AkramNadwi

শিরোনাম : বুদ্ধির সাধ্য ও অসাধ্য

কিছু মানুষ এই ভ্রান্তিতে আক্রান্ত যে, বুদ্ধি আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারে। অথচ এটি একটি স্বীকৃত সত্য, বুদ্ধি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত বাস্তবতাকে প্রমাণ করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তাআলা হলেন আরাফুল মা‘আরিফ, সকল নির্ধারিত বাস্তবতার চেয়েও অধিক নির্ধারিত, এবং বুদ্ধির উপলব্ধিগত সীমার সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে।

যখন আমরা বুদ্ধিকে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের দায়িত্ব দিই, তখন বুদ্ধি আল্লাহকে তাঁর বাহ্যিক ও প্রকৃত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল একটি সার্বিক মানসিক ধারণায় রূপান্তরিত করে ফেলে। এই ধারণা তখন সমাধানযোগ্য ও একীভূতযোগ্য হয়ে যায়; তা কোনো ধারাবাহিক ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে এবং বহু উদাহরণের ওপর প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। এমন একটি ধারণার জন্য তাওহিদ অপরিহার্য নয়; বরং তার প্রকৃতির মধ্যেই শিরকের উপাদান সন্নিবেশিত থাকে।
অন্য কথায়, বুদ্ধি সেই আল্লাহকে প্রমাণ করে না, যাঁর দিকে কুরআন আহ্বান জানায় এবং যাঁর ওপর মুসলমানদের ঈমান প্রতিষ্ঠিত। তদুপরি, কেবল বুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহকে প্রমাণ করার ধারণা কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এই চিন্তাধারা মুসলমানদের আল্লাহর কিতাবে প্রকৃত গভীর চিন্তা-মনন থেকেও বিরত রাখে। এই বিষয়টির স্পষ্টতার উদ্দেশ্যেই আমি প্রবন্ধসমূহের একটি ধারাবাহিক শুরু করেছি; আলোচ্য প্রবন্ধটি সেই ধারাবাহিক চিন্তারই একটি স্বাভাবিক পর্ব।

|৯| জানুয়ারি| ২০২৬|

মানব বুদ্ধি এক বিশেষ উপলব্ধিগত শক্তি, যা অন্যান্য ইন্দ্রিয়সমূহের তুলনায় এই দিক থেকে স্বতন্ত্র, সে আংশিক পর্যবেক্ষণ থেকে সার্বিক ও বিমূর্ত অর্থ আহরণ করতে সক্ষম। ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি বস্তুসমূহকে তাদের সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার ভেতর গ্রহণ করে এবং সীমিত অভিজ্ঞতার আলোকে সেগুলোকে শনাক্ত করে। কিন্তু বুদ্ধি এসব খণ্ডাংশ থেকে এক উচ্চতর চেতনার নকশা নির্মাণ করে, সেগুলোকে সার্বিক ধারণার রূপে বিন্যস্ত করে একটি চিন্তাগত কাঠামো গড়ে তোলে।
এই বৈশিষ্ট্যই বুদ্ধির শক্তি, আবার এটিই তার সীমারেখা নির্ধারণ করে। বুদ্ধি সক্ষম, সে সার্বিক নীতি প্রণয়ন করতে পারে, সেখান থেকে অবধারিত ফলাফল নির্ণয় করতে পারে এবং বাস্তবতার সাধারণ নিয়মাবলি চিহ্নিত করতে পারে; কিন্তু তার স্বভাবগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা ঘটনার খুঁটিনাটি ও নির্ধারিত পরিচয় প্রদান করতে পারে না। তার রায় সর্বদা সাধারণ ও বিমূর্ত- অর্থাৎ, নীতিগতভাবে কী হওয়া উচিত, তা সে বলে; কিন্তু নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে বাস্তবে কী আছে, তা নির্ধারণ করে না।

বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধির সূচনা ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা থেকেই হয়, কিন্তু তার পরিসর কেবল পর্যবেক্ষণের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে না। বুদ্ধি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোর ভেতর থেকে অভিন্ন গুণ ও বৈশিষ্ট্য আহরণ করে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে এমন সার্বিক ধারণা নির্মাণ করে, যা প্রতিটি আংশিক ঘটনা বা বস্তুর ওপর প্রয়োগযোগ্য। কারণ, শৃঙ্খলা, উদ্দেশ্যবোধ, পারস্পরিক নির্ভরতা ও কার্যকারিতা এসব ধারণা এই প্রক্রিয়ারই ফল। এগুলো কোনো একক বস্তুর বৈশিষ্ট্য নয়; বরং বহু উদাহরণে প্রযোজ্য। এ কারণেই বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের প্রকৃতি সার্বিক ও বিমূর্ত।
কোনো কিছুকে বুদ্ধির মাধ্যমে জানা মানে তার প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রত্যক্ষ করা নয়; বরং তাকে একটি বৃহত্তর ধারণাগত পরিসরের মধ্যে স্থাপন করা, যাতে তার অস্তিত্বের সাধারণ কারণ ও নীতিসমূহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিই বুদ্ধির রায় ও যুক্তির প্রকৃতি নির্ধারণ করে। যখন বুদ্ধি কোনো জটিল ও সুসংগঠিত বস্তুর মুখোমুখি হয়, তখন সে তাকে কেবল একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে দেখে না; বরং তাকে একটি নির্মিত সত্তা, একটি সুসংবদ্ধ অস্তিত্ব বা একটি কার্যকর ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত হিসেবে অনুধাবন করে। এই ধারণাগত শ্রেণিবিন্যাসের পর বুদ্ধি সার্বিক কার্য-কারণ নীতিকে কার্যকর করে, যেসব বস্তুর মধ্যে বিন্যাস, সামঞ্জস্য, উদ্দেশ্য ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান, সেগুলো আপনা-আপনি অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না; বরং সেগুলো কোনো কারণের মুখাপেক্ষী।
এই নীতির আলোকে বুদ্ধি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে তাজমহল কিংবা অন্য কোনো মহৎ স্থাপনা কোনো নির্মাতা বা কার্যকারক ছাড়া অস্তিত্বে আসতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত কেবল ঐতিহাসিক দলিল বা প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি সার্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি ও অপরিহার্যতার ভিত্তিতে অর্জিত।

তবে এই সিদ্ধান্ত তার প্রকৃতিগত দিক থেকে বিমূর্ত ও সার্বিকই থেকে যায়। বুদ্ধি নির্মাতা বা কার্যকারকের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করতে পারে, কিন্তু তার পরিচয় বা নির্দিষ্টতা নির্ধারণ করতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনার সনাক্তকরণের জন্য অতিরিক্ত জ্ঞানসূত্রের প্রয়োজন হয়, যেমন প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, ঐতিহাসিক প্রমাণ, বর্ণনা ও অভিজ্ঞতালব্ধ সাক্ষ্য। বুদ্ধি এসব খুঁটিনাটি উৎপন্ন করতে অক্ষম, কারণ সে কেবল সার্বিক ও সাধারণ নীতির ভিত্তিতেই যুক্তি দাঁড় করায়।

এইভাবে বুদ্ধি দেখায়, অস্তিত্বে আগত প্রতিটি বস্তুই এক কার্যকারকের মুখাপেক্ষী; কিন্তু সে বলে না, সে কার্যকারক কে, তিনি একজন না একাধিক, তিনি বস্তুগত না অলৌকিক, বাহ্যিক না অন্তর্গত।

ঠিক এই যুক্তিকাঠামোই তখনও কার্যকর থাকে, যখন বুদ্ধি সমগ্র মহাবিশ্বের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করে। বুদ্ধির স্তরে মহাবিশ্বকে তার সমস্ত পরীক্ষণযোগ্য খুঁটিনাটি নিয়ে দেখা হয় না; বরং তাকে সার্বিক ধারণার আলোকে অনুধাবন করা হয়, যেমন সম্ভাবনা, নির্ভরতা, শৃঙ্খলা, বিন্যাস ও ব্যবস্থা। এসব ধারণার আলোকে বুদ্ধি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে মহাবিশ্ব নিজে নিজে, স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে টিকে থাকতে পারে না; বরং তার জন্য কোনো মৌল সত্তা, কোনো কারণ, অথবা কোনো অপরিহার্য অস্তিত্ব বা একাধিক অস্তিত্বের প্রয়োজন রয়েছে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুক্তি সঠিক এবং প্রতিটি সেই অস্তিত্বের ওপরই প্রযোজ্য, যা সুসংগঠিত, নির্ভরশীল এবং নীতি ও নিয়মের অধীন। এই অর্থে বুদ্ধি যথার্থভাবেই প্রমাণ করতে পারে যে মহাবিশ্বের পেছনে কোনো না কোনো মৌল সত্তা, কারণ কিংবা অর্থবহ ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।
কিন্তু এখানেও সিদ্ধান্তটি তার প্রকৃতিতে বিমূর্ত ও সার্বিকই থেকে যায়। বুদ্ধি কেবল মৌল সত্তা বা কারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে পারে; এই যুক্তি থেকেই কিন্তু স্পষ্ট হয় না যে সেই মৌল সত্তা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রভু-ধারণার সঙ্গে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ। সত্তা, ইচ্ছা, জ্ঞান, নৈতিক কর্তৃত্ব, প্রাকৃতিক বিধানের ওপর কর্তৃত্ব কিংবা ইতিহাসে প্রকাশ, এসব গুণ কেবল একটি বিমূর্ত কারণের ধারণা থেকে স্বতঃসিদ্ধভাবে অর্জিত হয় না।
একটি বিমূর্ত কারণ থেকে একটি নির্দিষ্ট, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও গুণাবলিতে সমৃদ্ধ সত্তার ধারণায় পৌঁছাতে অতিরিক্ত জ্ঞানসূত্রের প্রয়োজন হয়, যা নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিসরের বাইরে অবস্থিত।

এই সীমাবদ্ধতাকে বুদ্ধির দুর্বলতা বা ব্যর্থতা বলে ভাবা উচিত নয়; বরং এটি বুদ্ধির স্বাভাবিক কর্মপরিসরেরই সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। বুদ্ধির কাজ হলো সার্বিক সত্য ও অপরিহার্য সম্পর্কগুলো অনুধাবন করা, প্রতিটি ঐতিহাসিক বা ব্যক্তিগত নির্ধারণ প্রতিষ্ঠা করা নয়। যখন বুদ্ধির কাছে তার সীমার বাইরে থাকা বিষয়ের দাবি তোলা হয়, তখন হয় সে ভিত্তিহীন ও অনির্ভরযোগ্য অনুমান তৈরি করে, নয়তো তার উপলব্ধি ও যুক্তিবোধ সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় সংশয় জন্ম নেয়।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞানতত্ত্ব বিভিন্ন জ্ঞানসূত্রের পারস্পরিক পরিপূরক ভূমিকা স্বীকার করে, যেখানে প্রতিটি উৎস এমন তথ্য প্রদান করে, যা অন্য উৎস থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়।

ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি মানব উপলব্ধিতে একদিকে যেমন মৌলিক ও অপরিহার্য, অন্যদিকে তেমনি চূড়ান্ত নয়। এটি সার্বিক নীতিসমূহ স্পষ্ট করে, বিমূর্ত স্তরে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং দেখাতে পারে যে কিছু সত্য ও অস্তিত্ব কারণনির্ভর, এবং মহাবিশ্ব নিজে নিজে, কারণ ছাড়া কিংবা অর্থবহ ধারাবাহিকতা ছাড়া, টিকে থাকতে পারে না।
তবে এই যুক্তি নিজ শক্তিতেই সেই কারণসমূহের পূর্ণ প্রকৃতি, গুণাবলি বা নির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ করতে সক্ষম নয়। বুদ্ধির পরিসর ও তার সীমা সম্পর্কে সচেতনতা আমাদের এই উপলব্ধি দেয়, কোথায় বুদ্ধির শক্তি নির্ভরযোগ্য, আর কোথায় তা কেবল বিমূর্ত ও সাধারণ সত্যই প্রদান করতে পারে; এবং কোথায় প্রকৃত ও নির্দিষ্ট পরিচয়ের জন্য অন্যান্য জ্ঞানসূত্র অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

————-

ক্যাটাগরি : ফিলোসোফি, ইসলামি চিন্তাধারা, সমালোচনা।
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8141

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *