AkramNadwi

শিরোনাম : যে দেখে, সে দেখে না।

এক জ্যোতির্বিদ এক রাতে আকাশের তারা গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ সে অসাবধানতাবশত একটি কুয়োয় পড়ে গেল। তখন এক জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, “আকাশের অধ্যয়নকারী! তুমি কি জানো না, তোমার পায়ের নিচে কী আছে?”

যখন মানুষ কোনো একটি জিনিস দেখে, তখন সে আসলে অনেক কিছুই দেখতে পায় না। অর্থাৎ, তার দৃষ্টি একদিকে নিবদ্ধ হয়, আর অসংখ্য অন্য জিনিস সে উপেক্ষা করে। অথচ হতে পারে—যেগুলো সে দেখছে না, সেগুলিই তার দেখা জিনিসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, পথচারী যদি রাস্তার একদিকে মনোযোগ দেয়, তাহলে অন্যদিক থেকে আসা গাড়ি তাকে পিষে দিতে পারে। কেউ সাপ থেকে পালাতে গিয়ে সিংহের মুখে পড়তে পারে।

ঠিক তেমনি, যখন কেউ একটি কথা শোনে, তখন সে একই মুহূর্তে বহু গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনতে পায় না। শ্রেণিকক্ষে এক ছাত্র যদি সহপাঠীর কথায় মনোযোগ দেয়, তবে শিক্ষকের মূল্যবান কথা তার কানে পৌঁছায় না। অপরিচিতের কথা শোনায় যে ব্যস্ত, সে নিজের মা-বাবার কথায় বধির হয়ে যায়। কত মানুষ আছে, যারা শত্রু ও কুপরামর্শদাতার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, কিন্তু বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কণ্ঠ উপেক্ষা করে!

যখন কেউ কোনো একটি বিষয়ে গভীর চিন্তা করে, তখন সে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে অজান্তেই বিমুখ থাকে। ভারতের একটি শ্রেণি দিনরাত মানুষকে ইসলাম ও মুসলমানদের ভয় দেখাচ্ছে, এ নিয়ে লিখছে, বলছে ও প্রচার করছে। অথচ এর ফলে দেশকে দুর্বল করে দিচ্ছে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, যে অর্থনৈতিক পতন এবং যে পরিবেশ-দূষণ দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেসব বিষয়ে তাদের কোনো মনোযোগ নেই। আর যখন কিছুটা সচেতনতা আসবে, তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে।

একজন আলেম কখনও কোনো গবেষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তার সমস্ত যোগ্যতা ও সময় সেই গবেষণায় ব্যয় করেন। অথচ তার ফলাফল হয় সীমিত, যখন অন্য অনেক বিষয় আরও জরুরি গবেষণার দাবি রাখে। কিন্তু সেগুলিতে কাজ করার সুযোগ থাকে না। অনেক সময় মানুষ যে বিষয়ে চিন্তা করছে, এবং যার উপকারিতা সম্পর্কে যতই নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিষয়টির অনেক ক্ষতিকর দিক তখন তার চোখে পড়ে না। যেমন বলা হয়—

“ভয় ও বিভ্রান্তির মুহূর্তে প্রতিটি চিত্র উল্টো হয়ে যায়;
লাইলার জায়গায় মজনু, মজনুর জায়গায় লায়লা দেখা দেয়।”

যে বিষয়গুলো মানুষ দেখে না, শোনে না, বা বোঝে না—তা দুই ধরনের।

প্রথমত: যেগুলো কেউই দেখতে, শুনতে বা বুঝতে পায় না, এগুলোই অদৃশ্য বিষয় বা গায়বী সত্য। এদের ব্যাপারে মানুষের দায়িত্ব হলো—সর্বজ্ঞ আল্লাহর দেওয়া শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়া, এবং দৃশ্যমান, শ্রবণযোগ্য ও অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তবতার চেয়েও সেগুলিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, সেগুলো উপেক্ষা করলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এজন্যই কুরআনে বলা হয়েছে—
“বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকেই অগ্রাধিকার দাও, অথচ আখিরাত উত্তম ও চিরস্থায়ী” (সূরা আল-আ‘লা: ১৬-১৭)
এবং—
“নিশ্চয়ই পরকালের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অনেক বড়” (সূরা আন্-নিসা: ৯৭)।

কুরআনের এমন অনেক শিক্ষা আছে, যা খুবই স্পষ্ট ও মৌলিক, কিন্তু মানুষ তা বোঝার ক্ষেত্রে গভীর তত্ত্বজ্ঞান অপেক্ষা আরও বেশি দুরূহ মনে করে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো; এই উচ্চ ও সূক্ষ্ম সত্যগুলোর ব্যাপারে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করা, বোকার মতো সেগুলো নিয়ে জ্ঞানীর ভান করে মন্তব্য করা নয়।

দ্বিতীয়ত: সেসব বিষয়, যা সে নিজে না দেখলেও অন্যরা দেখে, শোনে ও বোঝে। এদের ক্ষেত্রে তার কর্তব্য হলো—বিশ্বস্ত, আন্তরিক ও প্রজ্ঞাবান শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে পরামর্শ করা, বিনয় সহকারে তাদের কথা শোনা এবং নিজের ইচ্ছামতো একগুঁয়েমি না করা। তা না হলে সে নিজেই বিপথে যাবে এবং তার অনুসারীরাও বিভ্রান্ত হবে। দেখার, শোনার ও বোঝার এই সীমাবদ্ধতার কারণেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি নবীকেও অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করার আদেশ দিয়েছেন।

পরামর্শের উপকার এটাই, এর মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক কিছু দেখা যায়, অনেক কথা শোনা যায়, এবং অনেক বিষয় বোঝা যায়।

তাই যেমন নিজের দেখা, শোনা ও বোঝা গুরুত্বপূর্ণ—তেমনি এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা জানতে চেষ্টা করি: অন্যরা কী দেখছে, কী শুনছে, এবং কী বুঝছে। অর্থাৎ, আমরা যেন দেখি সেই জিনিসগুলো যেগুলো আমরা দেখছি না; শুনি সেই কথাগুলো যেগুলো আমরা শুনছি না; এবং বুঝি সেই বিষয়গুলো যেগুলো আমরা অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে উপেক্ষা করে রেখেছি।

অজ্ঞতা, গাফেলতি, আত্মকেন্দ্রিকতা, অন্ধদৃষ্টি, আত্মতুষ্টি, অহংকার ও আত্মঅভিমান—এই সবই অসংখ্য মানুষ, জাতি ও সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে। বারবার এমন হয় যে, মানুষ যা সত্য বলে মনে করে, সেটাই ভুল প্রমাণিত হয়; আর যেটাকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করে, সেটাই আসলে সঠিক হয়—

“কত যে মানুষ সঠিক কথার সমালোচনা করে,
তাদের ভুল আসে বিকৃত বোঝাপড়া থেকে।”

কিন্তু বুদ্ধিগুলো সত্যকে গ্রহণ করে
নিজ নিজ যোগ্যতা ও জ্ঞানের পরিমাণ অনুযায়ী।

আকাশ ও পৃথিবী সাক্ষ্য দিক—
কত মানুষ আছে, যাদের বুদ্ধি ও বিবেচনা ছিল,
কিন্তু অন্যের কথা না শোনার কারণে
তাদের পরিণতি হয়েছে মূর্খ ও অজ্ঞদের চেয়েও করুণ।

আর কত অল্পবুদ্ধি ও নিরক্ষর মানুষ আছে,
যারা পরামর্শ গ্রহণের কারণে
প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শীদের চেয়েও অধিক প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী প্রমাণিত হয়েছে।

দৃষ্টিসম্পন্নরা হোঁচট খায়,
অন্ধ ব্যক্তি কিন্তু নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

জীবনে সফল হয় তারা, যারা নিজের দুর্বলতা বোঝে এবং তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে।
যারা দুই চোখ, দুই কান এবং এক মস্তিষ্কেই সন্তুষ্ট থাকে না, বরং হাজার চোখে দেখে, হাজার কানে শোনে, এবং হাজার মস্তিষ্কে চিন্তা করে।

আমি শুনি, যা শোনা যায় না;
আমি দেখি, যা চোখে ধরা পড়ে না।

দেখো, দুনিয়ার বহু শিক্ষিত গণতান্ত্রিক নেতা, পার্লামেন্ট থাকার পরও নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে নিজেকে ও সমগ্র জাতিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, ইতিহাসে এমন কত রাজা পেরিয়ে গেছেন, যাদের জ্ঞান ছিল সামান্য,
তবু তাঁরা জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞদের গোপন পরামর্শে ভরসা রেখে নিজেদের জ্ঞানী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রমাণ করেছেন, এবং তাঁদের দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এনেছেন।

যদি তুমি চাঁদ দেখতে না পাও,
তবে তাদের সাক্ষ্য মেনে নাও—
যারা চোখে তা দেখেছে।

——————–

ক্যাটাগরি : উপদেশ, আখলাক, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7509

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *