Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : মুফতি বিচারক নন |২৮ |জানুয়ারি |২০২৬| ইস

শিরোনাম : মুফতি বিচারক নন
|২৮ |জানুয়ারি |২০২৬|

ইসলামি শরিয়তে প্রতিটি দায়িত্ব ও পদমর্যাদার একটি নির্দিষ্ট সীমা, পরিধি ও কর্তব্য নির্ধারিত আছে। এই সীমারেখাগুলো মেনে চলাই ন্যায়, ভারসাম্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়; আর এগুলো লঙ্ঘন করলেই জন্ম নেয় ফিতনা, বিশৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শত্রুতা। এই মৌলিক পার্থক্যগুলোর মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিত বিষয় হলো, মুফতি ও বিচারকের মধ্যকার পার্থক্য।

মুফতি কখনোই বিচারক নন, আর শরিয়তও তাঁকে বিচারকের ক্ষমতা অর্পণ করেনি। যখন এই পার্থক্যটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়, তখন ফতোয়া রায় হয়ে দাঁড়ায়, মতামত রূপ নেয় চূড়ান্ত আদেশে, আর কল্যাণকামিতা পরিণত হয় অভিযোগ ও বিচারে।

মুফতির দায়িত্ব মূলত শরিয়তের বিধান ব্যাখ্যা করা, তা প্রয়োগ করা নয়। তিনি শরিয়তের নীতিমালার আলোকে কোনো বিষয় স্পষ্ট করেন, পথনির্দেশ দেন, এবং তাদের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা. এর বিধানের অনুসারী হতে চান। পক্ষান্তরে বিচারকের দায়িত্ব হলো বিরোধ নিষ্পত্তি ও বিবাদ মীমাংসা করা। তিনি পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনেন, সাক্ষ্য গ্রহণ করেন, প্রমাণ ও আলামত পর্যালোচনা করেন, এবং শেষে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে রায় ঘোষণা করেন। এ কারণেই শরিয়ত এই দুই পদকে পৃথক রেখেছে এবং একটির ক্ষমতা অন্যটির হাতে দেয়নি।

এই নীতির আলোকে বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্ট, যেমন একজন মুফতি হত্যা, চুরি, ব্যভিচার বা অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন না, তেমনি তিনি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঈমান-কুফর, হেদায়াত-পথভ্রষ্টতা, গ্রহণযোগ্যতা বা প্রত্যাখ্যানের চূড়ান্ত ফয়সালা দেওয়ার অধিকারও রাখেন না। কুফর, ইসলাম, ঈমান ও নিফাক এমন বিষয়, যার সম্পর্ক মানুষের অন্তরের সঙ্গে, আর অন্তরের অবস্থা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। শরিয়ত যদিও বাহ্যিক আচরণের ভিত্তিতে কিছু বিধান নির্ধারণ করেছে, তবে সেগুলো কার্যকর করার ক্ষমতা সবার হাতে দেয়নি; বরং একটি নিয়মতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থার সঙ্গে তা সম্পৃক্ত করেছে।

তবুও আমাদের সমাজে এক ভয়াবহ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, ফতোয়াকেই আদালত মনে করা হচ্ছে, আর মুফতিকেই বিচারক ভাবা হচ্ছে। ফলে কিছু মানুষ এই ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে যে, তারা অমুক ব্যক্তিকে কাফির, অমুক দলকে পথভ্রষ্ট এবং অমুক মতবাদকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত ঘোষণা করার অধিকার রাখে। এই মানসিকতা শুধু শরিয়তের মূলনীতির পরিপন্থীই নয়; এর পরিণতি হিসেবে গোটা উম্মাহকে পারস্পরিক সংঘর্ষ ও স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেয়।

উপমহাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সমস্যা নতুন নয়। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে তাকফির, তাফসিক ও তাদলিলের বাজার বিশেষভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রকাশ্যে মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল শহীদের তাকফির করা হয়; স্যার সৈয়দ আহমদ খানকে ইসলাম থেকে বহিষ্কারের দাবিতে অনড় থাকা হয়; মাওলানা কাসিম নানুতবি ও মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গোহীর বিরুদ্ধে একের পর এক কুফরের ফতোয়া দেওয়া হয়। আল্লামা শিবলী নুমানি ও মাওলানা ফারাহিকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। এরও আগে, ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতো মহান ইমামের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে তিনি হাদিস অস্বীকারকারী ছিলেন, এমনকি কিছু চরমপন্থী তাঁর সম্পর্কে এমন ভাষা ব্যবহার করেছে, যা কলমে লিপিবদ্ধ করারও যোগ্য নয়।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, যখন মুফতি নিজের সীমা অতিক্রম করেন, তখন এর আঘাত শুধু ব্যক্তির ওপর এসে পড়ে না; বরং সম্পূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, সংগঠন ও আন্দোলন এর শিকার হয়। প্রতিটি গোষ্ঠী অন্যকে আঘাত করাকেই দ্বীনের সবচেয়ে বড় খেদমত মনে করতে শুরু করে। এভাবেই তাকফির ও তাদলিলের এক অন্তহীন শৃঙ্খল গড়ে ওঠে।

এই প্রবণতার স্বাভাবিক ও অনিবার্য পরিণতি হলো শেষ পর্যন্ত সব মুসলমানই সন্দেহভাজন, বরং প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হয়। ‘কুফর’ শব্দটি যদি অস্বস্তিকর মনে হয়, তবে তাকে নরম করে বলা হয়, উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের মধ্যেই কুফরের কোনো না কোনো চিহ্ন বিদ্যমান। এর ওপর আরও যোগ হয় সেই নীতি, যে ব্যক্তি কাফিরকে কাফির মনে করে না, সেও কাফির। এই নীতির পর আর কোনো ব্যতিক্রমের অবকাশ থাকে না। পরিধি এমন বিস্তৃত হয়ে যায় যে, আলেম হোক বা সাধারণ মানুষ, সাধক হোক বা দাঈ, সবাই তার ভেতরে ঢুকে পড়ে।

কিছু মানুষ এই পরিস্থিতিকে হালকা করে দেখাতে চান এভাবে যে, হয়তো তাকফিরকারীদের পক্ষ থেকে তাড়াহুড়া হয়েছে, কিংবা কোনো ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও সমস্যার সমাধান করে না। প্রথমত, যেসব বিষয়ে ‘চূড়ান্ত’ বলা হয়, সেখানে এমন ধরনের ভুলের সম্ভাবনা স্বীকারই করা হয় না। যদি সামান্যতম সন্দেহও থাকত, তবে তারা কাউকে কাফির ঘোষণা করতেন না। দ্বিতীয়ত, ধরেও নেওয়া যাক যে ভুল হয়েছে, তবু পরিণতি ভিন্ন হয় না। কারণ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, কেউ যখন কাউকে কাফির বলে, তখন দুজনের একজন অবশ্যই কাফির হয়, যাকে বলা হলো, অথবা যে বলল। এই নীতির আলোকে, যদি যাকে কাফির বলা

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *