|২০ |জানুয়ারি| ২০২৬|
|| প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আশা করি আপনি সুস্থ ও ভালো আছেন।
সম্প্রতি কয়েকজনের সঙ্গে নন-হালাল মাংস ভক্ষণ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। তারা তাদের মতের পক্ষে একটি হাদিস উল্লেখ করেন। তবে আমার দীর্ঘদিনের ধারণা হলো, যদি সত্যিকার অর্থেই হালাল মাংস পাওয়া না যায়, অর্থাৎ বাস্তবে কোনো উপায় না থাকে, তখন কোশার মাংস (ইহুদি শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ প্রাণী) ভক্ষণ করা যেতে পারে। আর যদি সেটিও পাওয়া না যায়, কেবল তখনই নন-হালাল মাংসের প্রশ্ন আসতে পারে।
এই বিষয়ে সঠিক ইসলামী অবস্থানটি স্পষ্টভাবে জানতে চাই। আপনার ব্যাখ্যা পেলে উপকৃত হব।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
|| উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
হালাল ও হারামের সঠিক সীমা জানার জন্য আপনার আন্তরিকতা ও সততার কারণে আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। খাদ্যসংক্রান্ত বিষয়, বিশেষত মাংস, ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কুরআন, সুন্নাহ এবং প্রাচীন আলিমদের উপলব্ধির আলোকে বিষয়টি নিচে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো।
ইসলামী শরিয়তে মাংসের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যথাযথ শরয়ি পদ্ধতিতে যবেহ করা না হলে তা হারাম। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন: মৃত প্রাণী, রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, এসব তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। অতএব, শরিয়তসম্মত যবেহ ছাড়া কোনো মাংসকে হালাল বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।
একই সঙ্গে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য আহলে কিতাবের খাদ্যকে বৈধ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন: আজ তোমাদের জন্য সব পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে। যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল, আর তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল। সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী যুগের আলিমরা সর্বসম্মতভাবে বুঝেছেন—এখানে ‘তাদের খাদ্য’ বলতে মূলত তাদের যবেহ করা প্রাণীকেই বোঝানো হয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন: তাদের খাদ্য বলতে তাদের যবেহ করা পশু বোঝানো হয়েছে। এ ভিত্তিতে আলিমদের ঐকমত্য হলো, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের যবেহ করা মাংস মুসলমানদের জন্য হালাল, যদি নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে প্রাণীটি হারাম পদ্ধতিতে মারা হয়েছে, যেমন শ্বাসরোধ করে, প্রহার করে বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ উপায়ে।
কোশার মাংস এই কুরআনিক অনুমতির অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি ইহুদিদের শরিয়ত অনুযায়ী যবেহ করা হয়। কোশার যবেহে গলা কেটে রক্ত প্রবাহিত করা হয়, যা ইসলামের যবেহের মৌলিক শর্ত পূরণ করে। সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে কোশার মাংস হালাল। এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি, এই অনুমতি কোনো সংকটকালীন ছাড় নয়। হালাল মাংস সহজলভ্য থাকলেও কোশার মাংস খাওয়া বৈধ। কুরআনের এই অনুমতি সাধারণ ও শর্তহীন; একে প্রয়োজনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করা হয়নি।
তবে যদি কোনো স্থানে মুসলমানদের যবেহ করা হালাল মাংস এবং আহলে কিতাবের বৈধ যবেহকৃত মাংস, কোনোটিই পাওয়া না যায়, তাহলে সঠিক পথ হলো মাংস থেকে বিরত থাকা। ইসলাম মাংস ভক্ষণকে বাধ্যতামূলক করেনি। এ ক্ষেত্রে মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, শস্য, ডাল, ডিম ও দুগ্ধজাত খাদ্যের ওপর নির্ভর করা সম্পূর্ণ সম্ভব, শর্ত শুধু এই যে, সেগুলো হারাম উপাদানমুক্ত হতে হবে। এভাবেই একজন মুসলমান সন্দেহ ও নিষিদ্ধতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে হালালের পথে অটল থাকতে পারে।
হালাল নয় এমন মাংস, যেমন মৃত প্রাণীর মাংস অথবা শরিয়তসম্মতভাবে যবেহ না করা পশুর মাংস, মূলত কঠোরভাবে হারামই থাকে। কেবল চরম প্রয়োজনের অবস্থায়, যেমন কেউ বাস্তব ও প্রকৃতভাবে প্রাণহানির আশঙ্কায় পড়লে বা অনাহারে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার ভয় দেখা দিলে, এবং হালাল, কোশার এমনকি নিরামিষ কোনো বিকল্পই না থাকলে, তখনই তা বৈধতার আওতায় আসতে পারে। এমন অবস্থাতেও কেবল জীবন রক্ষার জন্য যতটুকু অপরিহার্য, তার বেশি গ্রহণ করা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“কিন্তু কেউ যদি বাধ্য হয়, অবাধ্যতা বা সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্য ছাড়াই, তবে তার ওপর কোনো গোনাহ নেই।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৭৩)
সাধারণ অসুবিধা, সামান্য কষ্ট বা ব্যক্তিগত পছন্দ, এসব শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘প্রয়োজন’ হিসেবে গণ্য হয় না।
উপসংহারে বলা যায়, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী কোশার মাংস হালাল, এবং মুসলিমদের যবেহ করা হালাল মাংস পাওয়া যাক বা না যাক তা ভক্ষণ করা বৈধ। যদি হালাল ও কোশার, উভয় ধরনের মাংসই অনুপস্থিত থাকে, তবে মাছ ও উদ্ভিদজাত খাদ্যের ওপর নির্ভর করাই সঠিক পথ। নন-হালাল মাংস কেবলমাত্র প্রকৃত ও জীবননাশের আশঙ্কাসম্পন্ন প্রয়োজনের সময়ই বৈধ হয়, তাও কেবল বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের দ্বীনের বিষয়ে স্পষ্টতা দান করেন, আমাদের হালাল রিজিক প্রদান করেন এবং যা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, তার ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন।
আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
————–
ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকহ, ইসলামি চিন্তাধারা, বাইনাল আদইয়ান
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8230