শিরোনাম : বিদায়ের মুহূর্ত
———-
|১৫|০৩|২০২৬|
بسم الله الرحمن الرحيم
আজ রমজানুল মোবারকের ছাব্বিশতম দিন। হৃদয় এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ডুবে আছে। মনে হয় যেন সেদিনই আকাশ থেকে রহমতের কাফেলা আমাদের দুয়ারে এসে নেমেছিল, আর আজ সেই কাফেলাই ফেরার প্রস্তুতিতে উটের লাগাম গুটিয়ে নিচ্ছে।
এখনো তো তার পদধ্বনি আমাদের আঙিনায় সতেজ, এখনো তো তার সুগন্ধ বাতাসে ভেসে আছে, অথচ সেই প্রিয় অতিথিই আজ নিঃশব্দে বিদায় নিতে উদ্যত; যেন সন্ধ্যার ম্লান আলোয় কোনো পথিক শেষবারের মতো পেছনে ফিরে তাকায়, তারপর দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যায়।
রমজান কোনো সাধারণ মাস ছিল না। যেন আসমানের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক সম্মানিত দূত, যার আঁচলে ছিল রহমতের মুক্তা, মাগফিরাতের রত্ন আর কবুলিয়তের প্রদীপ।
সে আমাদের ঘরে প্রবেশ করেছিল এমনভাবে, যেমন গভীর অন্ধকার রাতে হঠাৎ চাঁদ উঠে চারদিককে রুপালি আলোয় ভরিয়ে দেয়। তার সঙ্গে ছিল এমন সব মুহূর্ত, যখন পৃথিবীতে ফেরেশতাদের কাফেলা নেমে আসে এবং আকাশের দরজাগুলো খুলে যায়।
কিন্তু আফসোস… হাজার আফসোস!
আমরা এই অতিথির যথার্থ মর্যাদা দিতে পারিনি।
তার অভ্যর্থনায় যে প্রদীপগুলো জ্বলার কথা ছিল, আমরা তা জ্বালাতে পারিনি। আমাদের হৃদয়ের জানালাগুলো বন্ধই রয়ে গেল, আর রহমতের বাতাস নীরবে বয়ে গিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। রমজান আমাদের দরজায় কড়া নাড়তেই থাকল, অথচ আমরা দুনিয়ার নিরর্থক ব্যস্ততায় এমনভাবে ডুবে ছিলাম, যেন কোলাহলমুখর কোনো বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ কারো ডাকে সাড়া দিতে পারে না।
আমাদের জিহ্বা তো বারবার “রমজান, রমজান” বলেছে, কিন্তু আমাদের রাতগুলো অশ্রুহীনই থেকে গেছে। আমাদের ঠোঁট এই মাসের নাম উচ্চারণ করেছে, কিন্তু আমাদের হৃদয় তার ব্যথা ও তার আলো—দুটো থেকেই বঞ্চিত রয়ে গেছে।
আমরা যেন সেই মানুষের মতো, যার সামনে আলোয় ভরা এক সমুদ্র ঢেউ খেলছে, অথচ সে তৃষ্ণার্ত হয়েও এক ফোঁটা পানিও পান করতে পারে না।
এই মাস ছিল বসন্তের সেই সংক্ষিপ্ত ঋতুর মতো, যখন প্রতিটি শাখায় রহমতের ফুল ফোটে এবং চারদিকে মাগফিরাতের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। অথচ আমরা সেই বাগানে এসেও শরতের পথিকের মতো পা ফেলেছি। ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার বদলে আমরা গাফিলতির ধুলোই নিজেদের আঁচলে ভরে নিয়েছি।
রমজান ছিল যেন আকাশ থেকে নেমে আসা নূরের এক নদী, যে নদীতে ডুব দিলে মানুষ তার আঁচলে মাগফিরাতের মুক্তা ভরে নিতে পারে। কিন্তু আমরা তীরে বসেই রয়ে গেলাম। ঢেউয়ের শব্দ শুনেছি, অথচ আমাদের পা পানির দিকে বাড়াতে পারিনি।
এখন সেই নদী ফিরে যাওয়ার পথে, আর আমাদের হাতদুটি শুকনো বালুর মতোই শূন্য পড়ে আছে।
আজ যখন এই অতিথির বিদায়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, হৃদয় কেঁপে ওঠে। মনে হয় যেন কোনো সম্মানিত অতিথি আমাদের ঘর থেকে চলে যেতে উদ্যত, আর আমরা হঠাৎ চমকে উঠে দেখি, আমরা তো তার জন্য কোনো সেবাই করিনি!
না আমরা তার সামনে হৃদয়ের প্রদীপ জ্বালিয়েছি, না তার আগমনের মর্যাদা রক্ষা করেছি।
কে জানে, আগামী বছর আমরা বেঁচে থাকব কি না?
কে জানে, আগামী রমজান আমাদের চোখে ধরা দেবে কি না?
এই চিন্তা হৃদয়কে এমনভাবে বিদীর্ণ করে, যেন নীরব রাতের বুকে তীব্র বাতাস গাছের ডালপালা ভেঙে ছুটে যায়।
এখন রমজানের শেষ নিঃশ্বাসগুলো বাকি। কয়েকটি রাত, আর সেই রাতগুলোর আঁচলে লুকিয়ে থাকতে পারে সেই রাতও, যাকে বলা হয় লাইলাতুল কদর; যে রাতের একটি মুহূর্তও হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।
হয়তো এখনো এই অতিথির হাতে আমাদের জন্য মাগফিরাতের কোনো উপহার রয়ে গেছে। হয়তো সে বিদায় নেওয়ার সময় একবার ফিরে তাকাবে আমাদের দিকে।
যদি আমরা এখনো জেগে উঠি…
যদি আমাদের হৃদয়ে অনুতাপের অশ্রু নেমে আসে…
যদি আমাদের চোখ থেকে পাপস্বীকারের ফোঁটা ঝরে পড়ে…
তবে হয়তো বিদায় নিতে থাকা এই অতিথি আমাদের খালি ঝুলিতে রহমতের কয়েকটি তারা ফেলে দেবে।
কারণ রমজান এমন এক অতিথি, যে বিদায়ের সময়ও তার আতিথেয়তার ঘরের দরজায় দোয়ার সুবাস রেখে যায়। তবে শর্ত একটাই— গৃহকর্তার হৃদয়ে যেন নিজের ত্রুটির অনুভূতি জেগে ওঠে।
হায়! যদি তার চলে যাওয়ার আগে আমরা আমাদের হৃদয়ের দরজাগুলো খুলে দিতে পারতাম।
হায়! যদি তার পায়ের কাছে আমাদের অশ্রুগুলো রেখে দিতে পারতাম।
কিন্তু হয়তো এমন হবে না,
আগামীকাল যখন এই অতিথি চলে যাবে, তখন আমাদের হৃদয়ে কেবল একটি বাক্যই প্রতিধ্বনিত হবে—
“হায়! যদি আমরা রমজানের মর্যাদা সত্যিই উপলব্ধি করতে পারতাম…”
————–
ক্যাটাগরি : রামাদান, তাজকিয়াহ, নাসিহাহ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8696