শক্তিতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে স্রষ্টার অস্তিত্ব পরীক্ষিত সত্যের মতোই নিশ্চিত। আবার এমন কোনো মস্তিষ্কও দিগন্তে দেখা যায়নি, যে নিরঙ্কুশ যুক্তির আলোকে ঘোষণা করতে পারে, এ মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টাই নেই।

যদি এ প্রশ্নটি এমন হতো, যা মানব-বুদ্ধি পদার্থবিদ্যার স্বতঃসিদ্ধ বা গণিতের স্বয়ংপ্রমাণ সত্যের মতো সোজা পথে সমাধান করতে পারত, তাহলে পুরো দর্শন-জগৎ একমুখী হয়ে যেত। সব হাকিম, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক, হয় সবাই একযোগে খোদা-প্রমাণের পতাকা উঁচু করতেন, না হয় সমস্বরে তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করতেন।

কিন্তু দার্শনিকতার ইতিহাস যেন এক নীরব সাক্ষীর মতো ঘোষণা করে,
“আল্লাহর অস্তিত্ব, এ প্রশ্ন মানব-বুদ্ধির কাছে এক গভীর, অদৃশ্য রহস্য; না শতাব্দীর সাধনা তা খুলতে পেরেছে, না সহস্র মনের তীক্ষ্ণতা তা উন্মোচন করতে পেরেছে।”

যখন কোনো দার্শনিক এ প্রশ্নে হাত দেয়, তখন সে অনুভূত-জগতের আলোকিত পথ ছেড়ে এমন এক চিরন্তন অদৃশ্য জগতে প্রবেশ করে, যেখানে বুদ্ধির আলো ক্ষীণ হয়ে আসে, আর বিমূর্ত ধারণার জটিল বৃত্তে সে নিজেকেই আবদ্ধ পায়। এজন্যই দার্শনিকদের ভুবনে এই প্রশ্নকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি দ্বিধা, বিস্ময় ও সংশয় ঘনীভূত হয়। তাঁদের কাছে বিষয়টি শুধু কঠিন নয়, বরং এমন এক বিস্তৃত স্বার্থক এলাকা, যার সামনে বুদ্ধির ঝুলি ফাঁকাই মনে হয়।

আসল কথা হলো,
আল্লাহর সন্ধান বুদ্ধির সরল সড়ক নয়; এটি এমন এক যাত্রা, যেখানে বুদ্ধি সঙ্গী হয় ঠিকই, কিন্তু পথপ্রদর্শক নয়। পথ দেখায়, ফিতরত, অন্তরের স্বচ্ছ বোধ, হৃদয়ের স্বাক্ষ্য এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার আলো।

বুদ্ধির কাজ কুলগত সত্য আবিষ্কার, কোনো নির্দিষ্ট সত্তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়। বুদ্ধি বলতে পারে “প্রত্যেক নির্মাণের একটি নির্মাতা থাকে।” কিন্তু এটি একটি সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা; এর ওপর অসংখ্য আপত্তি তোলা যায়। তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও, এটি কেবল মন গড়া একটি কাঠামো। এই নীতিকে তাজমহলের মতো নির্দিষ্ট বাস্তবে প্রয়োগ করা বুদ্ধির যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগমাত্র, বাস্তব তথ্যের প্রমাণ নয়। তাজমহল যে শাহজাহান নির্মাণ করেছেন, তা বলে ইতিহাস, বুদ্ধি নয়।

ঠিক এভাবেই,
বুদ্ধি আপন শক্তি দিয়ে সর্বোচ্চ এ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে, এই জগৎ নিশ্চয়ই কোনো স্রষ্টার সৃষ্টি। কিন্তু সেই স্রষ্টা কেমন, এক কিনা অনেক, কোন ধর্মের উপস্থাপনা সত্য, এসব বুদ্ধির আওতার বাইরে। নির্দিষ্ট, গুণসম্পন্ন এক বাস্তব সত্তার প্রমাণ খুঁজে পাওয়া বুদ্ধির কাজ নয়, এ দরজা খোলে ফিতরাত এর ডাকে, হৃদয়ের সাক্ষ্যে, আত্মার সুরে, ঈমানের আলোয়।

এ বিষয়ে আমি আমার আরও কিছু রচনায় বিস্তারিত লিখেছি।

কিন্তু মুনাজারার কোলাহলে বুদ্ধিকে একা দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। ফিতরত, হৃদয়, অন্তর্দৃষ্টি, সব নীরব করে রাখা হয়। তখন আল্লাহ-অস্বীকারকারীরা জটিল বাকবিন্যাস, ভাষার কসরত আর যুক্তির বাহারি প্রদর্শন দিয়ে সুবিধা নেয়; আর সংশয়ের আগুন নিবে যাওয়ার বদলে আরও দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।

বিতর্ক তার প্রকৃতিতে সংঘাতের মঞ্চ। সেখানে সত্যের সন্ধান নয়, বাক্‌জয়ের অহংকার, তর্কদক্ষতার তলোয়ার, প্রদর্শনের চমক- এসবই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে মনের গহিনে থাকা সামান্যতম সন্দেহও গাঢ় অন্ধকারে পরিণত হয়। নিশ্চিততার প্রদীপ ক্রমশ নিভে আসে। আর সত্যপিপাসু পথিক সত্যের দিকে এগোবার বদলে সংশয়ের ঘূর্ণাবর্তে আরও গভীরে তলিয়ে যায়।

সেজন্যই অন্তর্দৃষ্টি, সম্পন্ন জ্ঞানীরা যুগে যুগে বলে এসেছেন :
সত্যস্রষ্টার পরিচয় বুদ্ধির কলমের নিব থেকে নয়; তা লাভ হয় হৃদয়ের আলো থেকে, ফিতরতের সরল দেখায়।

বুদ্ধি মানুষকে সত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় ঠিকই; কিন্তু সেই দোরগোড়া পেরিয়ে যে সীমাহীন পথ খুলে যায়, তা অতিক্রম করে বিশ্বাসের দৃঢ় পদক্ষেপ, আর পথ চিনে নেয় ঈমানের আলোকিত দৃষ্টি।

যারা নিখাদ বুদ্ধির ক্ষীণ প্রদীপ হাতে নিয়ে সীমাহীন সত্যের সন্ধানে নামেন, তারা অধিকাংশ সময়ই বিস্ময়ের অন্ধকারে হারিয়ে যান।
সুতরাং বলা নিঃসন্দেহে বলা যায়,
এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক শুধু অস্বীকারের আগুনই উস্কে দেয়, আর বিশ্বাসের ভেতর অস্থিরতার ঢেউ তোলে।

সত্যের নাগাল পেতে যেই অন্তরের কোমল স্বচ্ছতা প্রয়োজন, যেই নীরব ধ্যান, যেই অন্তর্মূখী মনোযোগ, তা কোলাহলমুখর বিতর্কে কখনোই পাওয়া যায় না। সেখানে থাকে উচ্ছ্বাস, বিরোধ, সংগ্রাম, কিন্তু সেখানে নেই সেই শান্ত, নীরব অনুধ্যায়, যেখানে আল্লাহ্‌-পরিচয়ের আলো ফোটে।

এখানেই এসে বুদ্ধির সীমানা শেষ হয়,
আর শুরু হয় মারিফাতের জাহান,
স্রষ্টার মহিমা ও সৌন্দর্যের সেই অপরূপ উপত্যকা, যেখানে হৃদয়ই পথ দেখায়, আর আত্মা হয় পথিক।

———-

ক্যাটাগরি : ফিলোসোফি, ইসলামি চিন্তাধারা,
মূল : ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7783

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *