হন, তাঁর নিজের মহিমা কমে না; বরং সম্পূর্ণ সাহিত্যের ঐতিহ্য উজ্জ্বল হয়। মীর ও গালিবের মাঝে এই বন্ধন উর্দু কবিতার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার का এক অপরূপ অধ্যায়।
আলোচনা এগোতে লাগল, মনে হতে লাগল মীর যেন আমাদের মাঝেই বসে আছেন—কখনো দিল্লির কোনো নির্জন গলি বেয়ে, কখনো লক্ষনৌ-র স্তব্ধ সন্ধ্যায় অতীত স্মরণে, কখনো নিজের কবিতার শক্তিতে মৃদু হাসিতে, আবার কখনো সেই হৃদয় দেখে যা দুনিয়ার হাতে বারবার আহত হলেও কবিতার হাতে বারবার জীবন্ত হয়েছে।
মহফিলে এক বিশেষ ধরনের নীরবতা; এটি অমনোযোগের নীরবতা নয়, নিবিড় মনোযোগের। সবাই শুনছে, কবিতার গভীরে নামছে, কোথাও হাসছে, কোথাও মাথা দোলাচ্ছে। অনুভব করলাম, উর্দু এখনও জীবিত, আর তার প্রাণ বইয়ের পৃষ্ঠা নয়, এমনই আসরে, যেখানে মানুষ তাদের সময় থেকে খানিকটা সময় ভাষা, সাহিত্য ও স্মৃতির নামে উৎসর্গ করে।
‘অদবী বৈঠক’-এর প্রকৃত সৌন্দর্য বুঝি এখানেই—এটি কেবল সাহিত্যিক আয়োজন নয়, এক সাংস্কৃতিক সমাবেশ। চায়ের পেয়ালা, বন্ধুদের কথকতা, কবিতার ধ্বনি, শ্রোতাদের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এমন পরিবেশ, যেখানে ভাষা শুধু প্রকাশের মাধ্যম নয়, এক অভিন্ন ঘর। এই ঘর আলোকিত হয় প্রদীপে নয়, হৃদয়ে।
নির্ধারিত সাড়ে ছয়টায় অনুষ্ঠান সমাপ্তির কাছাকাছি এলে শ্রোতারা আরো শোনার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। আমার জন্য সেটাই ছিল সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। এক বক্তার বড় সম্মান—সময় ফুরালেও শ্রোতার মন বলে, ‘আর বলুন, এখনই মীরের জগৎ থেকে ফিরবেন না।’
মন চেয়েছিল চলতে থাকুক। মীরের কবিতার আরেক ভুবন অবশিষ্ট, দিল্লির অলিগলি পুরো দেখা হয়নি, মীরের প্রেমের আগুনে আরও কিছুক্ষণ হাত সেঁকতে ছিল, গালিবের স্বীকারোক্তির প্রতিধ্বনি এখনও বাতাসে ভেসে ছিল। কিন্তু দেহ সায় দিল না; ক্লান্তি আস্তে আস্তে নিজের প্রাপ্য চাইছিল। আমাকে ক্ষমা চাইতে হল।
সেই ক্ষমা সহজ ছিল না। যখন সামনে এমন শ্রোতা বসে, যারা শুনতে চায়, বক্তার মুখ থামতে চায় না। হৃদয়ের ডানায় সীমা নেই, দেহের ডানায় আছে। মন চায় রাতভর মীরের সাথে হাঁটি, দেহ একসময় বলে, ‘এবার থামো।’
মহফিল শেষে বেরোতে বেরোতে মনে হল, আমি মীর নিয়ে কথা বলিনি; মীরের অজুহাতে নিজের সময়, ভাষা আর অন্তরের সাথে আলাপ করেছি। তিন শতাব্দী দূরের এক কবি সেই সন্ধ্যায় সত্তরের বেশি মানুষের মাঝে আবারও কণ্ঠ ফিরে পেয়েছিল। মহৎ সাহিত্যের এটাই তো অলৌকিকতা—সময় তাকে বার্ধক্য দান করে না। যুগ বদলায়, শহর বদলায়, টোন বদলায়, তবু সৎ কবিতা দাঁড়িয়ে থাকে—এক নির্জন শহরের শেষ প্রদীপের মতো।
আসর শেষ, সবাই ঘরে ফিরল, চায়ের পেয়ালা শূন্য, আলাপের স্বর স্তিমিত—কিন্তু মীর রইলেন। সম্ভবত এটাই সাহিত্যসভা সফল হওয়ার চিহ্ন—সভা ভাঙে, কিন্তু আলোচ্য হৃদয়ে থেকে যায়।
ফিরে যেতে যেতে আমার ভেতর ছিল মীরের দিল্লি, তাঁর উজাড় নগর, তাঁর নিঃসঙ্গতা, তাঁর কাব্যিক অহং, আর গালিবের সেই স্বীকারোক্তি—
“যে মীরকে মানে না, সে কাব্যে নির্জলা।”
মীরকে স্মরণ মানে বোধহয় সেই মানুষকে স্মরণ, যে ভেঙে পড়েও কবিতা বলে গেছে; যে শহর হারালেও ভাষা হারায়নি; যার চারপাশে সময় যতই ধ্বংসের স্তূপ রেখেছে, সে নিজের শব্দে এমন এক জগৎ গড়ে তুলেছে, যেখানে আমরা আজও প্রবেশ করতে পারি।
মহফিল পেরিয়ে গেছে, মীর রয়ে গেছেন; আর হয়তো যতদিন উর্দু ভাষায় হৃদয় স্পন্দিত থাকবে, ততদিন কোনো না কোনো প্রান্তে মীরের সুর শোনা যাবে।
———
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ: এই নিবন্ধটি AI দ্বারা অনুবাদ করা হয়েছে।
https://t.me/DrAkramNadwi/10499
ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভীর প্রবন্ধের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল:
https://WhatsApp.com/channel/0029VbAxp2qGpLHHqQ3LoY0w