শিরোনাম: বিপদের সকাল
—–
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড, ২৭/৭/২০২৬
কিছু ভোর এমন—সূর্য দিগন্ত থেকে নয়, মানুষের চোখের পাপড়ি ছুঁয়ে ওঠে। রাতের ক্লান্তি তখনও শিরা–উপশিরায় ঘুরপাক খায়, যেন হেমন্তের কুয়াশা জনমানবহীন উপত্যকায় ঝুলে আছে। চোখ ভারী, মস্তক ভারী, আসন্ন পাঠের পরীক্ষা ভেবে হৃদয় ভারী, স্বভাব সেই ভাঙাচোরা নৌকার মতো—ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে তটে এসে দাঁড়িয়েছে বটে, তবু পাল এখনো থরথর করছে।
সেই সকালটিও তেমনি। কয়েক মুহূর্ত পরেই আমাকে ক্লাসে পৌঁছাতে হবে। মনে আজকের পাঠের খসড়া, হাতে বই গুছিয়ে নিচ্ছি, আর অন্তর এক কাপ গরম চায়ের হাহাকারে লাইলী-প্রেমিক হয়ে আছে—ঠিক তখন দরজায় টোকা।
টোকাটা কেবল টোকা নয়; যেন তাকদীর লৌহ-আঙুলে আমার দরজায় নিজের আগমন ঘোষণা করছে।
দরজা খুলে দেখি, এক উর্দু কবি দাঁড়িয়ে।
মুখে এমন শান্তি—সদ্য আকাশ থেকে ওহি নিয়ে নেমেছেন যেন; চোখে এমন আস্থা—মির, গালিব, ইকবাল, ফয়েজ সবাই বুঝি তাঁদের কাব্যিক উত্তরাধিকার তাঁর নামে লিখে রেখে গেছেন। বগলে কাগজের বান্ডিল আঁকড়ে, যেন হজরত মূসা আলাইহিস্ সালামকে দেওয়া লাওহে মোবারক। ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি, যা কেবল তাঁদের মুখে ফুটে, যাঁদের কৃতিত্বের পক্ষে আর কোনো প্রমাণ প্রয়োজন হয় না।
সালাম-দোয়ার পর বললেন, “বিশেষ আপনাকেই খুঁজে এসেছি। এই শহরে আমার কবিতাকে যদি কেউ বোঝে, তা আপনি ছাড়া আর কে?”
মুহূর্তে বুঝে গেলাম—কিছু প্রশংসা আসলে সুশ্রী হুমকি।
নম্র স্বরে বললাম, “শরীর ভালো নয়, ক্লাসে দেরি হচ্ছে, ছাত্রেরা অপেক্ষা করছে। সুবিধামতো আরেক দিন আসুন, পরিপূর্ণ সাদর সম্ভাষণ পেতেন।”
কিন্তু কবি আর ‘ফুরসত’-এর সম্পর্ক জেদ আর যুক্তির চিরশত্রুতার মতো।
সব অনুরোধ তিনি সে মমতায় উপেক্ষা করলেন, যেমন বিজয়ী সেনাপতি পরাজিতের শেষ মিনতি উপেক্ষা করে।
বললেন, “কেবল কয়েকটি শের।”
সাহিত্যাঙ্গনে ‘কয়েকটি শের’ এমন চাল, যার যথার্থ রূপ বোঝে কেবল ভুক্তভোগী। ঠিক যেমন—ডাক্তার বলেন, “সামান্য ব্যথা করবে”, বা সরকারি দপ্তর আশ্বাস দেয়, “দুই মিনিটেই কাজ শেষ।”
তিনি দিওয়ান খুললেন, আর খুলল আমার পরীক্ষা।
প্রথম শের বাতাসে ঝুলতেই মনে হল—মখমলে মোড়া হাতুড়ি কেউ আলতো করে মাথায় আঘাত করল। দ্বিতীয় শের—হাতুড়ি ততক্ষণে লোহায় পরিণত। তৃতীয় শের—ভাস্কর ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে আমার মগজে খোদাই শুরু করেছে।
শের নয়, গন্জালা। শব্দে শব্দে হুস্তোখুস্তো, যেন জোর করে এক মিসরায় গাদাগাদি। উপমা এমন যে উপমান নিজেই লজ্জায় চোখ নামায়। রূপক এমন, দেখে অর্থ ছুটে পালায়। কাফিয়া অসহায়, প্রত্যেক শেরের শেষে ভাগ্য বিলাপ করছে; রদীফ যেন শিকল বাঁধা বন্দী, প্রতিটি মিসরার সঙ্গে হেঁচড়ে চলে।
বাহরও বোধ করি প্রথমবার এমন অত্যাচারে বিদ্রোহী। নিশ্চয়ই আরূজের আত্মা কোথাও থাকলে তখন কাঁদছিল।
তাঁর কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের যে স্রোত, তা কেবল দুই ধরনের মানুষকে জোটে: অমিত প্রতিভা, অথবা যাঁরা জীবনে কমতি বুঝতেই শেখেননি।
কবিতা ফুরোয় না।
প্রতিটি গজলের শেষে বলেন, “আরেকটা ছোট নয্ম শুনুন।”
নয্ম শেষে জানান, “ওগুলো শুরুর লেখা, আসল রঙ এখনও বাকি।”
অবশেষে ‘আসল রঙ’ও এল; যেন রংধনু কেউ কয়লার খনায় পুঁতে দিয়েছে।
জীবনে অনেক অসহনীয় কবি দেখেছি। সাহিত্যের প্রতিটি যুগে এমন ব্যক্তিরা জন্মেছেন, যাঁরা কবিতার ওপর এমন নিপীড়ন চালিয়েছেন, যার খেসারত পরের বহু প্রজন্ম দেয়। কিন্তু এ ভদ্রলোক যেন তাদের সবার সর্বসম্মত নির্বাচিত সভাপতি।
পৃথিবীর সব দুর্বল শের একত্র করে আতর বানিয়ে, অন্তসার নিংড়ালেও হয়তো তাঁর একটি মিসরার তীব্রতায় পৌঁছাবে না।
আলতোই টের পেলাম, জ্বর বাড়ছে না—তাঁর শের আমার শিরায় মিশছে। মাথা ব্যথা নয়—প্রতিটি মিসরা মস্তকে নতুন ইট বসাচ্ছে, যতক্ষণে ভাবনার দালান গুঁড়িয়ে পড়ল।
সময়ও ক্লান্ত। ঘড়ির কাঁটাগুলো তাঁর কবিতা শুনে যেন অবসন্ন; একেক মিনিট পেরোয় শতাব্দীর দীর্ঘতায়, আর প্রতিটি শের একেকটি ছোট কেয়ামত।
অবশেষে তিনি কাগজ গুটোলেন। আমি মনে-মনে শোকর করলাম—ডুবে যাওয়া মাঝির মতো, দূরের তীরের প্রথম আলো দেখে।
কিন্তু আসল পরীক্ষা বাকি। নিষ্পাপ মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন লাগল?”
এ প্রশ্ন নয়—সত্য, সৌজন্য, মমতা ও অস্তিত্বের মধ্যে চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব।
এক পাশে সত্য, জিহ্বায় উঠে আত্মহত্যা করতে চায়। অন্য পাশে সংবেদনশীল কবির হৃদয়, সামান্য সমালোচনায়ও রক্তাক্ত হতে পারে।
জীবনে কখনো এত শ্রমে মিথ্যা বলিনি, যতটা লাগল খুচরো প্রশংসা উচ্চারণে।
“অসাধারণ! কিছু শের তো সত্যিই অনন্য! আপনি তো নতুন রূপক সৃষ্টি করেছেন!”—বলতে-বলতে আত্মা নিজের কানেই নিঃশব্দে ক্ষমা চাইছিল।
তিনি তৃপ্ত চিত্তে বিদায় নিলেন, আর আমি চেয়ারে ঢলে পড়লাম—যুদ্ধ জিতে, তবু সব শক্তি রণাঙ্গনে ফেলে আসা সেনার মতো।
সেদিন ক্লাসে দেরি হল, তবু বিশ্বাস করি—সকালের সে অভিজ্ঞতায় এমন এক পাঠ শিখলাম, যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নেই।
এখন নিশ্চিত জানি, শাস্তি কেবল আখেরাতের জন্য নয়।