|২৫ |মার্চ |২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
অস্ট্রেলিয়া থেকে সম্মানিতা ডা. আমশা নাহিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন—
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
শায়েখ, আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমাদের কমিউনিটির একজন সদস্যের পক্ষ থেকে একটি প্রশ্ন পেশ করছি :
ব্যবসার যাকাত কি সেই ব্যবসার মাল (স্টক) থেকেই আদায় করা যায়, যেমন সোনার যাকাত সোনা দিয়ে দেওয়া হয়? উদাহরণস্বরূপ, যদি আমাদের স্টকে সোনা ও অন্যান্য পণ্য থাকে, তাহলে যাকাতের যে পরিমাণ নির্ধারিত হয়, সেই মূল্যমানের সমপরিমাণ পণ্য কি সদকা হিসেবে দেওয়া যাবে?
আরেকটি প্রশ্ন, পণ্যের আকারে যাকাত দেওয়া কি শরিয়তসম্মত? কারণ রাসূলুল্লাহ সা. এর যুগে তো কিছু ক্ষেত্রে যাকাত পণ্যের মাধ্যমেও আদায় করা হতো।
অনুগ্রহ করে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
❖ উত্তর:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে তাঁদের জন্য, যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তাদের যাকাত আদায় করতে আগ্রহী। বিষয়টি যথাযথভাবে বোঝার জন্য এর মূলনীতি ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকগুলো পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
শরিয়তে যাকাত মূলত একটি আর্থিক ইবাদত, যার সম্পর্ক সম্পদের মূল্যমানের সঙ্গে, অবশ্যই সবসময় তার বাস্তব রূপ বা আকারের সঙ্গে নয়। বিশেষত ব্যবসায়িক সম্পদের ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত পণ্যের উপর যাকাত ধার্য হয় তার বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে।
অতএব, যখন যাকাতের বছর পূর্ণ হয়, তখন একজন ব্যবসায়ী তার সমগ্র স্টকের বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করে, সেই মূল্যের আড়াই শতাংশ (২.৫%) যাকাত হিসেবে আদায় করবেন। এখান থেকে স্পষ্ট হয়, মূল দায়বদ্ধতা হচ্ছে সম্পদের মূল্য অনুযায়ী যাকাত নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট সেই পণ্যটিই হুবহু প্রদান করা অপরিহার্য নয়।
তবে, যাকাত আদায়ের পদ্ধতিতে শরিয়ত একটি পরিমিত নমনীয়তাও রেখেছে। মূলত নগদ অর্থে যাকাত প্রদান করাই অধিক উপযোগী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অধিক ফলপ্রসূ, কারণ এতে প্রাপকের হাতে স্বাধীনতা থাকে, তিনি তার প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যয় করতে পারেন। বর্তমান যুগে, যখন মানুষের প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও জটিল, তখন নগদ অর্থই সাধারণত অধিক কার্যকর প্রমাণিত হয়।
এরপরও, ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুযোগ রয়েছে যে, যদি কেউ তার উপর ওয়াজিব হওয়া যাকাতের সমপরিমাণ মূল্যের পণ্য প্রাপকদের প্রদান করেন, তাহলে সেটিও গ্রহণযোগ্য হবে, তবে শর্ত হচ্ছে এতে পূর্ণ সততা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, প্রদত্ত পণ্যের মূল্য যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে হবে, কোনো প্রকার প্রতারণা বা কমতি-বেশি চলবে না, এবং পণ্যগুলো প্রকৃত অর্থেই প্রাপকের জন্য উপকারী ও ব্যবহারযোগ্য হতে হবে।
সুতরাং, কোনো ব্যবসায়ী যদি তার স্টকে থাকা পণ্য, তা সোনা হোক বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক দ্রব্য, থেকে যাকাতের সমমূল্যের অংশ বের করে প্রাপকদের প্রদান করেন, তাহলে নীতিগতভাবে তা বৈধ।
হাদীসের আলোকে জানা যায়, নববী যুগে অনেক সময় যাকাত পণ্যের মাধ্যমেও আদায় করা হতো, যেমন খেজুর, যব ইত্যাদি। তবে এ বিধান মূলত সেই সব সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, যেগুলোর উপর যাকাত স্বয়ং সেই রূপেই ফরজ হয়, যেমন কৃষিপণ্য বা গবাদি পশু। ব্যবসায়িক সম্পদের ক্ষেত্রে যেহেতু মূল্যই প্রধান বিবেচ্য, তাই এ ক্ষেত্রে নগদ প্রদানের পদ্ধতিই অধিক স্পষ্ট ও সহজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যদিও পণ্যের মাধ্যমে আদায়ের সুযোগ এখনো বিদ্যমান।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণীয়, শরিয়তের লক্ষ্য কেবল যাকাত আদায় করা নয়; বরং প্রকৃত অর্থে অভাবগ্রস্তদের উপকার সাধন করা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করা। তাই যদি পণ্য দেওয়ার ফলে প্রাপক তৎক্ষণাৎ উপকৃত না হন, বা তা বিক্রি করতে গিয়ে অসুবিধায় পড়েন, তবে নগদ অর্থ প্রদানই অধিক উত্তম এবং শরিয়তের উদ্দেশ্যের অধিক নিকটবর্তী।
একইভাবে, যদি কোনো ব্যবসায়ী বিক্রি না হওয়া বা নিম্নমানের পণ্য যাকাতের নামে বের করে দিতে চান, তবে তা হবে আমানতের খেলাফ এবং যাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর বিধান যথাযথভাবে বুঝে আন্তরিকতার সঙ্গে আমল করার তাওফীক দান করুন।
———-
ক্যাটাগরি: ফিকাহ, ফাতাওয়া, উপদেশ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8791