AkramNadwi

রোজার ফিদয়া

রোজার ফিদয়া

|০৪ |ফেব্রুয়ারি| ২০২৬|

❖ প্রশ্ন

সম্মানিত শায়খ, অনুগ্রহ করে ফিদয়া সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলুন। ফিদয়া বলতে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো বোঝানো হয়। কিন্তু এ খাবার কি এক বেলার হবে, নাকি দুই বেলার? রোজার ক্ষেত্রে যেহেতু সেহরি ও ইফতার, দুটি সময় জড়িত, তাই এ বিষয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়। কিছু আলেম এক বেলার খাবারের কথা বলেন, আবার কেউ কেউ দুই বেলার খাবারকে ফিদয়া হিসেবে দেওয়ার কথা বলেন। কোনটি সঠিক ও উত্তম ? আর ফিদয়া কি যে কোনো মিসকিনকে দেওয়া যাবে, সে রোজাদার হোক বা না হোক, নাকি অবশ্যই রোজাদারকেই দিতে হবে?

আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

❖ উত্তর

রোজার ফিদয়া সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি দেখা যায়, বিশেষ করে এটি এক বেলার খাবার, না দুই বেলার, তার মূল কারণ হলো ফিদয়ার প্রকৃত শরঈ বাস্তবতা পুরোপুরি অনুধাবন না করা। বিষয়টি যদি ফিকহি ও শরঈ প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়, তবে এ জটিলতা যেমন দূর হয়, তেমনি বিষয়টি হয়ে ওঠে সহজ, স্পষ্ট ও অন্তরকে আশ্বস্তকারী।

যে ব্যক্তি বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় অথবা এমন স্থায়ী রোগে আক্রান্ত, যার আরোগ্যের কোনো আশা নেই, তার জন্য রমজানে রোজা না রাখা বৈধ। এ অবস্থায় তার ওপর কাজা নেই; বরং শরিয়ত তার জন্য ফিদয়া নির্ধারণ করেছে। অধিকাংশ ফকিহ (হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) এর মতে, এমন অক্ষম ব্যক্তির ওপর ফিদিয়া ওয়াজিব; কারণ ভবিষ্যতেও তার রোজা রাখার সক্ষমতা নেই।

কুরআন কারিম ফিদয়ার বিধানকে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছে, তবে সে সংক্ষিপ্ততার মধ্যেই নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য।
ফিদয়া হলো একজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া।
এখানে শরিয়ত খাবারের সময়সূচি (সেহরি বা ইফতার) কোনোটির কথাই বলেনি; বরং ‘খাবার’-কেই মানদণ্ড করেছে। ফকিহরা স্পষ্ট করেছেন, এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে একজন মিসকিনের দৈনিক খাদ্য, রোজার সময়ের সংখ্যা অনুযায়ী খাবার নয়।

হানাফিদের মতে, এ খাদ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট। প্রাচীন ফিকহি গ্রন্থসমূহে বলা হয়েছে, প্রতি এক রোজার বদলে এক সা’ খেজুর বা যব, অথবা অর্ধ সা’ গম দিতে হবে। এ পার্থক্য তৎকালীন অর্থনৈতিক প্রচলনের ভিত্তিতে নির্ধারিত ছিল; কারণ তখন গম, যব ও খেজুরের মূল্য ও পুষ্টিগুণে স্পষ্ট তারতম্য ছিল। গম তুলনামূলকভাবে দামী ও উৎকৃষ্ট খাদ্য হওয়ায় অর্ধ সা’ যথেষ্ট ধরা হয়েছিল; আর যব ও খেজুরের ক্ষেত্রে এক পূর্ণ সা’ নির্ধারিত হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান যুগে বাস্তবতা বদলে গেছে। আজ গম ও যবের দামে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই; অনেক অঞ্চলে তো যব গমের চেয়েও দামী। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে গম ও যব, উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রতি রোজার বদলে এক পূর্ণ সা’, অর্থাৎ প্রায় তিন কেজি পরিমাণ খাদ্য দেওয়া যথার্থ।

এ বিষয়টি স্পষ্ট হলে ‘এক বেলা না দুই বেলা’, এই বিতর্ক আপনাআপনিই গুরুত্ব হারায়। শরিয়ত এক বেলাকে যেমন বাধ্যতামূলক করেনি, তেমনি দুই বেলাকেও নয়; বরং নির্ধারিত খাদ্যপরিমাণকেই মূল বিবেচনা করেছে। কেউ যদি এক সা’ শস্য দেয়, অথবা সেই পরিমাণ অনুযায়ী রান্না করা খাবার খাওয়ায়, এক বেলাতেই হোক বা দুই বেলায়, সব অবস্থায়ই ফিদয়া আদায় হয়ে যাবে। সময় গণনা এখানে না আবশ্যক, না উদ্দেশ্য।

বর্তমান বাস্তবতায়, যখন অনেকেই শস্যের পরিবর্তে অর্থ দিতে চান, সেখানেও সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিনের বদলে এক সা’ (প্রায় তিন কেজি) খেজুর, যব বা গমের সমপরিমাণ বাজারমূল্য প্রদান করা যেতে পারে। এ অর্থ যে কোনো ফকির বা মিসকিনকে দেওয়া যাবে, সে রোজাদার হোক বা না হোক; কারণ ফিদয়ার ক্ষেত্রে মিসকিনের রোজাদার হওয়া শর্ত নয়। শর্ত একটাই, সে প্রকৃতপক্ষে অসচ্ছল ও উপযুক্ত হতে হবে।

একই মিসকিনকে একাধিক দিনের ফিদয়া দেওয়া জায়েজ। রমজানের মধ্যেই ফিদয়া আদায় করা হোক বা পরে, দু’টিই বৈধ; তবে রমজানেই আদায় করে দেওয়া উত্তম এবং অন্তরকে বেশি প্রশান্ত করে।

————–

ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, রামাদান

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8362

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *