তারা বলল: আমরা আজ আপনার “যে আসরগুলো ভুলিনি” শিরোনামের প্রবন্ধটি পড়েছি, আর তার মতোই পূর্বে কিছু প্রবন্ধও পড়েছি, যেখানে আপনি আপনার হাদীসশাস্ত্রের বন্ধুদের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক নবায়নের কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা সেখানে এমন এক বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি যা আমাদের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়ের।
আমি বললাম: কী এমন বিষ্ময়ের বিষয় পেয়েছ? কেননা তোমাদের এই বিস্ময়ই বরং আমার কাছে বিস্ময়ের!
তারা বলল: আপনি একদিকে নেজাম ইয়াকুবি, মুহাম্মদ ইবন নাসির আল-আজমি, মাজদ মাক্কি, মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ আল-রাশিদ প্রমুখ প্রবীণ আলেমদের কথা বলেছেন, যারা আপনার চেয়ে বয়সে বড়। আবার অন্যদিকে উমর আন-নাশুকাতি, মুহাম্মদ জিয়াদ আত-তাকলা, আহমদ আশউর, মুহাম্মদ ওয়ায়েল আল-হানবলি, আবদুল্লাহ আত-তুম, মুহাম্মদ ইবন আবি বকর বাদীব, সালমান আবি গুদ্দা ও তুরকি আল-ফাদলির মতো তরুণ আলেমদেরও উল্লেখ করেছেন, যারা আপনার চেয়ে ছোট।
এর চেয়েও বড় কথা, এরা জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা ও দেশ—সব দিক থেকেই ভিন্নতর। তাছাড়া ফিকহি মত ও চিন্তাগত ধ্যানধারণাতেও একে অপরের সঙ্গে গভীর বিরোধ আছে। অথচ আপনি দাবি করেন, এরা সবাই আপনার সত্যিকারের বন্ধু, আপনার প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী!
তাহলে বলুন তো—এই ভিন্ন বংশ ও দেশে জন্ম নেওয়া, এই ভিন্ন মত ও ভাবনার মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কেমন করে সম্ভব? আপনি কি চান আমরা এমন বিপরীত ও পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো মেনে নিই? আপনি তো নিজেই আমাদের শিখিয়েছেন—নিজের বুদ্ধিকে সম্মান করতে, এবং কথাগুলোকে তাদের সঠিক মানদণ্ডে বিচার করতে, যা আল্লাহ স্থির করেছেন।
আমরা এতদিন আপনার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে নীরব থেকেছি, আপনার সঙ্গে তর্কে যাইনি। কিন্তু আজ ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, পাত্র উপচে পড়েছে।
আমি বললাম: তোমাদের এই কথা আমাকে গভীরভাবে আঘাত করেছে, এবং সত্যিই আমার ধৈর্য ফুরিয়ে এসেছে।
তারা বলল: আপনি কি নিজেকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে ভাবেন? মনে করেন আপনার প্রতি আপত্তি তোলা যায় না?
আমি বললাম: আমার ব্যক্তিত্ব তেমন বড় নয় যে কেউ তার দিকে তীর নিক্ষেপ করলে তা সহ্য করতে না পারি। কিন্তু আমি সহিষ্ণুতা ভুলে যাই, যখন দেখছি আমার বন্ধুদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে, তাদের গুণাবলি ছোট করা হচ্ছে।
তারা বলল: যদি আপনি আমাদের সন্দেহ দূর করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন, তবে আপনার বন্ধুদের প্রতি সব অভিযোগ মুছে যাবে। তাহলে বলুন—কী যুক্তিতে আপনি তাদের পাশে দাঁড়ান?
আমি বললাম: তোমাদের সমস্যাটা এই যে, তোমরা বিষয়গুলোকে কেবল পার্থিব ও বস্তুগত দৃষ্টিতে দেখো। তাই তোমাদের আত্মা যতক্ষণ নিচের স্তরে আবদ্ধ, ততক্ষণ তোমরা উচ্চতর গুণাবলি বুঝবে না।
তারা বলল: তাহলে কি আরেক ধরনের দৃষ্টি আছে, যা এই বৈপরীত্যকে ঘৃণা করে না?
আমি বললাম: অবশ্যই আছে—একটি আধ্যাত্মিক ও স্বর্গীয় দৃষ্টি, যা তোমাদের পার্থিব ও জাগতিক দৃষ্টির বিপরীত।
তারা বলল: আপনার এই কথা তো আমাদের কাছে আরও বিস্ময়কর! তবে বলুন, এই স্বর্গীয় দৃষ্টিটা আসলে কী?
আমি বললাম: শুনো এবং বুঝো,
তোমরা কি আল্লাহর এই আয়াত পড়নি—
“আর যখন তোমার প্রভু আদমের সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের উপর সাক্ষ্য করালেন—‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’ তারা বলল, ‘অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’” (সূরা আল-আরাফ: ১৭২)
তারা বলল: অবশ্যই পড়েছি।
আমি বললাম: এবং কি তোমরা আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. বর্ণিত সেই হাদীস শুননি, যা আহমদ, হাকিম ও মুফাসসিরগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন—
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহ আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তার সমস্ত বংশধরদের আরাফায় বের করে আনলেন, তারপর তাদের সামনে ছড়িয়ে দিলেন সূক্ষ্ম কণার মতো, এবং সরাসরি তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’…”
তারা বলল: অবশ্যই শুনেছি।
আমি বললাম: তাহলে জানো, আমাদের জন্ম এই দুনিয়ায় আলাদা সময় ও স্থানে হলেও, আকাশে আমাদের প্রথম উপস্থিতি হয়েছিল একই সময়ে। জাগতিক দৃষ্টিতে আমাদের বংশ, জাতি, দেশ ও ভাষা ভিন্ন; কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে আমরা একসূত্রে গাঁথা—আমাদের পিতা আদম, আমাদের প্রভু আল্লাহ, আর আমাদের সূচনা ও গন্তব্য—সবই এক, জান্নাতুল ফিরদাউস।
আর তোমরা যে মাযহাবের ভিন্নতার কথা বলছো—এটা কেবল তোমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা। শুনে নাও রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর সেই হাদীস, যা বুখারী ও মুসলিম উভয়েই বর্ণনা করেছেন—
“আত্মাগুলো হচ্ছে একত্রিত সৈন্যদল। যারা পরস্পর পরিচিত, তারা মিলিত হয়; আর যারা অপরিচিত, তারা ভিন্ন হয়ে যায়।”
তাই আমরা (যদিও বয়স, বংশ, দেশ ও মতভেদে আলাদা) আত্মার দিক থেকে একরূপ, ঐক্যবদ্ধ এক সেনাদল। আমরা পরস্পরকে চিনেছি, তাই মিলেছি; আমরা মিলেছি, তাই একে অপরের সান্নিধ্যে আনন্দিত হয়েছি।
আমি বললাম: এখন কি তোমাদের চোখ থেকে পর্দা সরেছে, না এখনো নিজেদের অন্ধত্বে সুখ পাচ্ছো?
তারা বলল: আমরা বুঝেছি আপনি কী বলতে চেয়েছেন, আমাদের ভুলও দূর হয়েছে, সংশয়ও কেটে গেছে। তবে যদি আপনি আরও কোমল ভাষায়, মাধুর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বলতেন, আরও ভালো লাগত।
আমি বললাম: প্রতিটি অবস্থারই উপযুক্ত ভাষা থাকে—
আর কখনো কখনো, যখন কোরআন যথেষ্ট হয় না, তখন লোহা ব্যবহার করতে হয়।
——————–
ক্যাটাগরি : শিক্ষা, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7570