AkramNadwi

শিরোনাম : রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক/দম) করা বা করানো। —

শিরোনাম : রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক/দম) করা বা করানো।
————-

|| প্রশ্ন

একজন সৎ, ধার্মিক এবং দাওয়াত ও শিক্ষার কাজে যুক্ত এক মহিলার কাছ থেকে এ প্রশ্ন এসেছে:

আসসালামু আলাইকুম।

হাদিসে এসেছে, সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে, যার একটি হলো—তারা ঝাড়ফুঁক (দম/রুকইয়াহ) করায় না।

কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয়: বহু হাদিসে তো আবার রুকইয়াহকে সুন্নাতি চিকিৎসা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমনকি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও দম করেছেন এবং অন্যের মাধ্যমে দম করিয়েছেন।

কিছু আলেম এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ওই লোকেরা কাউকে গিয়ে নিজের জন্য দম করতে বলেন না; তবে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে করলে তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু এ ব্যাখ্যা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, কারণ নবী করিম ﷺ এর যুগেই দম করা এবং করানো—উভয়ই প্রচলিত ছিল।

দয়া করে এর সঠিক ব্যাখ্যা দিন। হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা হলো আমরা যেন সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। আর এটাও জানিয়ে দিন—হাদিসে উল্লিখিত সব শর্ত কি একসাথে পূরণ করতে হবে? নাকি এক-দুটি শর্ত পূরণ করলেও মানুষ এ মহান রহমতের অংশীদার হতে পারে?

|| উত্তর :

ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ,
রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর একটি মহান ও হৃদয়উদ্দীপক হাদিসে আল্লাহর অসীম রহমত ও অনুগ্রহের বর্ণনা এসেছে—সত্তর হাজার সৌভাগ্যবান মানুষ হিসাব-নিকাশ ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে তাঁদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তার একটি হলো— “لا يرقون ولا يسترقون”

এখানে “لا يرقون” অর্থ: তারা নিজেরাও দম করে না, অন্যের উপরও দম করে না।

আর “لا يسترقون” অর্থ: তারা কারও কাছে গিয়ে দম করার অনুরোধও করে না।

কিছু মুহাদ্দিস “لا يرقون” শব্দটিকে দুর্বল বলেছেন এবং বলেছেন, সঠিক শব্দ হলো “لا يسترقون”—অর্থাৎ অনুরোধ না করা। এটি তাঁদের উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এখানে মনে রাখা জরুরি—দম করা মূলত শরিয়তে বৈধ ও সুন্নাতি আমল। রাসুলুল্লাহ ﷺ শুধু নিজেই দম করেননি, বরং সাহাবাদেরও শিক্ষা দিয়েছেন কিভাবে দম করতে হয়, এমনকি কিছু সময়ে নিজেও দম করিয়েছেন।

কিন্তু ঐ সত্তর হাজার সৌভাগ্যবান মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো—তাঁরা আল্লাহর উপর এমন পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখেন যে, বৈধ বা সুন্নাত হওয়া সত্ত্বেও কারও কাছে গিয়ে তা করানোর প্রয়োজন বোধ করেন না। তাঁদের ঈমান ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা এত উচ্চ যে, তাঁরা শুধু আল্লাহর উপর নির্ভর করেন এবং মাখলুকের কাছে সাহায্য চাওয়াকে নিজেদের ঈমানের মর্যাদার সাথে অসঙ্গত মনে করেন।

আলেমরা বলেন, এসব গুণ একত্রে ঐ সৌভাগ্যবানদের বৈশিষ্ট্য। এর মানে এই নয় যে, কেউ কেবল একটি-দুটি গুণ অর্জন করলেই সে অবশ্যই এই উচ্চ মর্যাদা পাবে। বরং বিনা হিসাব জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ তাঁদের জন্য, যাদের মধ্যে সব বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়েছে। হ্যাঁ, কেউ যদি একটি-দুটি গুণও অর্জন করে, তবে সে নিশ্চয়ই সওয়াব পাবে এবং তার আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটবে।

কারও মনে যদি প্রশ্ন আসে—রাসুল ﷺ নিজেও তো দম করেছেন এবং করিয়েছেন—তবে এর উত্তর হলো: এই সুসংবাদ মূলত তাঁর উম্মতের জন্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য এমন উচ্চ যে, তিনি উম্মতের শিক্ষা ও সহজতার জন্য অনেক কিছু করেছেন। কখনো কখনো কোনো আমলকে সুন্নাত হিসেবে করা উম্মতের তালীম ও তারবিয়তের জন্য প্রয়োজনীয় হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থগুলোতে রয়েছে। সেগুলো অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট হয়—ঐ সত্তর হাজার সৌভাগ্যবান মানুষের আসল বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা, দৃঢ় ঈমান এবং খাঁটি তাওহিদের উচ্চতম স্তরে পৌঁছেছেন। তাঁরা সাধারণ মুমিনদের থেকে এ দিক দিয়ে আলাদা যে, তাঁদের জন্য সৃষ্টির উপর নির্ভর করা আর প্রয়োজনীয় নয়।

এই হাদিস হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত, নিজের ভেতরে তাওয়াক্কুল, এখলাস ও আত্মিক পবিত্রতা বৃদ্ধি করে সেই উচ্চ মর্যাদার দিকে এগিয়ে চলা। যেন আমরাও আল্লাহর অসীম রহমত ও মাগফিরাতের অংশীদার হয়ে ঐ সৌভাগ্যবানদের দলে শামিল হতে পারি।

——————–
ক্যাটাগরি : হাদিস, ফাতাওয়া।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ।
—-
অনুদিত লিংক
https://t.me/DrAkramNadwi/6822

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *