শিরোনাম : প্রতিটি পরিকল্পনায় মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত রাখুন
৭/২/২০২৬
মানুষ এমন এক সত্তা, যে ভবিষ্যতের ভেতর বাস করে। তার দেহ থাকে বর্তমান মুহূর্তে, কিন্তু চিন্তা ভ্রমণ করে আগামীর পথে। সে সম্ভাবনাগুলো গুছিয়ে নেয়, সময়কে মাপে, অগ্রাধিকার স্থির করে, আর নিজের অস্তিত্বকে দেখে এক ক্রমবিস্তৃত দিগন্তের মধ্যে। কিন্তু এই শক্তির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সে পরিকল্পনা করে, অথচ পরিকল্পনার টেবিলে মৃত্যুর জন্য একটি চেয়ার খালি রাখে না।
এটি কেবল আবেগগত অসতর্কতা নয়; বরং এক গভীর অস্তিত্বগত ভুল। মানুষ নিজেকে যেন এক অবিরাম চলমান প্রকল্প ভেবে নেয়, অথচ বাস্তবে সে একটি সীমিত মেয়াদ মাত্র। সে জীবনকে ব্যবহার করে এমনভাবে, যেন জীবন তার মালিকানাধীন; অথচ সত্য হলো, সে নিজেই জীবনের কাছে সঁপে দেওয়া। সে এমনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, যেন সময় তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে; অথচ সত্য হলো, সময়ই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এখানে কাজ করে এক সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা। মানুষ মৃত্যুকে অস্বীকার করে না। সে জানে, তার কথা বলে, জানাজায় শরিক হয়। কিন্তু নিজের ব্যাপারে তাকে তাৎক্ষণিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে না। মৃত্যু জ্ঞানে উপস্থিত থাকে, কিন্তু কর্মের ব্যবস্থায় অনুপস্থিত হয়ে যায়। আর এই অনুপস্থিতিই মানবিক ভুলের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যখন সমাপ্তি দৃষ্টির বাইরে সরে যায়, তখন নির্বাচন বিকৃত হয়ে পড়ে। অস্থায়ী বিষয়গুলো স্থায়ী বলে মনে হয়, আর চিরন্তন সত্যগুলো অপ্রাসঙ্গিক ও দূরের মনে হয়। মানুষ ক্ষুদ্র লাভের জন্য বড় নীতিকে ত্যাগ করে, সামান্য স্বস্তির জন্য মহৎ দায়িত্বকে পিছিয়ে দেয়। কারণ তার মনে নীরবে কাজ করে একটি ধারণা—এখনো অনেক সময় আছে।
অথচ দার্শনিক সততার দাবি ঠিক তার বিপরীত। যে ঘটনার আগমন নিশ্চিত, তাকে উপেক্ষা করে গড়া প্রতিটি কৌশলই যুক্তিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। এ যেন এমন এক যাত্রী, যে গন্তব্যকে গুরুত্বহীন ভেবে যাত্রার প্রস্তুতি নেয়। সে হয়তো রওনা দেবে, কিন্তু প্রজ্ঞার সঙ্গে নয়।
পরিকল্পনায় মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ জীবনকে অস্বীকার করা নয়; বরং জীবনকে তার প্রকৃত কাঠামোয় দেখা। এই মুহূর্তেই মানুষ তার আকাঙ্ক্ষার পুনর্বিন্যাস করে। তখন প্রশ্ন বদলে যায়। আমি কী অর্জন করতে চাই? এই প্রশ্নের জায়গায় আসে—আমি কোন অবস্থায় ফিরে যেতে চাই?
এই পরিবর্তন মানুষের নৈতিক চেতনায় এক বিপ্লব ঘটায়। প্রতিটি কাজের আগে সে নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে শুরু করে। সে ভাবে, এটাই যদি আমার শেষ দিন হতো, তবে কি আমি এটিই করতাম। যদি এখনই পর্দা নেমে যায়, তবে কি এই দৃশ্য বদলানোর সুযোগ থাকত।
এই প্রশ্ন মূলত যুক্তিসংগত, ধর্মীয় তার পরের বিষয়। সীমিত জীবনে কাজের মানে আসে পরিণতিকে সামনে রাখার মাধ্যমে। সমাপ্তি ছাড়া অর্থ নেই, আর জবাবদিহি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তই গুরুতর হয়ে ওঠে না।
মৃত্যুর স্মরণ আকাঙ্ক্ষাকে ধ্বংস করে না; বরং তাকে শালীন করে। সম্পর্ককে কমিয়ে দেয় না; গভীর করে তোলে। যে জানে সাক্ষাৎ সীমিত, সে তাকে তুচ্ছ করে না। যে জানে সময় ফিরে আসে না, সে তাকে অপচয়ে নির্দ্বিধা থাকে না। যে বোঝে হিসাব দিতে হবে, সে নিজের প্রবৃত্তিকে লাগামহীন ছেড়ে দেয় না।
এর বিপরীতে, যে মৃত্যু থেকে গাফিল, সে সর্বদা স্থগিতের মধ্যে বাঁচে। সে ভালো হওয়ার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু আজ নয়। দায়িত্ব পালনের ভাবনা রাখে, কিন্তু এখনই নয়। ফিরে আসার সংকল্প করে, কিন্তু একটু পরে। তার পুরো নৈতিকতা দাঁড়িয়ে থাকে ‘পরে’ নামক ভরসার ওপর, অথচ ‘পরে’ বলে কোনো নিশ্চয়তা তার হাতে নেই।
অস্তিত্বগত সত্য হলো, মৃত্যুই জীবনকে ওজন দেয়। এই সীমাবদ্ধতাই মুহূর্তকে মূল্যবান করে তোলে। এই ক্ষয়ই দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়। মানুষ যদি চিরকাল বেঁচে থাকত, তবে হয়তো কোনো সিদ্ধান্তই জরুরি মনে হতো না, কোনো নেক কাজ অপরিহার্য লাগত না, কোনো জুলুম বিপজ্জনক মনে হতো না। পরিণতিই কাজকে অর্থ দেয়।
আসল ট্র্যাজেডি মৃত্যু নয়। আসল ট্র্যাজেডি হলো, মানুষ এমনভাবে মারা যায়, যেন সে কখনো মৃত্যুর সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েই দেখেনি।
আপনি যখন পরবর্তী পরিকল্পনা করবেন, যখন আপনার শ্রমের দিক নির্ধারণ করবেন, যখন আপনার স্বপ্ন নির্মাণ করবেন, তখন একটি সত্যকে চিন্তার কেন্দ্রে রাখুন। এসব কিছু হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যেতে পারে। আর এর পরও আমি থেকে যাব, আমার কাজগুলো নিয়ে।
তারপর দেখবেন, আপনার অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে বদলে যায়। যেসব বিষয়ের জন্য আপনি জীবন বাজি রাখতেন, সেগুলো অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। আর যেসব কাজ আপনি বারবার পিছিয়ে দিচ্ছিলেন, সেগুলো তৎক্ষণাৎ জরুরি হয়ে উঠবে।
মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ভবিষ্যৎ গড়া নয়; ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে মৃত্যুকে উপেক্ষা করা।
যে ব্যক্তি তার প্রতিটি পরিকল্পনায় মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, সে-ই প্রথমবারের মতো প্রকৃত অর্থে বাঁচতে শুরু করে।
———-
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা