লোকেরা বলল: আমাদের মৃত্যু সম্পর্কে বলুন—এমনভাবে স্মরণ করিয়ে দিন, যেন তা উপদেশ হয়ে হৃদয়কে কোমল করে তোলে, কারণ আমাদের অন্তর আজ কঠিন, শুষ্ক ও অনমনীয় হয়ে গেছে।
আমি বললাম: তোমরা সৌভাগ্যবান, আল্লাহপ্রদত্ত প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়েছ—যে তোমরা মৃত্যুর কথা জানতে চাও, তাকে স্মরণ করে শিক্ষা নিতে চাও। কারণ মৃত্যুর কথা জানতে বা তা নিয়ে ভাবতে আগ্রহী হয় কেবল সেই মানুষ, যাদের প্রতি সৌভাগ্য অনুকূল ও আল্লাহর তাওফিক সঙ্গে থাকে। আমি তোমাদের থেকে কোনো অংশে কম নই—আমিও মৃত্যুর স্মরণে, আমার শেষ পরিণতির চিন্তায় কতটা দরিদ্র ও অভাবী! হায়, আমাদের এই অবহেলা আর মত্ততা!
আমরা পচন আর ধ্বংসকে ঘৃণা করি, মৃত্যুকে ভয়ে তাড়িয়ে দিই—কিন্তু জীবনের সুবাস ও মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে তা-ই আঁকড়ে থাকি, যেন তাতে মগ্ন ও মোহিত এক প্রেমিক। আমরা মৃত্যুকে ভুলে গেছি, যেন কখনো কারো মৃত্যু চোখে পড়েনি! অথচ মৃত্যুই সবচেয়ে ভয়াবহ, আকস্মিক ও অনিবার্য বিপদ—প্রত্যেক মানবসন্তানের ওপর প্রহরীর মতো সতর্ক দৃষ্টি রেখে আছে, এক নির্দিষ্ট সময়ে আত্মা কুড়িয়ে নিতে প্রস্তুত। এ এমন এক জলাশয়, যেখানে একদিন না একদিন আমাদের সবারই যেতে হবে—যার স্বাদ তিক্ত, যার পান গভীরভাবে কষাটে।
আমরা বারবার হারিয়ে যাই, আবার ফিরে আসি; কিন্তু একদিন আমরা হারিয়ে যাব, আর আর ফিরে আসব না। আমরা যেই মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছি, শিগগিরই সেই মাটিতেই ফিরে যাব।
আমি আরও বললাম: আমরা আমাদের আমোদ-ফুর্তি, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর মিথ্যা গর্বে ডুবে আছি—কিন্তু মৃত্যু আমাদের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে, নিরন্তর, অবিরাম। আমরা পেছন ফিরে পালাই, ভয় পাই, তার দিকে তাকাতেও সাহস করি না, প্রস্তুত তো হইই না। অথচ আমাদের পূর্বসূরি ধার্মিক ও সৎ ব্যক্তিরা, তাদের তাকওয়া ও ভক্তি সত্ত্বেও, মৃত্যুকে নিয়ে ভীত থাকতেন।
বেশর আল-হাফি যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, কেউ তাঁকে বলল: “হে আবু নসর, মনে হচ্ছে আপনি জীবনকে ভালোবাসেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, কারণ আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন।”
সুফিয়ান সাওরি যখন তাঁর কোনো সঙ্গী ভ্রমণে যেতেন, তখন বলতেন: “যদি কোথাও মৃত্যু বিক্রির জন্য পাও, আমার জন্য কিনে আনো।” কিন্তু যখন তাঁর নিজের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, তিনি বললেন: “আমরা মৃত্যুকে কামনা করতাম—কিন্তু যখন তা সামনে এলো, বুঝলাম এটি কত কঠিন!”
লোকেরা বলল: আমাদের আরও কিছু বলুন মৃত্যুর বিষয়ে—এমন কিছু যা আমাদের উপকারে আসে, আমাদের সচেতন করে, আমাদের ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়।
আমি বললাম: মৃত্যুর আলোচনা এমন এক বিষয়, যা হৃদয়ের গভীরে নানা সুর তোলে। আমি তা সংক্ষেপে চারটি বিষয়ের মধ্যে উপস্থাপন করছি—
প্রথমত, মৃত্যু এই দুনিয়াকে উন্মোচন করে দিয়েছে, এর আসল রূপ প্রকাশ করে দিয়েছে, এর মুখোশ ছিঁড়ে ফেলেছে। এই পৃথিবীর জন্য এতটাই দোষ যথেষ্ট—এটা এমন এক আবাস, যেখানে সবাই মরতে আসে। এখানকার প্রতিটি বাসিন্দা মৃত্যুর দিকে আহ্বান করছে আমাদের। আমরা এখানে স্থায়িত্ব চাই, কিন্তু যত দীর্ঘ হয় জীবন, ততই কষ্ট বাড়ে, শরীর ক্ষয়ে যায়, আসে রোগ, বিপদ, পরীক্ষা—তারপর মৃত্যু, কবর, হিসাব, কর্মের বই, আর জ্বলন্ত আগুনের মুখোমুখি হওয়া।
আমরা এই দুনিয়া থেকে যা-ই অর্জন করি না কেন, তার সঙ্গে আসে দুঃখ, চিন্তা আর ক্লান্তি। বলো তো, যে মানুষ নিজেই মৃত্যুর লক্ষ্যবস্তু—সে কীভাবে এই জীবনের ভোগে আনন্দ পেতে পারে? কোথায় আমাদের পিতা, আর তাঁদের পিতারা? কেউই রক্ষা পায়নি। মৃত্যু প্রতিটি সুখের মাঝেই বিষ ঢেলে দিয়েছে।
আমাদেরও কেটেছে কোমল, আরামদায়ক কিছু দিন—যৌবনের সবুজ, সতেজ ডালে ভরপুর দিনগুলো। কিন্তু সেই দিন গেছে। একদিন আমরা মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করব, এমন যন্ত্রণা যা আগের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের স্মৃতি মুছে দেবে।
হাসান বসরি একবার এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন, যিনি মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। তাঁর মুখে মৃত্যুর কষ্টের ছাপ দেখে হাসান বসরি ঘরে ফিরে এলেন, মুখের রঙ পাল্টে গেছে। পরিবার বলল, “হে ইমাম, খানাপিনা করুন।” তিনি বললেন, “তোমরা তোমাদের খাবার খাও। আল্লাহর কসম, আজ আমি এমন এক দৃশ্য দেখেছি যে, যতদিন বাঁচব, ততদিন তার জন্যই প্রস্তুতি নিতে থাকব।”
দ্বিতীয়ত, মৃত্যু হলো জাগরণের ঘণ্টা—একটি সতর্কবার্তা। যে মানুষ মৃত্যুকে চিনে, সে সাবধান হয়, সংযত হয়, জীবনের খেলাধুলা ও অহংকার থেকে দূরে থাকে। মৃত্যুই দুনিয়ার মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—যদি তারা তার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত! মানুষ যদি মৃত্যুর বার্তা বুঝতে পারত, তবে তাদের হৃদয়ে ক্রন্দন আর অনুতাপের ঢেউ উঠত।
আমরা খেলায় মত্ত, অথচ মৃত্যু আমাদের পিছু নিয়েছে গভীর আন্তরিকতায়। মৃত্যুর ছায়ায় কি ভোগবিলাস সম্ভব? না, কখনো নয়। কত আশ্চর্য, মানুষ নিজের বিভ্রান্তি আর ভোগলোলুপতায় হারিয়ে আছে—যখন বিপদ নিঃশব্দে তাদের চারপাশে ঘুরছে, আর মৃত্যু তাদের উপর দৃঢ়ভাবে আঘাত হানছে!
সময়কে দেখো—এটি কেমন দ্রুত বদলায়। এর স্বচ্ছতা ঘোলা হয়, যৌবন বার্ধক্যে রূপ নেয়। আমরা এই দুনিয়ার ভোগ-সম্পদে প্রতিযোগিতা করি, অথচ দুনিয়া বারবার আমাদের বিপদের কথা সতর্ক করে দেয়। যেন চোখের সামনে দৃশ্য—আমাদের স্বজনরা আমাদের তুলছে, কবরে নিয়ে যাচ্ছে, আর মাটির স্তর একের পর এক আমাদের উপর ঢালা হচ্ছে।
তবু আমরা প্রশ্ন করি না—আর কতদিন সূর্য উঠবে, অস্ত যাবে, রাত-দিন আসা-যাওয়া করবে, আর আমরা তাতে নিমগ্ন থাকব? আহা, যদি অন্তত অন্যের মৃত্যু দেখে জেগে উঠতাম! যদি জানাজা আর কাঁধে বহন করা মৃতদেহ দেখে শিক্ষা নিতাম!
ইমাম আওযায়ী বলতেন: আমাদের উদ্দেশে উমর ইবনু আবদুল আজিজ লিখেছিলেন—“যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ করে, সে দুনিয়া নিয়ে অল্পেই সন্তুষ্ট হয়।”
আবু বকর ইবনু আইয়াশ বলতেন: “যদি কারও একটি দিনার হারিয়ে যায়, সারাদিন সে বিলাপ করে, ‘ইন্না লিল্লাহ! আমার দিনার হারাল!’ অথচ জীবন হারিয়ে যাচ্ছে, তবু সে বলে না—‘আমার জীবন হারাল!’”
কখনো এমন মানুষও ছিল, যারা সময়কে আল্লাহর আমানত মনে করত। তারা প্রতিটি ক্ষণকে কাজে লাগাত, প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত ও নেক আমলে ভরিয়ে রাখত।
তৃতীয়ত, মৃত্যু মুমিনদের জন্য রহমত—তাদের জন্য, যারা নেক কাজ সঞ্চয়ে প্রতিযোগিতা করে, কিয়ামতের ভয় রাখে, সেই দিনের আশঙ্কায় কাঁপে, যেদিন সব গোপন প্রকাশ পাবে। মৃত্যু হলো এক স্থানান্তর—যেখানে আল্লাহর নিকটে সৎ বান্দারা পৌঁছে যায়, তাদের জীবন সেখানে প্রশান্ত ও নির্মল হয়ে ওঠে।
সৌভাগ্য তার, যার হৃদয় বিনয়ী হয়ে তার রবের দিকে ফিরে আসে। ধন্য সে মানুষ, যার আত্মা অনুতাপে গলে, যার দৃষ্টি আল্লাহমুখী। যারা ইহসানে সুন্দর হয়, তাদের জন্য পরিণতিও ইহসান—আর কবরের জন্য সর্বোত্তম পাথেয় হলো ইবাদত ও তাকওয়া।
কী আশ্চর্য! জাহান্নামের ভয় থাকা সত্ত্বেও তার রক্ষক ঘুমিয়ে থাকে! জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও তার প্রত্যাশী নিশ্চিন্তে ঘুমায়!
আহমদ আল-জারিরি বলেন: “আমি এক শুক্রবার জোনাইদ বাগদাদিকে দেখতে গিয়েছিলাম, তিনি মৃত্যুযন্ত্রণায় ছিলেন, তবু কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। আমি বললাম, ‘এই অবস্থায়ও কুরআন?’ তিনি বললেন, ‘আমার চেয়ে বেশি এর উপযুক্ত আর কে? এখন তো আমার আমলের পৃষ্ঠা বন্ধ হতে চলেছে।’”
চতুর্থত, মৃত্যু মুমিনদের জন্য সান্ত্বনা।
তাদের শত্রুরা দেশময় দাপট দেখালেও, তারা এতে দুঃখ পায় না।
আমরা দেখেছি—কত রাজা, কত শাসক—সময়ের পালায় যাদের ক্ষমতা উলটে গেছে।
তারা সবাই বিলীন হয়ে গেছে, তাদের কেউ আজ অবশিষ্ট নেই।
মৃত্যু তাদের টেনে নিয়েছে, কেউ গেছে সকালে, কেউ সন্ধ্যায়।
সবাই চলে গেছে সেই গর্তে, যা তাদের ঢেকে রেখেছে মাটির নিচে।
মৃত্যু এসে তাদেরও আঘাত করেছে, যদিও তারা ছিল উঁচু দুর্গে সুরক্ষিত।
অহংকারী শাসকরা যখন জীবিত ও শক্তিশালী ছিল, তখন হঠাৎ মৃত্যু তাদের ডাক দিল,
তারা মাথা নত করে সাড়া দিল—অসহায়, পরাজিত হয়ে।
তারা রেখে গেল প্রাসাদ, অট্টালিকা, অগাধ ধনসম্পদ—সব নিঃসঙ্গ ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলো।
মৃত্যু তো পরোয়া করে না, সে কাকে নেয়।
রাজা, সেনানায়ক, মঞ্চের বক্তা, অশ্বারোহী যোদ্ধারা—
সবাই আজ মাটির নিচে, পরিত্যক্ত আবাসের অধিবাসী, হাড়ে পরিণত।
আগের প্রজন্মগুলো কোথায়?
তাদের ঘরবাড়ি শুনশান,
তাদের সঙ্গীরা ছিন্নভিন্ন,
আর অবশিষ্ট আছে কেবল জীর্ণ হাড়ের গন্ধ।
তারা বলল, “আপনি তো আমাদের মনে ভয় ও আতঙ্ক ভরিয়ে দিলেন।”
আমি বললাম, “মানুষের পক্ষে মৃত্যুকে ভয় করা স্বাভাবিক।
তোমরা কখনো সময়কে নিরাপদ মনে করো না—এটা সবসময় মানুষের জীবনে পালাবদল আনে।
নিজেদের ইচ্ছার দাস হয়ো না,
এই দুনিয়ায় আনন্দে নিমগ্ন থেকো না যেখানে অধিবাসীরাও মৃত্যুর বন্দি হয়ে পড়ে।
আল্লাহ সম্পর্কে কোনো ভ্রান্তি তোমাদের ধোঁকা না দিক।
তোমরা আল্লাহর কিতাব পড়ো এবং মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করো,
যাতে বুঝতে পারো—প্রত্যেক প্রাণই তার কর্মফল পাবে,
এবং সেই নির্দিষ্ট দিনের মুখোমুখি হবেই।”
আবু সুলাইমান আদ-দারানী বলেন:
আমি একবার সাধ্বী উম্মে হারূনকে জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি কি মৃত্যু ভালোবাসো?”
তিনি বললেন, “না।”
আমি বললাম, “কেন?”
তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, যদি আমি কোনো মানুষকেই অমান্য করতাম, তবে তার সাক্ষাতকেও ভয় পেতাম।
তাহলে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সাক্ষাতকে কীভাবে নির্ভয়ে চাইতে পারি!”
তারা বলল, “তবে আমাদের উপদেশ দিন।”
আমি বললাম,
“আমি তোমাদের ও নিজেকে উপদেশ দিচ্ছি—
মৃত্যুর প্রস্তুতি নাও,
নিজের কামনা ও পাপের বিরুদ্ধে লড়ো,
নিজের অপরাধগুলো স্মরণ রাখো।
তোমাদের ইচ্ছা যেন তোমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে।
অলস হয়ো না, নফসকে সংশোধন করো,
ইবাদত, আনুগত্য, সংযম ও তাকওয়ায় নিজেকে অভ্যস্ত করো।
আবু হাজিম বলেছেন:
‘যে কাজের জন্য তুমি মৃত্যুকে অপছন্দ করো,
সেই কাজ পরিত্যাগ করো—
তারপর কবে মারা যাবে, তাতে কোনো ভয় নেই।’
ইবরাহিম আত-তাইমি বলেন:
‘আমি নিজেকে জান্নাতে কল্পনা করলাম—ফল খাচ্ছি, নদী থেকে পানি পান করছি।
তারপর নিজেকে জাহান্নামে কল্পনা করলাম—যেখানে যাক্কুম খাচ্ছি, পুঁজ পান করছি।
তারপর নিজের সঙ্গে বললাম, “তুমি কী চাও?”
আমার মন বলল, “আমি দুনিয়ায় ফিরে যেতে চাই, যেন সৎকর্ম করতে পারি।”
তখন আমি বললাম, “তুমি তো এখনই সেই সুযোগে আছো—তবে কাজ করো।”’
——————–
ক্যাটাগরি : আত্মশুদ্ধি, আখলাক, শিক্ষা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7367