AkramNadwi

শিরোনাম : হাদিসের ধারাবাহিক বর্ণনা। ————–

শিরোনাম : হাদিসের ধারাবাহিক বর্ণনা।
——————–

অপরিহার্য জ্ঞান ও তাত্ত্বিক জ্ঞান।
হাফিজ ইবনে হাজর নুযহাতুন্নজর (শরহে নুখবাতুল ফিকার)-এ লিখেছেন:
“তাওয়াতুর বর্ণনা অপরিহার্য জ্ঞান দেয়, অর্থাৎ এমন জ্ঞান যার প্রতি মানুষ স্বভাবতই বাধ্য, এবং তা অস্বীকার করতে অক্ষম।” (পৃষ্ঠা 44)

মাশহুর হাদিস প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
“যারা একে তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানকারী বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে আছেন উস্তাদ আবু মনসুর বাগদাদি ও উস্তাদ আবু বকর ইবনে ফুরক প্রমুখ।” (পৃষ্ঠা 54)

‘নযর’ (যুক্তি ও বিচার) সংজ্ঞায় তিনি বলেন:
“অর্থাৎ কিছু জানা বা অনুমেয় বিষয়ের এমন বিন্যাস, যার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান বা অনুমান লাভ করা যায়।” (পৃষ্ঠা 45)

অপরিহার্য জ্ঞান ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের পার্থক্য তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
“অপরিহার্য জ্ঞান প্রমাণ ছাড়াই জ্ঞান দেয়, আর তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রমাণের ভিত্তিতে জ্ঞান দেয়। অপরিহার্য জ্ঞান প্রত্যেক শ্রোতার হয়, কিন্তু তাত্ত্বিক জ্ঞান কেবল সেই ব্যক্তির হয় যার মধ্যে বিচার-বিবেচনার যোগ্যতা আছে।” (পৃষ্ঠা 45)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন:
“তারা জ্ঞানকে অপরিহার্য ও তাত্ত্বিক এ দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তাত্ত্বিক জ্ঞান নির্ভর করে অপরিহার্য জ্ঞানের ওপর। অপরিহার্য জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যা মাখলুকের ভেতরে এমনভাবে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। কাজি আবু বকর ইবনে তইয়্যিব প্রমুখ এভাবেই সংজ্ঞা দিয়েছেন।” (মাজমু’ আল-ফাতাওয়া 13/70)

আমি বলি: জ্ঞানকে অপরিহার্য ও তাত্ত্বিক—এভাবে ভাগ করা দার্শনিক ও যুক্তিবিদদের সবচেয়ে দুর্বল এবং বিভ্রান্তিমূলক মত, যাকে অনুসরণ করেছেন অনেক কালামবিদ ও উসুলবিদ। এর ভিত্তি হলো জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত ধারণা। আসলে এমন কী জ্ঞান আছে, যা মাখলুকের অন্তরে জন্মগতভাবে এমনভাবে বিদ্যমান থাকে যে সে কখনোই তা থেকে মুক্তি পায় না?

আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“আল্লাহ তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন, তখন তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ ও হৃদয় বানালেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (সুরা নাহল: ৭৮)

অতএব মানুষ জ্ঞানহীন অবস্থায় জন্মায়। কিন্তু তাকে দেওয়া হয় জ্ঞানার্জনের মাধ্যম—ফিতরা, পাঁচটি ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও ওহি। সুতরাং মানুষের প্রকৃত বিভাজন হলো—

ফিতরী জ্ঞান, এবং অর্জিত জ্ঞান।

অর্জিত জ্ঞান আবার তিন ভাগে বিভক্ত—
১. ইন্দ্রিয়ভিত্তিক জ্ঞান,
২. বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞান,
৩. আসমানি জ্ঞান (যা নবীদের কাছে ওহি আকারে নাজিল হয়েছে)।

এই বিভাজন পূর্বসূরিদের কাছে স্পষ্ট ছিল। বিস্তারিত আলোচনা অন্যত্র রয়েছে।

নিশ্চিত জ্ঞান:

হাফিজ ইবনে হাজর বলেন:
“প্রথমত, তাওয়াতুর হাদিস, যা নিশ্চিত জ্ঞান দেয়।” (পৃষ্ঠা ৪৪)
তিনি আরও বলেন:
“ইয়াকিন হলো এমন দৃঢ় বিশ্বাস, যা সত্য ও বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।” (পৃষ্ঠা ৪৪)

আমি বলি: ইয়াকিন কেবল বাইরের কোনো বস্তুর উপস্থিতিতে জন্মায় না। যেমন—দৃষ্টির ক্ষেত্রে শুধু বস্তু সামনে থাকলেই হয় না; দর্শকের সুস্থ চোখ থাকতে হয়, তার ও বস্তুটির মাঝে কোনো আড়াল না থাকতে হয়, সে ইচ্ছাকৃতভাবে দেখতে চাইতে হয় এবং বারবার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একই নিয়ম সব ধরনের জ্ঞানের জন্য প্রযোজ্য।

জ্ঞান কেবল শব্দ ও পরিভাষা মুখস্থ করা নয়; বরং সেগুলোকে বাস্তবতার সাথে যুক্ত করা। এই যুক্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘ, কঠিন এবং বারবার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঘটে।

সুতরাং মূলত জ্ঞান হলো অনুমানমূলক। কারণ বাস্তবতা—তা বস্তুগত হোক বা বিমূর্ত—মানুষের উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বড়। এমনকি মানুষের আঙুল নিয়েই বিশেষজ্ঞরা যতটা জানেন, তার বাইরে অনেক কিছু অজানা থেকে যায়। তাই জ্ঞান-অর্জনের শুরুতেই ইয়াকিন পাওয়া সম্ভব নয়। ইয়াকিন নির্ভর করে ‘জ্ঞাতব্য’-এর ওপর নয়, বরং ‘জ্ঞাতা’-র ওপর।

উদাহরণস্বরূপ: আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আ দোআকারী যখন আমাকে ডাকে, তখন তার দোআ কবুল করি।” (বাকারা: ১৮৬)
এটি নিশ্চিত সত্য। কিন্তু একজন মানুষ যখন দোআ করে, এবং বারবার তার অভিজ্ঞতা হয়, তখনই তার জ্ঞান দৃঢ় হয়, কখনো ইয়াকিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এ কারণেই মুহাদ্দিসগণ হাদিসের ‘তাওয়াতুর’ বা ‘শোহরাত’-এর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি; তাদের লক্ষ্য ছিল হাদিসের সহিহ সনদ। কেননা হাদিস সহিহ হলে সেটিই জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য হয়, আর ফিকহ, বোঝাপড়া ও আমলের মাধ্যমে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।

তাহলে জ্ঞান সর্বদাই অনুমান থেকে শুরু হয়। যে ব্যক্তি মনে করে—সে কোনো কিছুতে কাজ করবে না, যতক্ষণ না তার পূর্ণ ইয়াকিন হবে—সে আসলে অসম্ভব কিছুর আশা করছে।

তাওয়াতুর :

হাফিজ ইবনে হাজার তাওয়াতুর প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন, সংজ্ঞা দিয়েছেন ও শর্ত বর্ণনা করেছেন। (পৃষ্ঠা 41-43)

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *