AkramNadwi

শিরোনাম : মহিলা শিক্ষার গুরুত্ব ও পর্দার বিধান।

শিরোনাম : মহিলা শিক্ষার গুরুত্ব ও পর্দার বিধান।
بسم الله الرحمن الرحيم || প্রশ্ন: সম্মানিত উস্তাদ ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী, আসসালামু আলাইকুম ও রহমতুল্লাহি ও বারাকাতুহ হুজুর, আমাদের প্রশ্ন হলো, আমরা ‘আল-মুমিন বায়তুল মাল ফাউন্ডেশন ও কাউন্সেলিং সেন্টার’ পরিচালনা করি। এর অধীনে আমরা বয়স্ক নারীদের জন্য ‘দ্বীনি কোর্স’ নামে কয়েকটি মক্তব চালু করেছি, যেখানে মহিলা শিক্ষিকাগণের মাধ্যমে নারীদের কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও দ্বীনসম্পর্কিত মূল বিষয়গুলো শেখানো হয়। মাসে বা দুই মাসে একবার আমরা পরীক্ষা নিতে যাই। পরীক্ষার পদ্ধতি হলো, একজন করে নারীকে সম্পূর্ণ পর্দায় সামনে বসানো হয়, আর আমরা কিছুটা দূরে বসে প্রশ্ন করি। কখনো কখনো তাঁদের মধ্যে কুইজ প্রোগ্রামও থাকে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এইভাবে বসা কেমন? সাহাবিয়া বা পরবর্তী যুগে কি এ রকম কোনো পদ্ধতির নজির পাওয়া যায়? প্রশ্নোত্তরের জন্য মাঝখানে পর্দা থাকা কি জরুরি? এ বিষয়ে দয়া করে আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। মুহাম্মদ উমর মাহবুব খান নাদভী নালা সুপাড়া, মহারাষ্ট্র। || জবাব: ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ, সম্মানিত জনাব মুহাম্মাদ উমর মাহবুব খান নদভী, আল্লাহ তাআলা আপনাদের দীনী প্রচেষ্টা কবুল করুন, আপনাদের প্রতিষ্ঠানের ভিত আরও দৃঢ় করে দিন, এবং আপনাদের মিশনকে উম্মাহর জন্য কল্যাণের উৎস বানিয়ে দিন। নারীদের কাছে দীন পৌঁছে দেওয়া, তাদেরকে কুরআন-হাদিস, ফিকহ ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা পরিচয় করিয়ে দেওয়া, নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মহৎ কাজ; যার প্রতিদান দুনিয়া-আখিরাত উভয় দিকেই অপরিমেয়। মুসলমানদের মাঝে কোনো পদ্ধতি বা দীনী বিষয়ে ভিন্নমত দেখা দিলে কুরআন আমাদেরকে যে নির্দেশ দেয়, সেটি অত্যন্ত পরিষ্কার- “فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِی شَیْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّٰهِ وَالرَّسُولِ” অর্থাৎ :- কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শিক্ষা থেকেই নিতে হবে।” এ পথই উম্মাহর ঐক্য রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যখন সবাই একই দিকনির্দেশনার সামনে মাথা নত করে, তখন মতভেদ বিভেদ ডেকে আনে না; বরং সময়-পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তম বোঝাপড়া, পরামর্শ ও সঠিক কর্মপন্থার দিশা দেয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেদের অনুসৃত পদ্ধতিকেই শেষ কথা মনে করে অন্যদের প্রচেষ্টাকে তুচ্ছ গণ্য করতে শুরু করে। অথচ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা মানুষের ভুল-ত্রুটির চেয়ে বহুগুণ বৃহৎ, এবং কারও জন্যই ঠিক নয় যে নিজের পদ্ধতিকে ‘পূর্ণ সত্য’ এবং অন্যদের প্রয়াসকে ‘ভুল’ মনে করে। ইসলামে দীনী শিক্ষার অধিকার পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য সমান। কুরআন-হাদিসের জ্ঞান, ঈমান ও আমলের দৃঢ়তা, সুন্নাহর প্রজ্ঞাময় চেতনা, এসব কোনো লিঙ্গভেদ মানে না। ইসলামী শিক্ষা কেবল বইপত্র পড়ার নাম নয়, বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি সাক্ষাৎ, প্রশ্নোত্তর, চরিত্রগত অনুশীলন, এবং ধারাবাহিক তদারকির সমন্বয়। এ পদ্ধতিই রাসুলুল্লাহ সা. এর শিক্ষা-দানে ছিল মূল আদর্শ। নবী সা. এর যুগে পুরুষ ও নারী উভয়েই একই পরিবেশে মসজিদে উপস্থিত হতেন, নামাজ, খুতবা ও দ্বীনি শিক্ষার জন্য। সবার সামনে প্রশ্নোত্তর হতো, এবং শিক্ষার এ পরিবেশ ছিল সহজ, উন্মুক্ত ও স্বাভাবিক। তবে বহুবার দেখা গেছে, নারীরা কিছু বিষয়ে পুরুষদের সামনে প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করতেন, কিংবা কিছু প্রশ্ন পুরুষদের সামনে করা উপযুক্ত মনে হতো না। তখন তারা নিজেরাই আবেদন করতেন, একটি নির্দিষ্ট দিন যেন শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত হয়। নবী সা. তাঁদের এই অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করতেন। এ থেকেই বোঝা যায়, সুন্নাহর পরিসর সংকীর্ণ নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী উভয় পদ্ধতিই বৈধ, যেখানে প্রয়োজন যৌথ পরিবেশ, আর যেখানে প্রয়োজন আলাদা আয়োজন। উভয় ক্ষেত্রেই হায়া ও তাকওয়া আবশ্যক; কঠোর বিচ্ছিন্নতা বা অতিরিক্ত দেয়াল-ব্যবস্থাপনা নয়। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পুরুষ ও নারী দুই-ই মসজিদ ও মাদরাসায় শিক্ষা লাভ করেছেন। বহু মহিলা মুহাদ্দিসার সামনে পুরুষ শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত হয়ে হাদিস শুনেছেন, ইজাজত নিয়েছেন। শত শত বছর এ ধারাই বহমান ছিল। এ প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, উপমহাদেশে যে কঠোর ও অনমনীয় পর্দা ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে, তা শরিয়তের মূল রূপরেখা নয়; বরং নির্দিষ্ট যুগের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব। এই বাড়তি কড়াকড়ি অনেক ক্ষেত্রে নারীদের শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে, যদিও ইসলাম নারীদের জ্ঞানার্জনের অধিকার ও প্রয়োজনকে বরাবরই সমান গুরুত্ব দিয়েছে। আপনারা যে পদ্ধতিতে কাজ করছেন, অর্থাৎ বয়স্ক নারীদের জন্য মহিলা শিক্ষিকাদের মাধ্যমে মক্তব পরিচালনা করা, নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া এবং প্রশ্নোত্তরের সেশন আয়োজন করা, যেখানে নারীরা পূর্ণ পর্দায় বসেন, সামনে যথেষ্ট দূরত্ব রাখা হয় এবং সবকিছু শালীনতা ও শিষ্টাচারের মধ্যে সম্পন্ন হয়, এসবই শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ, সুন্দর ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা-চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নারীর পরীক্ষায় নারী উপস্থিত থাকলে বাড়তি কোনো পর্দা বা বিভাজনের প্রয়োজন নেই। আর যদি প্রশ্নকারী পুরুষও হন, তবে শরয়ি হিজাব, দৃষ্টি সংযম এবং কথাবার্তায় ভদ্রতা, এই তিনটিই যথেষ্ট। রাসুলুল্লাহ সা. এর যুগে প্রশ্নোত্তর পর্বে কোনও দেয়াল বা আলাদা পর্দার ব্যবস্থা ছিল না। সুতরাং আপনাদের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের শরয়ি সমস্যা বা আপত্তির স্থান নেই। শিক্ষামূলক কুইজ কিংবা অন্যান্য কার্যক্রমও একই নীতির আলোকে অনুমোদিত, যতক্ষণ পর্যন্ত শালীনতা, নৈতিকতা এবং শরিয়তের সীমারেখা রক্ষা করা হয়। ইসলাম পর্দাকে নারীর মর্যাদা, সম্মান ও পবিত্রতার জন্য আবশ্যক করেছে; কিন্তু পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা বা কঠোর পৃথকীকরণই ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। আসল লক্ষ্য হলো, হায়া, তাকওয়া এবং অন্তরের পবিত্রতা। ইসলাম চায় মানুষ নিজেকে নজরদারির মধ্যে রাখুক, শুধু দেয়াল কিংবা দূরত্বের ওপর নির্ভর করে নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনারা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, তা কেবল সঠিকই নয়, বরং যুগের প্রয়োজন ও উম্মাহর চাহিদার সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই। নারীদের কাছে জ্ঞান পৌঁছানো, তাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর মূলভিত্তি শেখানো এবং এক প্রশিক্ষণমূলক পরিবেশ প্রদান করা, এর সবই অত্যন্ত মহৎ কাজ এবং সুন্নাহর প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে। দীনের প্রকৃতি সংকীর্ণতা বা কঠোরতার নয়; বরং প্রশস্ততা, ভারসাম্য ও সহজতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। হায়া, পর্দা, কথাবার্তায় ভদ্রতা ও তাকওয়া অটুট থাকলে, বর্তমান যে শিক্ষাব্যবস্থা আপনারা চালু করেছেন তা সম্পূর্ণভাবে বৈধ, সুন্দর এবং প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা আপনাদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন, আপনাদের প্রতিষ্ঠানকে দিশা ও হেদায়াতের কেন্দ্র বানিয়ে দিন এবং আপনাদের আরও বেশি খিদমতের তৌফিক দান করুন। ———- ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, তালিম, ইসলামি চিন্তাধারা। ✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড। ✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ। 🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇 https://t.me/DrAkramNadwi/7863
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *