Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : কারণ ও ফল : ইবনে সিনার দর্শন

শিরোনাম : কারণ ও ফল : ইবনে সিনার দর্শন

|২৬|০১|২০২৬|

এ কথা স্মরণে রাখা জরুরি যে ‘ওয়াজিবুল-উজূদ’, ‘মুমকিনুল-উজূদ’, ‘কাদীম’ ও ‘হাদিস’ এই ধারণাগুলো মূলত ইলমুল কালামের উদ্ভাবন নয়; বরং এদের শিকড় নিহিত রয়েছে গ্রিক দর্শনে। পরবর্তীকালে মুসলিম মুতাকাল্লিমগণ এই দার্শনিক ধারণাগুলো গ্রহণ করেন, দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে সংশোধন করেন এবং আকীদা প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করেন। সুতরাং গ্রিক দর্শন, বিশেষত অ্যারিস্টটল ও তাঁর ব্যাখ্যাকারীদের চিন্তাধারা ভালভাবে না বুঝে ‘ওয়াজিবুল-উজূদ’ কিংবা ‘কাদীম ও হাদিস’ সংক্রান্ত আলোচনায় প্রবেশ করলে এসব বিষয়ের প্রকৃত রূপ ও গভীরতা সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা যায় না। এই ধারাবাহিকতায় আগে ‘উকুল’ ও ‘আফলাক’ এর ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়েছে; আর এখন সংক্ষেপে, তবে স্পষ্টভাবে, ‘কারণ ও কার্য্যের’ তত্ত্ব উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কারণ ও কার্য্যের প্রশ্ন দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত মৌলিক। মানুষের বুদ্ধি কেবল বস্তু দেখে তৃপ্ত হয় না; সে অবিরাম জানতে চায়, কোনো কিছুর অস্তিত্ব কেন হলো, কী কারণে তা সৃষ্টি হলো। এই স্বাভাবিক অনুসন্ধানই দার্শনিক চিন্তাকে জন্ম দেয় এবং মানুষকে অস্তিত্ব, জগৎ ও পরম সত্যের মতো গভীর প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। ইসলামী দর্শনে এই বিষয়টি সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে ইবনে সিনার কাছে, যেখানে কারণ ও কার্য্য কেবল প্রাকৃতিক বা যৌক্তিক সম্পর্ক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ইলাহিয়াতের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ইবনে সিনার মতে, সব বিদ্যা একরকম নয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান চলমান বস্তুর অধ্যয়ন করে, গণিত পরিমাণ ও সংখ্যার আলোচনা করে, এ দুটি নির্দিষ্ট সত্তা বা তার বিশেষ দিকেই সীমাবদ্ধ; তাই এগুলো আংশিক বিদ্যা। বিপরীতে ইলাহিয়াত কোনো নির্দিষ্ট বস্তুকে নয়, বরং ‘অস্তিত্বকে অস্তিত্ব হিসেবে’ অধ্যয়ন করে। এই বিদ্যা অস্তিত্বের সেই সাধারণ গুণাবলি নিয়ে চিন্তা করে, যা প্রত্যেক সত্তার সঙ্গে যুক্ত, যেমন সম্ভাব্যতা, অনিবার্যতা, একত্ব ও কারণ-কার্য্যের বিধান। এই কারণেই ইবনে সিনার কাছে ইলাহিয়াত সর্বাধিক বিস্তৃত বিদ্যা; এর চেয়ে অধিক সার্বজনিক কোনো বিদ্যার কল্পনা সম্ভব নয়। আর যেহেতু অস্তিত্বকে যথার্থভাবে বোঝা তার কারণ নিয়ে ভাবনা ছাড়া সম্ভব নয়, তাই ইলাহিয়াতে কারণ ও কার্য্যের প্রশ্ন কেন্দ্রীয় ও মৌলিক মর্যাদা লাভ করে।

ইবনে সিনা বিশেষভাবে জোর দেন এই বিষয়ে যে, ওয়াজিবুল-উজূদ কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তুর কারণ নন; তিনি সব সম্ভাব্য সত্তার মূল উৎস। তিনি এমন এক কারণ, যিনি নিজে কোনো কারণের মুখাপেক্ষী নন। এর বিপরীতে সমগ্র জগৎ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিটি সত্তা কার্য্য, কারণ তাদের অস্তিত্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; তা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এই ভিত্তিতেই ইবনে সিনা ওয়াজিবুল-উজূদ ও মুমকিনুল-উজূদের পার্থক্য নির্ধারণ করেন। ওয়াজিবুল-উজূদ সেই সত্তা, যার অস্তিত্ব তার নিজের সত্তা থেকেই অপরিহার্য, যার না-থাকার কল্পনাই সম্ভব নয়। আর মুমকিনুল-উজূদ এমন সত্তা, যা নিজে নিজে অস্তিত্বের দাবি করে না, আবার অবধারিতভাবে অনস্তিত্বশীলও নয়; বরং তার অস্তিত্ব কোনো কারণের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

অ্যারিস্টটল ‘কারণ’ ও ‘উৎস’ এর মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। তাঁর মতে, প্রতিটি কারণই উৎস; কিন্তু প্রতিটি উৎস কারণ নয়। উদাহরণস্বরূপ- বিন্দু রেখার উৎস, কারণ রেখা সেখান থেকেই শুরু হয়; কিন্তু বিন্দু রেখার অস্তিত্বের কারণ নয়। পক্ষান্তরে পিতা সন্তানের ক্ষেত্রে যেমন উৎস, তেমনি কারণও। ইবনে সিনা ‘উৎস’-এর ধারণাকে সম্প্রসারিত করে প্রায় ‘কারণ’-এর সমার্থক করে দেন; কারণ তাঁর মতে, যে সত্তা থেকে অন্য সত্তার অস্তিত্ব নির্গত হয়, সে-ই একই সঙ্গে উৎস এবং কারণ। এই সম্প্রসারণে ইবনে সিনার দার্শনিক ব্যবস্থা আরও সর্বব্যাপী ও সুসংবদ্ধ হয়ে ওঠে।

কারণের বিভাজনে ইবনে সিনা অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব গ্রহণ করে কারণকে চারটি মৌলিক প্রকারে ভাগ করেন, পদার্থগত, রূপগত, কার্যকর ও উদ্দেশ্যগত। পদার্থগত কারণ হলো সেই উপাদান, যেখান থেকে কোনো বস্তু গঠিত হয়, যেমন কাঠ হলো টেবিলের পদার্থগত কারণ। রূপগত কারণ হলো সেই আকৃতি ও গঠন, যা পদার্থকে বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট বস্তুতে রূপ দেয়, যেমন টেবিলের বিশেষ কাঠামো। কার্যকর কারণ হলো সেই কর্মী বা প্রভাবক, যার মাধ্যমে বস্তুটি অস্তিত্ব লাভ করে, যেমন—যিনি কাঠকে রূপ দিয়ে একটি টেবিল নির্মাণ করেন। আর উদ্দেশ্যগত কারণ হলো সেই লক্ষ্য, যার জন্য বস্তুটি নির্মিত হয়, যেমন লেখালেখি বা জিনিসপত্র রাখার কাজে টেবিলের ব্যবহার। ইবনে সিনার মতে, কোনো বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে এই চারটি কারণই জানা অপরিহার্য।

ইবনে সিনা পরিবর্তন ও রূপান্তর বোঝাতে পদার্থ ও রূপের সম্পর্ককে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর মতে, প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য এমন একটি অবলম্বন থাকা জরুরি, যা পরিবর্তনের মাঝেও টিকে থাক, আর সেটিই হলো পদার্থ। একই সঙ্গে প্রয়োজন হয় একটি নতুন রূপের, যা সম্ভাবনাকে বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে। যেমন—মাটির ভেতর কাঙ্ক্ষিত অবয়ব পূর্ব থেকেই সম্ভাবনা হিসেবে নিহিত থাকে; কুমার তা বাস্তব রূপ দেয়। পদার্থ কেবল সক্ষমতা বা প্রস্তুতি বহন করে; রূপ ছাড়া তার পূর্ণ অস্তিত্ব হয় না। আবার রূপও পদার্থ ছাড়া বাহ্যিক জগতে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। এভাবে পদার্থ ও রূপ একে অপরের পরিপূরক; দুয়ে মিলে কোনো বস্তুকে অস্তিত্ব দান করে।

কার্যকর কারণ ও উদ্দেশ্যগত কারণের সম্পর্ক আলোচনায় ইবনে সিনা উদ্দেশ্যগত কারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর দৃষ্টিতে কোনো কর্তা কখনোই উদ্দেশ্যহীন কাজ করে না; প্রতিটি কাজই কোনো না কোনো লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয়। চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করেন আরোগ্যের জন্য; আরোগ্যের ধারণাই তাঁর ইচ্ছা ও উদ্যোগকে সক্রিয় করে তোলে। এ কারণেই ইবনে সিনা বলেন, অর্থ ও উদ্দেশ্যের বিচারে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সব কারণের আগে অবস্থান করে, যদিও বাস্তব প্রয়োগে তা পরে প্রকাশ পায়। এই জন্যই তিনি উদ্দেশ্যগত কারণকে ‘কারণসমূহের কারণ’ বলে অভিহিত করেন।

শেষ পর্যন্ত ইবনে সিনা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পদার্থ, রূপ, কর্তা ও উদ্দেশ্য—এই সব কারণ কেবল সম্ভাব্য সত্তাকেই অস্তিত্বে আনে। যেহেতু সম্ভাব্য সত্তা নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে না, তাই কারণের এই ধারাকে শেষ পর্যন্ত এমন এক সত্তায় গিয়ে থামতেই হয়, যে নিজে কোনো কার্য্যের ফল নয়। তিনিই ওয়াজিবুল-উজূদ—প্রথম কারণ এবং পরম কারণ। এভাবেই ইবনে সিনার কারণ-কার্য্যের তত্ত্ব দর্শনচিন্তাকে বিভিন্ন স্থর থেকে ঐক্যের দিকে, সম্ভাবনা থেকে অনিবার্যতার দিকে অগ্রসর করে।

অতএব বলা যায়, ইবনে সিনার কাছে কারণ ও কার্য্যের ধারণা নিছক একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অধিবিদ্যাগত ব্যবস্থা, যা অস্তিত্বের গভীর স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে চায়। এই ব্যবস্থা মানববুদ্ধিকে খণ্ড খণ্ড দৃশ্যমান রূপ থেকে তুলে নিয়ে পরম সত্যের দিকে ধাবিত করে। এ কারণেই ইবনে সিনার কারণ-কার্য্যের তত্ত্ব আজও দার্শনিক আলোচনায় একটি উজ্জ্বল, সুদৃঢ় ও প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।

————-

ক্যাটাগরি : ফিলোসোফি, ইসলামি চিন্তাধারা,

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8288

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *