Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : মাটির অহংকার।

মানুষের হৃদয়ে আছে এক অস্থির আকাঙ্ক্ষা—তার প্রাচীন নিবাসের জন্য এক গভীর টান, সেই আদি আবাসের প্রতি, যেখান থেকে তাকে নামিয়ে আনা হয়েছিল—যেদিন সে সৃষ্টি হয়েছিল এক মুঠো মাটি থেকে এবং প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া রূহে। সেই মুহূর্ত থেকেই মানুষ বসবাস করছে এক নীরব টানাপোড়েনে—পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে, নিজের দুর্বলতা ও পরিপূর্ণতার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে, নিজের ক্ষণস্থায়িত্বের সচেতনতা ও অমরত্বের তৃষ্ণার মধ্যে।
এই দ্বন্দ্বই তার গতির মূল, তার মর্মবেদনার রহস্য। মানুষ যা কিছু করে—গৌরব অর্জন, জ্ঞান অনুসন্ধান, যুদ্ধ কিংবা শান্তি, ইবাদত কিংবা সৃষ্টি—সবই সেই হারানো স্থান ফিরে পাওয়ার এক মরিয়া প্রয়াস, যেটি থেকে সে নেমে এসেছিল মাটির পৃষ্ঠে।

হায়! মানুষের কী দুর্ভাগ্য, কী করুণ ভুলে যাওয়া—যখন সে স্মরণ হারায় যে, সে আসলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধূলিকণা, অথচ কল্পনা করে বসে যে, সে নিখাদ আলো! তখন সে মানুষ থেকে পরিণত হয় এক চলমান মূর্তিতে, আল্লাহর খলিফা থেকে হয়ে যায় তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী, তাঁর আজ্ঞাবহ বান্দা থেকে হয়ে যায় তাঁর অবাধ্য, অকৃতজ্ঞ ও কৃতঘ্ন এক সত্তা।

তখন তার ভেতর জন্ম নেয় এক ক্ষুদ্র ‘ইলাহ’ বা মিথ্যা প্রভু —যে আসমানে নয়, বরং বাসা বাঁধে তার অহংকারে ভরা বুকে। সে মানুষের মাঝে হাঁটে নিজেকে মুকুট পরানো এক সম্রাট ভেবে, টিকে থাকে তাদের ভয়ের ওপর, খায় তাদের নীরবতার ভাত। ভাবে, আনুগত্যই ইবাদত, ভয়ই আনুগত্যের প্রকাশ, আর জনতার করতালিই তার পবিত্রতার স্বীকৃতি।
সে মুখগুলোকে দেখে নিজের আয়না ভেবে, মানুষের আর্তনাদকে শোনে নিজের শাসনের সঙ্গীত ভেবে। ভাবে, চারপাশে যে রক্ত ঝরছে, তা তার নামে বইছে গৌরবের নদী। অথচ সে বোঝে না—প্রতিটি রক্তবিন্দু তার জন্য লজ্জার পাথরে খোদাই করে যাচ্ছে অভিশাপের ইশতেহার, আর প্রতিটি নিপীড়িতের আর্তচিৎকার তার জন্য ইতিহাসের বুকে খনন করছে এক অন্ধকার কবর।

সে চেয়েছিল ‘ইলাহ’ হতে, অথচ বোঝেনি—ইলাহ মানুষদের ওপরে নয়, তাদের ভেতরে অবস্থান করেন। মহত্ত্ব হাতের শক্তিতে নয়, অন্তরের ক্ষমায়। যে অন্যদের ওপরে উঠতে চায়, তাকে প্রথমে সত্যের সামনে বিনয়ী হতে হয়।

যারা নিজেদের পূজা করেছে, তারা তা করেছে কারণ তারা আল্লাহকে দেখেনি। আর যারা আল্লাহকে ভয় করেছে, তারা এতটা মূর্খ হয়নি যে নিজেদেরই উপাসনা শুরু করে।
অত্যাচার কোনো প্রাসাদ নয়, যা ইট-পাথরে গড়ে ওঠে; তা হলো এক আত্মা, যা গড়ে ওঠে অহংকারে।
অন্যায় শুরু হয় না যখন তলোয়ার ওঠে, বরং যখন হৃদয় বন্ধ হয়ে যায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ ভুল মানুষ তখনই করে, যখন শক্তি পাওয়ার পর ভাবে—এই শক্তির উৎস সে নিজেই। ভুলে যায়—দয়া ছাড়া শক্তি আসলে এক ছদ্মবেশী দুর্বলতা। যে শাসন ভয় দিয়ে টিকে থাকে, তার আয়ু ততটুকুই, যতক্ষণ রাত টিকে থাকে ভোরের আগে পর্যন্ত।

স্বৈরাচার কেবল নিষ্ঠুরতা থেকে জন্মায় না—বরং মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে, এই সত্য ভুলে যাওয়া থেকে যে আমরা সবাই দুর্বল, এবং প্রকৃত মহত্ত্ব তখনই পূর্ণ হয়, যখন মানুষ বিনয় শিখে নেয়।

আমি দেখেছি তাদের যুগে পৃথিবী শোকে কালো পোশাক পরেছে, নদীগুলো বইছে ভুলে যাওয়া নামের ভারে নুয়ে পড়ে, আকাশ চুপচাপ তাকিয়ে আছে—যেন অপেক্ষা করছে কখন মানুষের চোখ ক্লান্ত হবে অন্ধকারে।
দেখেছি শহরগুলো নিজেদের ধ্বংসাবশেষ তুলছে দুহাত তুলে, যেন করুণা প্রার্থনা করছে।
দেখেছি শিশুরা বড় হচ্ছে ভয়ের মধ্যে—যেভাবে ঘাস গজায় পাথরের ফাঁকে।

তবুও, সৃষ্টির গভীরে লুকিয়ে আছে এক নীরব আশার নিশ্বাস, যা বলে—আলো কখনো নিভে না; কেবল আড়ালে থাকে, যখন চোখ অন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাস ঘুমায় না, যদিও তাকে ঢেকে রাখে নীরবতা। সত্য মরে না, যদিও তার বুকের ওপর দিয়ে হাঁটে অত্যাচারীদের পা।

যে ভেবেছে সে অমর, সে ঘুমিয়েছে বিনাশের কোলে। আর যে মাটির ওপর গর্বভরে হেঁটেছে, সে ফিরে গেছে সেখানেই—নত মাথায়।
অমরত্ব দেওয়া হয় না তাকে, যে হাতে তোলে তলোয়ার, বরং তাকে—যে তুলে ধরে নিজের আত্মাকে।
মর্যাদা লেখা হয় না বিজয়ীদের দপ্তরে, বরং তাদের হৃদয়ে—যারা সত্য চিনেছে এবং তার যন্ত্রণা নীরবে বয়ে নিয়েছে মহত্ত্বের সঙ্গে।

সত্যিকারের গৌরব আসে ক্ষমতা দিয়ে নয়, বরং নিজের ভেতরের পশুর মুখোমুখি হয়ে মানুষ থাকা দিয়ে—এক এমন জগতে, যা প্রতিদিন আরও কলুষিত হচ্ছে।

যে মানুষ নিজের দুর্বলতাকে চিনে, সে পরাজিত হয় না, কারণ সে নিজেকে রেখেছে করুণার আশ্রয়ে। আর যে ভাবে সে অজেয়, সে তারই কল্পনার ভারে ডুবে যায় শূন্যতায়।

ইলাহ হতে চেও না—মানুষ হও, তাতেই যথেষ্ট আল্লাহর নিকটে যাওয়ার জন্য।
তুমি যে মহত্ত্বের খোঁজে আছ, তা তোমার ওপরে নয়, তোমার ভেতরে—তোমার চোখের করুণায়, তোমার দুর্বলতার সততায়, তোমার নীরবতার শান্তিতে; যখন তুমি বুঝে ফেলো যে প্রকৃত শক্তি জয়ের মধ্যে নয়, ক্ষমার প্রশস্ততায়।

গৌরব দেখা যায় না সিংহাসনে, শোনা যায় না বক্তৃতায়; তা অনুভূত হয় কোমলতায়, পরিচিত হয় সততায়, বেঁচে থাকে ভালোবাসায়।

যখন তুমি এই উপলব্ধিতে পৌঁছাবে, তখন তুমি আর কারো সামনে সেজদা করবে না, কেউ তোমাকে দাস বানাতেও পারবে না—কারণ তখন তুমি আল্লাহকে পাবে তোমার ভেতরেই, তোমার ক্ষমতায় নয়, তোমার শান্ত আলোকিত আত্মায়, যা তোমাকে মনে করিয়ে দেয়—তুমি মাটির তৈরি, কিন্তু তোমার ভেতরে আছে আকাশের নিশ্বাস।

এইখানেই মানুষ সম্পূর্ণ হয়—যখন সে অন্যদের ওপরে ওঠে না, বরং নিজের অবস্থান বুঝে নেয় আসমান ও জমিনের মাঝখানে।
তখন সে জানে—দুর্বলতা কোনো লজ্জা নয়, বরং আলোর পথে এক সোপান; পতন কোনো সমাপ্তি নয়, বরং ফিরে আসা নিজের উৎসের দিকে।

যে নিজের সীমা চেনে, সে-ই মুক্ত।
যার অন্তরে বিনয় বাস করে, সেই-ই মহান।
মহত্ত্ব এ নয় যে তুমি পৃথিবীকে বশে আনবে, বরং তুমি নিজেকে ঠিক করবে।

এই সৃষ্টিজগতে সবই নশ্বর—শুধু টিকে থাকে যা ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আর যে ভালোবাসে, তার ইলাহ হতে হয় না—কারণ সে ততটাই কাছে চলে আসে স্রষ্টার, যতটা সে দয়া দেখায় সৃষ্টির প্রতি।

——————–

ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, আখলাক, তাজকিয়াহ।
—-
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
—-
https://t.me/DrAkramNadwi/7231

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *