AkramNadwi

শিরোনাম : বিবাহে লিঙ্গভূমিকা ও অর্থের দায়।১৯/১১/২

শিরোনাম : বিবাহে লিঙ্গভূমিকা ও অর্থের দায়।১৯/১১/২

بسم الله الرحمن الرحيم.

|| প্রশ্ন:
দিল্লির সম্মানিত বোন শবনম বেগম লিখেছেন :
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, শায়খ। আশা করি আপনার ঈমান ও স্বাস্থ্যের অবস্থা অনেক ভালো আছে। আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে, দাম্পত্য জীবনে নারী-পুরুষের ভূমিকা এবং স্বামী-স্ত্রীর আর্থিক দায়িত্ব নিয়ে।

যদি কেউ আধুনিক দার্শনিক মতের প্রভাবে বিবাহে সম্পূর্ণ লিঙ্গসমতার ধারণায় বিশ্বাস করেন, অর্থাৎ পুরুষ ও নারী জীবনের সব দায়িত্বে (আর্থিক, গার্হস্থ্য, মানসিক বা অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে) হুবহু একই ভূমিকা পালন করবেন—তাহলে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? উদাহরণ হিসেবে, যদি কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, যেমন স্বামীর চাকরি হারানো বা কর্মজীবনে অস্থিরতা, তাহলে স্ত্রীরও আর্থিকভাবে সংসারে সাহায্য করা উচিত, এমন মত পোষণ করা কি ঠিক?
তাদের যুক্তি, যেহেতু গৃহকর্ম বা সন্তান পালনে স্বামীর সহযোগিতা লজ্জার বিষয় নয়, তেমনি আর্থিক বোঝা ভাগ করে নেওয়াও নারীর জন্য লজ্জার বিষয় নয়।

আরো জানতে চাই, ইসলামে কোন পরিস্থিতিতে স্ত্রী স্বামীকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে বাধ্য বা উৎসাহিত বলে বিবেচিত হয়? এটি কি শুধু ব্যতিক্রমী অবস্থায়, যেমন গুরুতর অসুস্থতা, অক্ষমতা, বা যখন স্বামী সত্যিই উপার্জনে অক্ষম? নাকি সাময়িক চাকরিহানি বা কর্মজীবনে অস্থিরতার মতো অবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত?

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান, শায়খ।

|| উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহী ওয়া বারাকাতুহ।

আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, আপনার ঈমানকে দৃঢ় করুন এবং সত্যের সন্ধানে আপনার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি যে প্রশ্নগুলো করেছেন, সেগুলো আজকের যুগে অনেকের মনকেই আলোড়িত করে। আধুনিক চিন্তাধারার ঘূর্ণিঝড়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন; তাই এমন স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ন্যায়, মর্যাদা ও সত্যিকারের সমতার নিশ্চয়তা দেয়, সমতায় মূল্য, মর্যাদা, ঈমান, নৈকট্য ও প্রতিফলের অধিকার। তবে মূল্যমানের সমতা কখনোই ভূমিকার অভিন্নতা নয়। সৃষ্টিগত শক্তি, প্রকৃতি ও দায়িত্বের পার্থক্য বিবেচনায় ইসলাম প্রতিটি লিঙ্গকে পরিপূরক ভূমিকা দিয়েছে, যা স্বভাব, সামর্থ্য ও পরিবারের স্থিতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো কোনো সংস্কৃতির ফল নয়, বরং ওয়াহির ভিত্তিতে স্থাপিত এক চিরস্থায়ী কাঠামো।

এই কারণেই গৃহের আর্থিক দায়িত্ব, শরীয়াহর ভাষায় নাফাফা, সম্পূর্ণ, সুস্পষ্ট এবং স্থায়ীভাবে স্বামীর ওপর ন্যস্ত। এটি কোনো ব্যাখ্যা-নির্ভর মত নয় বা যুগভেদে পরিবর্তনযোগ্য সুপারিশও নয়; বরং কোরআনের সরাসরি নির্দেশ। আল্লাহ বলেন:

“পুরুষরা নারীদের অভিভাবক ও রক্ষণকারী।” (সূরা নিসা ৪:৩৪)

এ আয়াত কোনো ঐতিহাসিক চিত্র বর্ণনা করে না; বরং আইনগত দায়িত্ব ঘোষণা করে। একইভাবে সূরা বাকারা (২:২৩৩) তে আল্লাহ মা-শিশুর ব্যয়ভার পিতার ওপর বাধ্যতামূলক করেছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে বলেছেন, স্ত্রীর খাদ্য, পোশাক ও প্রয়োজনীয়তার দায়িত্ব স্বামীর; এবং এ অধিকার তাকে সুন্দরভাবে প্রদান করতে হবে।

প্রত্যেক ফিকহি মাজহাব, হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি, হাম্বলি এ বিষয়ে সর্বসম্মত যে, উপার্জনের দায়িত্ব একমাত্র স্বামীর। স্ত্রী ধনী হোক বা কর্মরত হোক, এমনকি বহু বেশি সম্পদের মালিক হলেও তার ওপর এ দায়িত্ব আরোপিত হয় না।

আধুনিক আলোচনায় মাঝে মাঝে যে ধারণা প্রচারিত হয়, স্বামী-স্ত্রীকে জীবনের সব দায়িত্বে, বিশেষত আর্থিক দায়িত্বে, ‘হুবহু অভিন্ন ভূমিকা’ পালন করতে হবে, এ ধারণা আসলে আল্লাহ নির্ধারিত পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

ইসলাম দয়া, সহযোগিতা, নমনীয়তা, এসব কিছুর বিরোধী নয়; বরং এগুলোকে উৎসাহিত করে। স্বামীর গৃহকর্মে সাহায্য করা রাসুলুল্লাহ সা. এর সুন্নাহ অনুসরণ। স্ত্রীর মানসিক সঙ্গ, সহমর্মিতা ও স্নেহ বিবাহে আল্লাহ যে রহমত রেখেছেন, তারই অংশ। তবে ইসলাম কখনোই এই পরস্পর-পরিপূরক আচরণগুলোকে একীভূত করে অভিন্ন, বাধ্যতামূলক ভূমিকার রূপ দেয় না। স্বামীর ঘর-সংক্রান্ত সাহায্য প্রশংসনীয়; স্ত্রীর আর্থিক সহযোগিতা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এগুলো মৌলিক আইনি দায়িত্বকে পরিবর্তন করে না।

যদি স্ত্রী নিজের সদিচ্ছায় স্বামীকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন, তবে তা তার নিয়তের ওপর নির্ভর করে, উপহারও হতে পারে, ঋণও হতে পারে। আর সে এর বিনিময়ে পুরস্কৃতও হন। কিন্তু কখনোই তার ওপর ধর্মীয়ভাবে এ দায়িত্ব বর্তায় না। তিনি চাইলে সাহায্য করবেন; না করলে কোনো গুনাহ নেই। তার ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর তার পূর্ণ মালিকানা থাকে। শরীয়াহ সেটিকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করে স্বামীর কোনো অধিকার নেই তা দাবি করা বা প্রত্যাশা করার। এটি সব পরিস্থিতিতেই প্রযোজ্য—এমনকি যদি স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি উপার্জন করেন বা পূর্ণকালীন চাকরিতে থাকেন। পরিবারের আর্থিক কাঠামো অর্থনৈতিক ওঠানামায় বদলে যায় না।

হ্যাঁ, স্ত্রী চাইলে স্বেচ্ছায় কঠিন সময়ে স্বামীকে সহযোগিতা করতে পারেন, সাময়িক চাকরিহানি, কর্মজীবনে অস্থিরতা, অসুস্থতা, অর্থনৈতিক মন্দা, বা হঠাৎ কোনো বাড়তি ব্যয়, এসব ক্ষেত্রে বহু সৎ ও ধার্মিক নারী ইতিহাস জুড়ে স্বামীকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু এগুলো সবই দয়া, উদারতা ও হৃদ্যতাবশত, কখনোই বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়। ইসলাম সৎকর্ম আর কর্তব্য, এই দুইয়ের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য রাখে। স্ত্রীর উদারতা আল্লাহ নির্ধারিত পারিবারিক কাঠামো বদলে দেয় না।

ইসলাম স্বামীর পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব বজায় রাখতে এত গুরুত্ব কেন দেয়? এটি কোনো পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য নয়, সমাজ-রক্ষণশীলতারও প্রকাশ নয়। বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবার গড়ার এক সূক্ষ্ম ও পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা। যখন ভূমিকা অস্পষ্ট হয়ে যায়, অথবা যখন উভয়কেই সমানভাবে আর্থিক দায়িত্বে বাধ্য করা হয়, তখন সম্পর্ক খুব সহজেই লেনদেনমূলক, প্রতিযোগিতাপূর্ণ বা ক্ষোভে ভরা হয়ে উঠতে পারে।

আধুনিক সমাজগুলো, যারা এই নির্দিষ্ট ভূমিকা পরিত্যাগ করেছে, তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেড়েছে, পারিবারিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়েছে। ইসলাম পরিবারকে এমন অস্থিরতা থেকে রক্ষা করতে চায়, একটি কাঠামোর মাধ্যমে যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং সমন্বয় ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করে।

সুতরাং আধুনিক দর্শন ভূমিকার সম্পূর্ণ অভিন্নতার কথা বললেও, ইসলাম বাস্তববাদী, মর্যাদাপূর্ণ পরিপূরকতাকেই আসল সামঞ্জস্য হিসেবে দেখে। স্বামী বহন করেন আর্থিক বোঝা; স্ত্রী সম্মানিত হন সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে। কিন্তু দুজনই রহমত, দয়া ও সহযোগিতার অংশীদার। স্ত্রী সাহায্য করলে তা সদাচরণ; না করলে সেটি তার পূর্ণ শরয়ি অধিকার। আধুনিকতা এই নীতি বাতিল করতে পারে না, কারণ এগুলো সমাজ-প্রবাহের ওপর নয়, ওয়াহির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো পরিবর্তন করা পরিবার-প্রতিষ্ঠানের স্থিতি নষ্ট করবে, কারণ আল্লাহ নিজেই এ ব্যবস্থা সাজিয়েছেন।

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রজ্ঞায় দৃষ্টি দান করুন, আমাদের পরিবারকে পবিত্রতা ও স্থিতিশীলতা দান করুন, এবং আমাদের সম্পর্কগুলোকে রহমত, ন্যায় ও আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করুন।

——————–

ক্যাটাগরি : পারিবারিক জীবন, ফিকহ, ফাতাওয়া, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা : মুহাম্মাদ মাশহুদ শরীফ

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7695

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *