Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : অজ্ঞতার পাঠশালা

শিরোনাম : অজ্ঞতার পাঠশালা<br>

|১৩|০১|২০২৬|

আজ মীর সাহেব এলেন। দরজাটি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সকালের নীরবতা কেঁপে উঠল। যে নীরবতা প্রতিদিন স্বাভাবিক ও নিরীহ মনে হয়, আজ হঠাৎ’ই তা ভারী, গম্ভীর ও অপ্রত্যাশিত মেঘে রূপ নিল। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, যেন বাতাসও কাঁপছে, আর আলো তার উষ্ণতা লুকিয়ে নিয়েছে, যাতে মীর সাহেবের আগমনের সঙ্গে কেবল গাম্ভীর্য আর ঘন নীরবতাই ছড়িয়ে থাকে।

আমি মীর সাহেবকে আগে কখনো এত দৃঢ়, এত অটল, এত শান্ত অথচ ভীতিকর ভঙ্গিতে দেখিনি। নীরবতা আমার চারপাশে ঘুরছিল, আমার চিন্তাগুলোকে চেপে ধরছিল, প্রতিটি শব্দের আগে ভাবনাকে ঘিরে ফেলছিল, যেন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁস ক্রমেই আরও আঁটসাঁট হয়ে আসছে।

আমরা নাশতা করলাম, কিন্তু প্রতিটি লোকমা, প্রতিটি চুমুক যেন একেকটি নীরব বিচার হয়ে দাঁড়াল। কথার সুতো কোথাও বাঁধা পড়ছিল না। প্রতিটি বাক্য মীর সাহেবের গাম্ভীর্যের ঘন মেঘে হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি একের পর এক বিষয় পাল্টানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি কথা তাঁর সংক্ষিপ্ত “হুঁ”, “হ্যাঁ”-এর দেয়ালে আঘাত খেয়ে নিষ্ফল হয়ে ফিরছিল। আমার সব দার্শনিক উদ্যোগ আগেই যেন কবর দেওয়া হয়েছিল।

হতাশ হৃদয়ে আমি এমন এক প্রসঙ্গ তুললাম, যা না আলেমদের মর্যাদার উপযুক্ত, না সাহিত্যিকদের গাম্ভীর্যের সঙ্গে মানানসই। আমি বললাম, আমি মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কে দৌড়াতে যাই। প্রায়ই এমন হয়, কোনো কুকুর তার মালিকের হাতছাড়া হয়ে আমার পেছনে দৌড়ায় আর ঘেউঘেউ করতে থাকে। যখন সে আমার দিকে তেড়ে আসে, তখন ভয় আর বিস্ময় একসঙ্গে আমার ভেতরে জেগে ওঠে।

মীর সাহেবের চোখে গভীর এক গাম্ভীর্য ছিল, যার ভেতর হালকা ব্যঙ্গের ঝিলিকও লুকিয়ে ছিল। আমি বললাম, “মীর সাহেব! আজ আপনার কাছে না কোনো জ্ঞানগর্ভ কথা আছে, না কোনো সাহিত্যিক রসিকতা। শুধু এটুকু বুঝিয়ে দিন, কোনো কুকুর আমাকে দেখে ঘেউঘেউ করলে আমি কী করব?”

প্রশ্নটি শেষও হয়নি, তার আগেই মুফতি সাহেব কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঠিক সময়ে সভায় প্রবেশ করলেন। তাঁর আগমন ছিল ঝড়ের মতো। সঙ্গে সঙ্গে সভাপতির আসন দখল করে বসলেন। হেসে বললেন, “আরে ভাই! এটাও আবার কোনো প্রশ্ন নাকি? কুকুর ঘেউঘেউ করলে তুমি-ও ঘেউঘেউ করো!”

এই অপ্রত্যাশিত উত্তরে মীর সাহেব সামান্য মাথা নিচু করলেন, আর আমি যে যুক্তিবিদ্যা পড়েছিলাম, সব একত্র হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। আমি মুফতি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, “মুফতি সাহেব! আর যদি কুকুর আমাকে কামড়াতে আসে, তখন কী করব?”

তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “ভাই! তুমি কি যুক্তিবিদ্যা বা উসূলুল ফিকহে কিয়াসের অধ্যায় পড়োনি? পড়ে থাকলেও কী মনে থাকবে! তোমাদের পাঠ্যক্রম এমন, না তাতে নীতিমালা আছে, না বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা; শুধু শব্দের প্রতিধ্বনি আর বুদ্ধিজীবী সাজসজ্জা।”

আমি বললাম, “মুফতি সাহেব! ব্যঙ্গ করবেন না, উত্তর দিন। আর যদি আটকে যান, স্বীকার করে নিন। কথাকে পাঠ্যক্রম পর্যন্ত টেনে আনবেন না।”

তিনি হেসে বললেন, “এগুলোই তো আমার উত্তরের অংশ। প্রবাদ আছে, বুদ্ধিমানকে ইশারাই যথেষ্ট। এখন পরিষ্কার করে বুঝে নাও: কুকুর ঘেউঘেউ করলে তুমি-ও ঘেউঘেউ করো, আর সেই কিয়াসেই, কুকুর কামড়ালে তুমি-ও তাকে কামড়াও!”

এ কথা বলে তিনি এমন অট্টহাসি দিলেন, যেন কোনো প্রাচীন দুর্গ জয়ের ঘোষণা দিচ্ছেন। তাঁর ভঙ্গি স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, তিনি আমাদের বোঝাতে চান, আমরা নাকি এত সামান্য কথাও বুঝতে অক্ষম।

মীর সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। বললেন, “মানুষ আর কুকুরের মধ্যে তো পার্থক্য আছে। আর যখন সাধারণ মানুষ আর কুকুরের মধ্যেই পার্থক্য থাকে, তখন ভদ্র মানুষ আর কুকুরের মধ্যে পার্থক্য কতটাই না বেশি!”

মুফতি সাহেব দার্শনিক ব্যঙ্গের সুরে বললেন, “কখনো কখনো ‘নাওয়ারা তলখ্‌তর মি‌যন’- এর ওপর আমল করতে হয়।
(মানে- “নরম কথা কাজ না করলে, আরও কটু ভাষায় জবাব দাও”) বিতর্কে আমাদের তো এটাই শেখানো হয়েছে, জিততে হলে চিৎকার করতে হয়, গালি দিতে হয়, আর কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি কিছু।”

কথা তো ছিল একেবারে সাধারণ, একটি কুকুরকে নিয়ে। কিন্তু আপনারা কেন সেটিকে উসূলুল ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা, বিতর্ক, কিমিয়া, সিমিয়া আর রমলের গোলকধাঁধায় টেনে নিলেন? প্রতিটি কথার ভেতর সেই যুদ্ধ, সেই জয়-পরাজয়ের মানসিকতা, জয়ের লালসা এতটাই চেপে বসেছে যে মনে থাকল না, আসলে কে কার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর মীর সাহেব আমার দিকে ফিরে বললেন, “তুমি কি এটুকুও জানো না, শূকরের সঙ্গে কাদায় কুস্তি লড়া মানুষ, জিতলেও দুর্গন্ধময়ই থাকে?”

আমি বললাম, “তাহলে আমি কী করব?”
তিনি বললেন, “কিছুই না। কুকুর ঘেউঘেউ করলে তাকে তার ঘেউঘেউ করতে দাও, তুমি ঘেউঘেউ কোরো না। সে যদি আরও জোরে ঘেউঘেউ করে, তুমি আরও বেশি নীরব হয়ে যাও। তার দিকে তাকাবে না, তার শব্দকে গুরুত্ব দেবে না, তার অস্তিত্বকে তোমার মনোযোগের কেন্দ্র বানাবে না। এমন হয়ে যাও, যেন তুমি তার আওয়াজ শুনোইনি। কারণ নীরবতা কখনো কখনো এমন এক জবাব, যা সব শোরগোলকে আপনাতেই অর্থহীন করে দেয়।”

মুফতি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “এটা সম্পূর্ণ ভুল পরামর্শ! এটা তো মানুষের প্রকাশ্য পরাজয় আর কুকুরের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ঘোষণা। এতে অপমান ছাড়া আর কিছু নেই। যারা জবাব দিতে ও পাল্টা জবাবের কৌশল শিখতে পারেনি, তারা এভাবেই সারাজীবন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়ে থাকে।”

তারপর ঔদ্ধত্যপূর্ণ হাসি আর ব্যঙ্গমাখা কণ্ঠে বললেন, “মীর সাহেব! আপনাদের ভেতরে দাসত্বের মানসিকতা গেঁথে আছে। আপনারা বড়জোর ডাক্তার বা অধ্যাপক হতে পারেন, কিন্তু আল্লামা হতে পারবেন না।”

মীর সাহেব অত্যন্ত শান্ত, স্থির ও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, “অজ্ঞতার মকতবের আল্লামা হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার নেই। তাছাড়া ভারতে ‘আল্লামা’ শব্দটির মর্যাদা যেভাবে পদদলিত হয়েছে, তাতে গর্ব করার মতো কিছুই আমি দেখি না। নিয়াজ ফতেহপুরী আগে মাওলানা নামে পরিচিত ছিলেন, দাড়ি কামানোর পর তিনি আল্লামা হয়ে গেলেন।”

এভাবেই বৈঠক শেষ হলো। কিন্তু তার প্রভাব মন ও হৃদয়ে এমনভাবে ছড়িয়ে রইল, যেন গম্ভীর মেঘ দীর্ঘদিন আকাশে ঝুলে থাকে। এটা শুধু একটি কুকুরের গল্প ছিল না, না ছিল শুধু মীর সাহেব ও মুফতি সাহেবের টুকরো টুকরো ব্যঙ্গাত্মক বাক্য। বরং এটা ছিল এক পূর্ণাঙ্গ দর্শন, জীবনের দর্শন, মানুষের অহংকার, আর অজ্ঞতার মকতবের শিক্ষা।

আমি ভাবলাম, মানুষের জগৎ কতই না বিচিত্র। জ্ঞানের অহংকারে মানুষ নিজেকে উঁচু মনে করে, অথচ একটি কুকুরের ঘেউঘেউ, একটুখানি বাস্তবতা, তাদের সম্পূর্ণ দর্শনকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। আর যারা নিজেদের জ্ঞানের ভিত্তিতে অন্যকে উপদেশ দেয়, তারাও সেই কুকুরেরই সমান, শুধু তাদের হাসি, শব্দ আর ভঙ্গি একটু বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ।

এভাবেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি অজ্ঞতার মকতবের আল্লামা হব না। না নিজের অহংকার বাড়াব, না কোনো কুকুর কিংবা মানুষের ঘেউঘেউয়ে প্রভাবিত হব। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা লুকিয়ে থাকে নীরব বোধ আর শান্ত প্রজ্ঞার ভেতর।

আর কুকুর? কুকুর তো চিরকালই ঘেউঘেউ করে যাবে।

————–
ক্যাটাগরি : সমালোচনা, ইসলামি চিন্তাধারা, ফিলোসোফি
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8177

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *