Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : নিরানব্বই শতাংশ মুসলমানের প্রতি মনোযোগ দিন।

শিরোনাম : নিরানব্বই শতাংশ মুসলমানের প্রতি মনোযোগ দিন।
—————–

আমার অনেক ছাত্র-ছাত্রী মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজ করছেন। তাঁদের চেষ্টা ফলপ্রসূ হচ্ছে। তবে বিভিন্ন সময়ে তাঁরা একটি জটিল সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন, যা তাঁদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। সমস্যা হলো—কিছু মানুষ মাসলাকপন্থা ও ফেরকা-ভিত্তিক আলোচনা সামনে এনে তাঁদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। প্রশ্ন হলো: এর জবাব কীভাবে দেওয়া উচিত? এ প্রবন্ধ সেই প্রশ্নেরই উত্তর।

আল্লাহর দাওয়াত ও দ্বীনের কাজের পথে শয়তান সবসময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কখনও কখনও সে সাধারণ মুসলমানদের এবং ভালো মানুষদেরও এ কাজে ব্যবহার করে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কয়েকটি বিষয় মনে রাখলেই, ইনশাআল্লাহ, আপনি ফেতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবেন এবং আল্লাহর সাহায্যও পাবেন।

প্রথমত: সর্বদা নিজের নিয়ত পরীক্ষা করুন। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করুন। কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার বা কাউকে হারানোর ইচ্ছা আপনার মনে যেন না থাকে। যদি প্রতিযোগিতা ও জয়লাভের মনোভাব থাকে, তবে বুঝবেন শয়তানের প্রভাব আপনার ওপর পড়েছে। তখন আপনার কাজে কোনো বরকত থাকবে না এবং আল্লাহর সাহায্যও আপনার থেকে দূরে সরে যাবে।

দ্বিতীয়ত: সব অবস্থায় মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করার চেষ্টা করুন। মুসলমানদের একতা ও ঐক্যই তাঁদের প্রকৃত শক্তি। যেমন ভিন্ন ভিন্ন উপাদান মিলিত হয়ে নতুন যৌগ তৈরি করে, তেমনি মুসলমানদের মিলন থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ গড়ে ওঠে। এককভাবে মানুষের অস্তিত্ব শক্তিহীন, কিন্তু তাঁদের ঐক্য শক্তি সৃষ্টি করে। আর বিভেদ তাঁদের সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা বড় গুনাহ।

এ সমস্যার সহজ সমাধান হলো: যে-ই আল্লাহর দ্বীনের কাজ করছে, তার সহযোগিতা করুন, তার জন্য দোয়া করুন। তাকে কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করবেন না। হতে পারে, তাঁর কাজের ধারা আপনার থেকে ভিন্ন। এ ভিন্নতা স্বাভাবিক। এতে তাঁর ইসলাম ও আপনার ইসলাম আলাদা হয়ে যায় না।

হতে পারে কিছু লোক আপনাকে পথভ্রষ্ট বলবে, এমনকি কুফর বা ফিসকের ফতোয়া দেবে। এতে বিচলিত হবেন না। কারও ফতোয়ায় কাউকে কাফির বানিয়ে ফেলা যায় না। তবে আপনি কখনো কোনো মুসলমানকে পথভ্রষ্ট, ফাসিক বা কাফির বলবেন না। এটি বড় গুনাহ ও গুরুতর অপরাধ। মতভেদ ও মাসলাকের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব মুসলমানকে ভাই মনে করুন। কাউকে কথা বা কাজে আঘাত দেবেন না। মুসলমানদের তো বটেই, সাধারণ মানুষের প্রতিও ঘৃণা প্রদর্শন একটি মারাত্মক রোগের লক্ষণ। যে হৃদয়ে ঘৃণা ভরা থাকে, সেখানে আল্লাহ থাকেন না।

তৃতীয়ত: মাসলাকপন্থী ও ফেরকাবাদী লোকেরা সংখ্যায় সর্বোচ্চ এক শতাংশও হবে না। তাই তাদের উপেক্ষা করুন এবং সাধারণ মুসলমানদের প্রতি মনোযোগ দিন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক তরুণ মানসিকভাবে শূন্য থাকে। তাঁদের কাছে শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজ করুন।

স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁদের অবসরে দীন শেখার ব্যবস্থা করুন। যেমন প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা বা শুক্রবারে কয়েক ঘণ্টা তাদের কুরআন ও সুন্নাহ পড়ান, নামাজের নিয়ম শেখান, ইসলামি মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করুন—তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করুন।

এভাবে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কুরআনের হালকা গঠন করুন এবং বিভিন্ন ইসলামি বিষয়ে তাঁদের শিক্ষা ও তারবিয়াতের আয়োজন করুন।

মুসলমানদের মধ্যে মাসলাকপন্থা ও ফেরকাবাদ কমানোর সহজ উপায় হলো—তাদের সম্পর্ককে ইসলামের আসল উৎস, অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা। কারণ ফেরকাবাদীরা সচেতনভাবেই কুরআন-সুন্নাহ থেকে দূরে থাকে এবং বরং নিজেদের আকাবিরদের বই মানুষকে পড়ায়। এর কারণ হলো—কুরআন ও সুন্নাহ ফেরকা ও মাসলাকের ভিত্তি নষ্ট করে দেয়, আর সব মুমিনকে এক করে দেয়।

আমি এখানে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কাজ শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ, প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সুফল পেয়েছি। কিছু ফেরকাবাদী এতে বিরক্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। আমি কোনো জবাব দিইনি। তারা বারবার জিজ্ঞেস করেছে কেন জবাব দিচ্ছি না। আমি শুধু বলেছি: আমার কোনো জবাব নেই। আপনারা চাইলে নিজেদের বিজয় ঘোষণা করে আনন্দ করুন।

আল্লাহর শোকর যে আমি কখনো তাঁদের সঙ্গে তর্কে জড়াইনি। এর ফল হলো—আমার কাজের মধ্যে বরকত হচ্ছে। এমনকি তাদের নিজেদের পরিবার ও অনুসারীরাও এখন আমার দরসে অংশ নিচ্ছে।

আমার আমেরিকা, ইউরোপ বরং ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বারবার যাওয়া হয়েছে। মানুষ সেখানে দ্বীনের শিক্ষা নিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সেখানে না কোনো মাসলাক-পন্থী আছে, না কোনো ফেরকা-পন্থী। মানুষ শুধু আল্লাহর ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি জানতে চায়।

লখনৌ এক বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেখানে প্রায় তিন হাজার ছাত্রী পড়াশোনা করে। আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম। প্রিন্সিপাল মহোদয়া আমাকে বললেন—“আপনি প্রথম আলেম, যিনি এখানে আসার কষ্ট করলেন।” অর্থাৎ ময়দান সম্পূর্ণ ফাঁকা। পুরো লড়াইটা হচ্ছে মাত্র এক শতাংশ মুসলমানের উপর প্রভাব বিস্তারের জন্য। তাই আপনি ওই এক শতাংশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিরানব্বই শতাংশের দিকে মনোযোগ দিন।

আপনি মাসলাক-পন্থী ও ফেরকা-পন্থীদের বিদ্বেষে বিচলিত হবেন না। মুনাযারার আমন্ত্রণের জবাবে নিজের পরাজয় স্বীকার করে নিন, কিন্তু আপনার কাজের মধ্যে কোনো শৈথিল্য আনবেন না। আবারও জোর দিয়ে বলছি—যখনই কেউ আপনাকে মুনাযারার দাওয়াত দেবে, কিংবা মুনাযারা-সুলভ ভঙ্গিতে আপনার সম্পর্কে কিছু বলবে বা লিখবে, আপনি কখনো তার উত্তর দেবেন না। সে যত অভিযোগই করুক না কেন। অভিযোগের কারণে মন ভারী হওয়া শতগুণ ভালো, কিন্তু মুনাযারার নোংরা অপবিত্রতায় জড়ানো থেকে বাঁচা জরুরি।

মুনাযারা দ্বীনকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেমন ক্ষুর বেলুনকে ফাটিয়ে দেয়। মুনাযারা ইসলামী সত্যের ধ্বংসকারী, ঈমানের সম্পদের চোর, উম্মতের বিনাশকারী এবং চরিত্রের ধ্বংস সাধনকারী।

চতুর্থ কথা হলো: আপনি নিজে কখনো কোনো মাসলাকের দাওয়াত দেবেন না, বরং শুধুই আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিন। মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতি জাগ্রত করুন, আখিরাতের চিন্তা জাগিয়ে তুলুন, কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা দিন।

কুরআন কারিম মুসলমানদের পূর্ণাঙ্গ হিদায়াতনামা। এর বাইরে কিছু অব্যক্ত রয়ে যায়নি, আর কারো অনুমতিও নেই এতে কিছু সংযোজন করার। নবী করীম ﷺ-ই মুসলমানদের প্রকৃত ইমাম। প্রতিটি মানুষের জন্য তাঁর অনুসরণ ফরজ। তাঁর বিরোধিতা করে যে কোনো কথাই হোক না কেন, তা প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য।

আখিরাতে নাজাতের জন্য ঈমান ও সৎকর্মই যথেষ্ট। আল্লাহর নিয়ামত পূর্ণতা লাভ করেছে। এই পূর্ণতার পর কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। আল্লাহর দ্বীন সম্পূর্ণ হয়েছে, আর পরিপূর্ণতার পর কোনো বাড়তি পরিপূর্ণতার স্থান নেই। শুধু এই কথাই শিক্ষা দিন। এর ব্যাখ্যার জন্য নবীদের উদাহরণ তুলে ধরুন, সাহাবা ও তাবেয়িনদের ঘটনা সমর্থনে উপস্থাপন করুন। কিন্তু পরবর্তীদের নাম নেবেন না, কারণ এই নামগুলোই মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজেদের জন্য আলাদা আলাদা “আকাবির” বানিয়ে নিয়েছে এবং তাদের দিকে সম্পর্ককেই মানুষ দ্বীন বানিয়ে ফেলেছে।

শেষ কথা হলো: আল্লাহর দ্বীন হলো আনুগত্য ও ধৈর্যের নাম। আপনি আল্লাহর আনুগত্য করুন, আর এ পথে যে কষ্ট-দুর্দশা আসবে তার ওপর ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই আছেন। যদি ধৈর্যের বিনিময়ে অন্য কোনো পুরস্কার না-ও থাকত, তবে এটিই যথেষ্ট ছিল। যাঁর সাথে আল্লাহ থাকবেন, তাঁকে কেউ হারাতে পারবে না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে নফসের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন, তাঁর ইবাদতের তাওফিক দিন এবং দ্বীনের শিক্ষা ও দাওয়াতে নিয়োজিত করুন। আমীন।

——————–
ক্যাটাগরি : তাজকিয়ায়, নাসিহাহ।

✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7002

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *