AkramNadwi

শিরোনাম : হে হাররান! (ইউরোপীয় ফতোয়া ও গবেষণা কাউন্

শিরোনাম : হে হাররান!
(ইউরোপীয় ফতোয়া ও গবেষণা কাউন্সিলের সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দলসহ আমার সফর উপলক্ষে, মঙ্গলবার ৪ জমাদিউস্-সানি ১৪৪৭ হি.)
—–
|২৫|১১|২০২৫|

হে হাররান!
তুমি যেন এক খোলা দরজা, যার পাশ দিয়ে সময় হার মানে, আর যার মহিমা নিভে যেতে জানে না। তুমি এমন এক প্রশস্ত বক্ষ, যার মাঝে ধারণ করে আছো প্রজ্বলিত প্রজ্ঞার উত্তরাধিকার; যেখানে আজও প্রতিধ্বনিত হয় মহাজ্ঞানীদের নিঃশ্বাস, কখনো মৃদু ফিসফিসে, কখনো জগতের কোলাহলের ওপর উঠে যাওয়া প্রজ্ঞার উচ্চ স্বর। যেন তোমার মাটি চিন্তা করে, আর বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে জ্ঞানের সুবাস, যা সময়কে দেয় এমন এক বার্তা, যা কখনো ক্লান্ত হয় না, কখনো দীপ্তি হারায় না।

হে হাররান!
তুমি কি কেবল একটি পাঠ্যবইয়ের নাম? কখনোই না। তুমি এক জাতির স্মৃতি, যুগযুগান্তরের ঐতিহ্য, এমন এক ভাণ্ডার যেখানে প্রজ্ঞাবানরা পথ চলেছে; আর তারা চলে গেলেও তোমার বুকে রেখে গেছে এমন ছাপ, যা কখনো মুছে যায় না—যেমন আলো গভীরতম ছায়াতেও নিজের রেশ রেখে যায়।

তুমি সেই দোলনা, যেখানে আরব বুদ্ধিবৃত্তির নবজাত বীজ শুয়ে ছিল। সেখান থেকেই সে জেগে উঠেছিল, আরও পরিণত হয়ে, আরও গভীরভাবে এই বিশ্বকে বোঝার ক্ষমতা নিয়ে; যেন তোমার মাটি থেকেই সে সময়ের পরীক্ষিত পরিপক্বতা শুষে নিয়েছিল।

তুমি এমন এক ইতিহাস, যা মুঠোবন্ধ হতে চায় না; এমন এক কণ্ঠস্বর, যা যুগকে বলে ওঠে, এখানেই তো জাগ্রত হয়েছিল প্রথম প্রশ্নগুলো; এখানেই আঁকা হয়েছিল দর্শনের প্রাথমিক রেখা; এখানেই চিন্তা শুরু করেছিল তার দীর্ঘ, দুরন্ত যাত্রা। তুমি, হে হাররান, একটি খোলা বই। তোমার মাটি যেন কালি, পাথরগুলো পৃষ্ঠার মতো, আর তোমার অন্তর দিয়ে প্রমাণিত হয়, এ পৃথিবী নিজেই হতে পারে হাজারো বইয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এক মহাবিদ্যালয়।

হে হাররান!
দূরত্ব আমাদের মাঝে প্রাচীর তুললেও, হৃদয়ের টান আমাকে তোমার দিকেই ফিরিয়ে আনে, যেমন প্রেমিককে টানে প্রিয়জনের ছায়া। তুমি দূর প্রান্তে থাকলেও তোমার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তোমার প্রতি সেই আকুলতা এমন শক্তি, যা মানুষকে পথ চলতে বাধ্য করে। আর সত্যি বলতে, জীবনও আপন মহিমা হারায়, যদি মানুষ তার প্রিয়জনের কাছে পৌঁছাতে না পারে কিংবা সেই প্রিয়জন তাকে স্মরণেও না আনে।

পশ্চিম যা ইচ্ছে করুক ,
তার আকাশছোঁয়া শিল্প, গগনচুম্বী নির্মাণ আর কর্কশ যান্ত্রিক অগ্রগতির গর্বে মত্ত থাকুক।

আর পূর্ব?
তারা যেটুকু নিয়ে গর্ব করে, সেটুকুই করুক।

ভারত গর্ব করুক তার তাজমহল নিয়ে, সেই শুভ্র মার্বেলমন্ডিত স্থাপনা, যা এক প্রেমকথাকে অমর কাহিনিতে রূপ দিয়েছে।

মিশর তার পিরামিড নিয়ে বড়াই করুক,
যে বিশাল স্থাপনাগুলো সময়ের বুক চিরে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বয়স, ক্ষয় বা মৃত্যু কোনটিই তাদের নাগাল পায় না।

আর জাহিল কবিরা,
তারা দাঁড়িয়ে থাকুক তাদের ভগ্ন কুটিরের ধ্বংসাবশেষে,
অতীতের হারানো ঘরের স্মৃতি খুঁজে চোখ ভিজিয়ে।
প্রতিটি ভাঙা পাথরে যেন আবার জেগে ওঠে সেই প্রাচীন বেদনা,
যা মানুষকে তার অতীতের দরজায় ফিরে যেতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক জাতিরই রয়েছে তাদের গর্ব, কখনো উচ্চকোলাহলপূর্ণ বস্তুতন্ত্র, কখনো গভীর আত্মমগ্নতার স্পন্দন।
কিন্তু তুমি, হে হাররান…
তোমার গৌরব কারো মতো নয়, কারো সাথে তুলনীয় নয়।

তুমি ইতিহাসের জননী, চিন্তার উৎস, সেই বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় যেখানে মানবমস্তিষ্কের উচ্চতম দীপ্তিগুলো জন্ম নিয়েছিল, যাদের মূল্য ধনসম্পদে মাপা যায় না, যাদের যুগে-যুগে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।

আমি যখন ঘুরে বেড়াই তোমার প্রাচীন পথে, তোমার বাতাসে পাই যুগযুগের সুবাস,
পাথরের ফাঁক দিয়ে যেন উঠে আসে নীরব কোনো আলো।
আর তোমাকে শুনি বলতে:
এখানে সত্য বাস করেছিল,
এখানে জ্ঞানের নিশ্বাস ছিল,
এখানেই জন্ম নিয়েছিল এমন চিন্তা, যা নিজ আলোর বাইরে কোনো বাঁধন মানে না।

হে হাররান!
তোমার গর্ভ থেকেই বেরিয়েছিল الرد على المنطقيين
, যা ভেঙে দিয়েছিল কৃত্রিম যুক্তির পর্দা, আর যুক্তিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তার যথার্থ স্থানে, যখন সে ওহির ওপর উঠতে চাইছিল।
এ বই বলেছিল, প্রজ্ঞা শব্দের চাকচিক্যে নয়, সত্যের স্বচ্ছতায়; আর মস্তিষ্ক যখন ওহির আলোতে জ্বলে ওঠে, তখন সে অন্ধকার ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে, ঠিক যেমন ভোরের আলো রাত্রির পর্দা ফুঁড়ে দিনের সূচনা ঘটায়।”

আর তোমার কপাল থেকেই উদ্ভূত درء تعارض العقل والنقل – সে মহাগ্রন্থ, যেখানে বিবেক আর ওহি সাক্ষাৎ করেছে প্রেমিকের মতো, বিশ্বাসে পূর্ণ, আস্থায় ভরা।
সে জানিয়ে দিয়েছে, সত্য কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না; সোজা ফিতরাত যখন স্থির থাকে, তখন সে ওহির আলোকে চিনে ফেলে, আর বুদ্ধির সত্য সুরও শুনে নেয়; হৃদয় সাক্ষ্য দেয়, সত্য তো এক, কখনো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয় না।

হে হাররান!
তোমার প্রতিটি পাথর যেন স্মরণ করায় ইবনে তাইমিয়ার পায়ের ছাপ; প্রতিটি ছায়া যেন স্মরণ করায় সেইসব মানুষকে, যারা নিশ্চিত সত্যের সন্ধানে নিজের বুদ্ধিকে সাগরের মতো বহমান রেখেছিল।
তোমার ভেতরেই মানুষ উপলব্ধি করে, জ্ঞান মানে জীবন, কেবল পাঠ্য নয়; চিন্তা মানে আত্মা, কেবল শব্দ নয়।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *