AkramNadwi

যাকাত, নফকা ও দায়িত্বের সীমারেখা

যাকাত, নফকা ও দায়িত্বের সীমারেখা

|২০| ফেব্রুয়ারি |২০২৬|

❖ প্রশ্ন :

অস্ট্রেলিয়া থেকে ডা. আমশা নাহিদ সাহেবা লিখেছেন :

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
যাকাত ও সদকা সম্পর্কে পূর্ববর্তী প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে, যা আমাদের কমিউনিটিতে প্রায়ই দেখা দেয় এবং যেগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।

আমরা জানি, যদি পিতা-মাতা আর্থিকভাবে দুর্বল হন, তবে তাঁদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সন্তানের দায়িত্ব। কিন্তু কখনও কখনও পিতা-মাতা উমরা, হজ, সফর কিংবা এমন কিছু ব্যয়ের আকাঙ্ক্ষা করেন, যা মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত। আর সন্তানের পক্ষে নিজস্ব আয় থেকে তা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় প্রশ্নগুলো হলো—

পিতা-মাতা যদি আর্থিক প্রয়োজনে থাকেন, তবে কি সন্তান নিজের যাকাত তাঁদের দিতে পারে?
মৌলিক প্রয়োজন ও অতিরিক্ত ব্যয়, যেমন উমরা, হজ বা সফর—এর বিধানে কি পার্থক্য আছে?
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি আর্থিকভাবে দুর্বল হয়, যেমন শিক্ষারত এবং নিজ ব্যয় বহনে অক্ষম, তবে কি তাকে যাকাত দেওয়া যায়?
যদি সে যাকাতের উপযুক্ত হয়, তবে কি সেই যাকাত তার শিক্ষা ও মৌলিক প্রয়োজনে ব্যয় করা যাবে?

❖ উত্তর :

উত্তরে বলা যায়—
আপনার প্রশ্নগুলো মূলত দুটি নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত: এক, নফকার শরয়ি দায়িত্ব; দুই, যাকাতের নির্ধারিত খাত। এ দুই ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে গেলে অধিকাংশ জটিলতা নিজে থেকেই দূর হয়ে যায়।

শরিয়ত কিছু সম্পর্কের মাঝে আর্থিক দায়িত্বকে ফরজ করেছে। পিতা-মাতা যদি অভাবগ্রস্ত হন এবং সন্তান সামর্থ্যবান হয়, তবে তাঁদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব সন্তানের ওপর অপরিহার্য। এটি নিছক নৈতিক সহমর্মিতা নয়; বরং শরয়ি অধিকার। এ কারণেই মূল সম্পর্ক, অর্থাৎ পিতা-মাতা এবং শাখা সম্পর্ক, অর্থাৎ সন্তান- এদের পরস্পরের মধ্যে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। কারণ যাকাতের মাধ্যমে কেউ নিজের ওপর থাকা ফরজ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে পারে না। যাকাত হলো সম্পদের পবিত্রতা ও অভাবীর সহায়তার জন্য; নিজের অপরিহার্য কর্তব্য এড়ানোর উপায় নয়।

তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার। নফকার বাধ্যবাধকতা কেবল মৌলিক প্রয়োজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। যদি পিতা-মাতা উমরা, নফল হজ বা অন্য সফরের ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে সেই ব্যয় বহন করা সন্তানের ওপর শরয়ি বাধ্যবাধকতা নয়। সামর্থ্য থাকলে এবং সদাচরণ ও পিতামাতার প্রতি উত্তম ব্যবহারের অংশ হিসেবে সাহায্য করা নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে হলে না বলা গুনাহ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত ফরজ অধিকারগুলো যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে। এখানে প্রয়োজন ভারসাম্য ও সংযম, যাতে শরিয়তের সীমারেখা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং হৃদয়ে কষ্টও না জন্মায়।

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। যদি সে নিজের প্রয়োজন পূরণে অক্ষম হয় (সে পড়াশোনায় ব্যস্ত হোক বা বেকার) এবং তার নফকা শরয়ি দৃষ্টিতে পিতার দায়িত্বে পড়ে, তবে পিতার পক্ষে তাকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। কারণ সন্তানের ব্যয় তার ওপর ফরজ। আর ফরজ দায়িত্ব যাকাতের মাধ্যমে আদায় করা সঠিক নয়। ফলে পিতা তার সন্তানের শিক্ষা, বাসস্থান, খাদ্য বা অন্যান্য ব্যয় যাকাত থেকে বহন করতে পারবেন না; বরং নিজ সম্পদ থেকেই তা পরিশোধ করতে হবে।

তবে সেই সন্তান যদি প্রকৃতপক্ষে যাকাতের উপযুক্ত হয়—অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয় এবং মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম হয়, তবে অন্য কেউ তাকে যাকাত দিতে পারে। নিষেধাজ্ঞা কেবল পিতা ও সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ; সমগ্র উম্মাহর সঙ্গে নয়।

এছাড়া নিকটাত্মীয় যারা মূল বা শাখা সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত নয়, তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাদের যাকাত দেওয়া শুধু বৈধই নয়; বরং অধিক সওয়াবের কারণ। এতে ফরজ আদায়ের পাশাপাশি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার পুরস্কারও অর্জিত হয়।

শিক্ষা-ব্যয়ের প্রসঙ্গে, কেউ যদি প্রকৃত যাকাতগ্রহীতা হয়, তবে প্রাপ্ত যাকাত তার মৌলিক প্রয়োজন এবং বৈধ শিক্ষাব্যয়ে ব্যয় করা যেতে পারে। এভাবে যাকাত তার সঠিক খাতে ব্যবহৃত হয় এবং অভাবীর প্রকৃত প্রয়োজনও পূর্ণ হয়।

সবশেষে, এ সকল বিষয়ে মূল মানদণ্ড হলো, ফরজ দায়িত্ব ও নফল অনুগ্রহকে যেন একসঙ্গে মিশিয়ে না ফেলা হয়। শরিয়ত যে অধিকারকে অপরিহার্য করেছে, তা নিজের সম্পদ থেকে আদায় করতে হবে। আর যে সহায়তা অনুগ্রহ ও সদিচ্ছার অংশ, তা সামর্থ্য ও আন্তরিকতার আলোকে সম্পন্ন হবে। এখানেই নিহিত রয়েছে সম্পদের বরকত, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং সমাজের সুস্থতা।

————-

ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া,

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8468

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *