|০৩ |মার্চ |২০২৬|
❖ প্রশ্ন
প্রিয় শাইখ আকরাম,
আমাদের সমাজে মৃত্যুর পরিস্থিতিকে ঘিরে একটি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। যেমন—কেউ যদি জুমার দিনে ইন্তিকাল করেন, রমজান অথবা মক্কা বা মদিনার মতো পবিত্র স্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তবে সেটিকে বিশেষ সন্তুষ্টির নিদর্শন বলে বিবেচনা করা হয়। জানাজার খুতবায় ইমামগণ এ-সংক্রান্ত বর্ণনা উল্লেখ করেন; এবং প্রায়ই বলা হয়, এসব পরিস্থিতি আখিরাতে বিশেষ অনুগ্রহ
বা নিরাপত্তা ইঙ্গিত বহন করে।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই আমার মনে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে, যে বিষয়গুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, প্রায় ঘটনাচক্রের মতো, সেগুলোর ওপর এত গুরুত্ব আরোপ করা কতটা সঙ্গত? কুরআনের মৌলিক নীতি তো বলছে, আখিরাতে মানুষের পরিণতি মূলত নির্ধারিত হবে তার “কাসব” অর্থাৎ সে কী বিশ্বাস করেছে, কী নিয়ত পোষণ করেছে, এবং জীবনে কী বেছে নিয়েছে তার ওপর।
শরিয়তের মূলনীতির আলোকে নির্দিষ্ট দিন বা স্থানে মৃত্যুবরণ সম্পর্কিত এসব বর্ণনাকে আমরা কীভাবে বুঝব?
# যুবাইর চোথিয়া
❖ উত্তর
মুসলিম সমাজে এমন ধারণা অপ্রচলিত নয় যে, জুমার দিনে, রমজানে, অথবা পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় মৃত্যুবরণ করা বিশেষ পবিত্র অনুগ্রহের লক্ষণ এবং সৌভাগ্যময় পরিণতির ইঙ্গিত। জানাজার খুতবায় প্রায়ই এ-ধরনের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয় আশার কারণ হিসেবে। সমসাময়িক কিছু আলেমও কখনো কখনো উল্লেখ করেছেন যে, মক্কার মসজিদুল হারাম কিংবা মদিনার নববী মসজিদে মৃত্যুবরণ করা এমন এক আলামত, যা একজন মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে কল্যাণের প্রত্যাশা জাগায়।
এসব বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণত হাদিসের সেই বর্ণনাগুলোর উল্লেখ থাকে, যেখানে মদিনার ফজিলত ও সেখানে মৃত্যুবরণের কাম্যতার কথা বলা হয়েছে; আবার এমন কিছু রেওয়ায়েতও উদ্ধৃত হয়, যেখানে উত্তম পরিণতির বিভিন্ন লক্ষণের আলোচনা এসেছে।
তবু একটি মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন থেকেই যায়: ইসলামে কি মৃত্যুর সময় বা স্থান (নিজ গুণে) নাজাতের নিশ্চয়তা দেয়? অর্থাৎ একজন মানুষের ঈমান ও নৈতিক সাধনার বাইরে কেবল নির্দিষ্ট দিন বা শহরে মৃত্যুবরণ করাই কি আখিরাতে মুক্তির স্বাধীন কারণ হতে পারে?
এই প্রশ্নের সঙ্গত উত্তর পেতে হলে বিষয়টিকে কুরআনের জবাবদিহিতার শিক্ষার আলোকে বিবেচনা করতে হবে, যা ইসলামী ন্যায়বোধের মূলস্তম্ভ।
কুরআন অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে, কোনো প্রাণ অন্য কারও বোঝা বহন করবে না; মানুষ কেবল সেইটুকুই পাবে, যার জন্য সে নিজে চেষ্টা করেছে; তার চেষ্টা অবশ্যই প্রতিফলিত হবে, এবং তাকে পূর্ণমাত্রায় প্রতিদান দেওয়া হবে। এই আয়াতগুলো এক অনড় নৈতিক কাঠামো নির্মাণ করে। আল্লাহর পুরস্কার বা শাস্তি খেয়ালখুশি, আবেগ কিংবা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা প্রতিষ্ঠিত সচেতন ইচ্ছাশক্তির ওপর—ঈমান, নিয়ত ও কর্মের ওপর।
আখিরাতে যে বস্তু মানুষের উপকারে আসবে, তা হলো ঈমান এবং সৎকর্ম, যা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আনুগত্য, সততা ও আল্লাহভীতির বাস্তব প্রকাশ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সময় ও স্থান নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ মর্যাদার ভিত্তি হতে পারে না। একজন মানুষ সাধারণত নিজের মৃত্যুর নির্দিষ্ট মুহূর্ত নির্ধারণ করতে পারে না; এমনকি কোথায় তার শেষ নিঃশ্বাস হবে, তাও পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এগুলো আল্লাহর তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত।
যদি এমন হতো যে, শুধু কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা বিশেষ কোনো শহরে মৃত্যুবরণ করলেই (কর্ম ও চেষ্টা ছাড়া) চিরস্থায়ী সৌভাগ্য নিশ্চিত হয়ে যায়, তবে আল্লাহর ন্যায়বিচারের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেত। তখন মানুষের পরিণতি নির্ভর করত এমন বিষয়ের ওপর, যা তার নিজের চেষ্টা ও সিদ্ধান্তের বাইরে। অথচ কুরআন স্পষ্ট করে বলেছে :
মানুষ কেবল তার নিজের অর্জনের ফলই পাবে।
এই মূলনীতি পবিত্র স্থানসমূহের স্বীকৃত মর্যাদাকে অস্বীকার করে না। রাসূলুল্লাহ সা. মদিনায় বসবাসকে উৎসাহিত করেছেন এবং বর্ণিত আছে; যে সেখানে মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম, সে যেন তা-ই করে; কারণ তিনি সেখানে মৃত্যুবরণকারীদের জন্য সুপারিশ করবেন। প্রবীণ আলেমগণ এ কথাকে এমন নির্দেশ হিসেবে বোঝেননি যে মানুষ নিজেই মৃত্যুর মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করবে, যা তার ক্ষমতার বাইরে। বরং তাঁরা এটিকে মদিনায় অবিচলভাবে অবস্থান করার প্রতি উৎসাহ হিসেবে দেখেছেন, যাতে বরকতময় সেই পরিবেশেই মৃত্যু ঘটতে পারে। তাঁদের দৃষ্টিতে এটি ছিল সেখানে ঈমানসহ বসবাসকারীদের জন্য সুসংবাদ এবং নগরীর বিশেষ মর্যাদার ইঙ্গিত।
অনুরূপভাবে সহিহ বর্ণনায় এসেছে, হযরত মূসা (আ.) তাঁর মৃত্যুকালে পবিত্র ভূমির নিকটে পৌঁছে দেওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন। শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ এখান থেকে নেক স্থানসমূহে দাফনের কাম্যতা এবং সৎলোকদের সান্নিধ্যের মাহাত্ম্য অনুধাবন করেছেন। এ ব্যাপারটিও সকলের জানা যে, বিশিষ্ট সাহাবিগণ নবীজির সান্নিধ্যে সমাহিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন; এবং দ্বিতীয় খলিফা গভীর আগ্রহে তাঁর পাশেই (প্রথম খলিফার সঙ্গে) শায়িত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন, যা তিনি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশা বলে গণ্য করতেন।
এ কারণেই সমসাময়িক আলেমদের কেউ কেউ বলেছেন, মক্কার মসজিদুল হারাম বা মদিনার নববী মসজিদে মৃত্যুবরণ উত্তম পরিণতির সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর একটি হতে পারে। তবে এখানে মূল শব্দটি হলো “আশা”। যারা এসব হাদিস উদ্ধৃত করেন, তারাও সতর্কভাবে উল্লেখ করেন যে, এমন পরিস্থিতি ঈমান ও সৎকর্ম ছাড়া চূড়ান্ত সৌভাগ্যের নির্ণায়ক প্রমাণ নয়। মৃত্যুর স্থান উৎসাহের কারণ হতে পারে, নিশ্চয়তার দলিল নয়; সম্মানের ইঙ্গিত হতে পারে, মুক্তির স্বতন্ত্র ভিত্তি নয়।
রাসূলুল্লাহ সা. উত্তম পরিণতির সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু আলামতের কথাও উল্লেখ করেছেন: মৃত্যুর মুহূর্তে ঈমানের সাক্ষ্য উচ্চারণ; মুমিনের কপালে ঘাম থাকা; জুমার দিন বা তার রাতে মৃত্যুবরণ; ইবাদতের মধ্যে থাকা অবস্থায় মৃত্যু; আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া, নির্দিষ্ট কিছু মৃত্যুর ধরনসহ; সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে করতে অবিচল থাকা; এবং জীবনের অন্তিম প্রহরে আল্লাহ সম্পর্কে শুভ ধারণা পোষণ করা। এসব বর্ণনাকে একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, উত্তম পরিণতি মূলত চিহ্নিত হয় ঈমান, আন্তরিকতা, ইবাদতনিষ্ঠা ও আধ্যাত্মিক সচেতনতায়; কেবল পরিস্থিতির দ্বারা নয়।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য অনিবার্য। নামাজ, রোজা, হজ বা কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা গুণগতভাবে ভিন্ন, শুধু এমন মাসে মৃত্যুবরণ করা থেকে, যখন অন্যরা রোজা রাখছে; অথবা এমন এক সপ্তাহের দিনে, যার সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। প্রথম ক্ষেত্রে মৃত্যু সংঘটিত হয় এক স্বেচ্ছায় গৃহীত আনুগত্যের কর্মের ভেতরে। ব্যক্তি তখন সক্রিয়ভাবে ইবাদতে রত; তার শেষ অবস্থা তার নির্বাচিত আল্লাহমুখী অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। তাই এমন ব্যক্তির জন্য কল্যাণের আশা করা বোধগম্য, কারণ তার মৃত্যু ঘটেছে সচেতন উপাসনার মধ্যে, সেই সাধনার অন্তরে যার ওপর প্রতিদান নির্ভরশীল।
কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দিনটি নিজে কোনো আমল নয়। জুমার দিনে (যদি সে মুহূর্তে কোনো আনুগত্যের কর্মে নিযুক্ত না থাকে) মৃত্যুবরণ করা এমন কিছু নয়, যা ব্যক্তি নিজে সম্পাদন করেছে। এটি কেবল সময়ের একটি আকস্মিক মিল। যদিও কিছু বর্ণনায় ঐ দিনে মৃত্যুবরণকারীকে নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার হাত থেকে সুরক্ষার কথা এসেছে, তবু সেগুলোকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, যা ঈমান ও নৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নাজাত নির্ভরশীল, এই মৌলিক নীতিকে বাতিল করে দেয়। কোনো পাঠ যদি সময় বা স্থানের জন্য বিশেষ মর্যাদা নির্ধারণ করেও, তা অবশ্যই সেই বৃহত্তর কুরআনিক কাঠামোর ভেতরেই বুঝতে হবে, যা প্রতিদানকে নৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে আবদ্ধ করে।
ইসলামের সামগ্রিক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও এ সিদ্ধান্তকে দৃঢ় করে। আখিরাতে যার পাল্লা ভারী হবে, তাকে তার মৃত্যুর স্থান দিয়ে চিহ্নিত করা হবে না ; বরং চিহ্নিত করা হবে তার জীবনের চরিত্র দিয়ে। সে সেই ব্যক্তি, যে এক আল্লাহর ইবাদত করে; অন্যায়, রক্তপাত ও আমানতের খিয়ানত থেকে বিরত থাকে; মিথ্যা ও ফাসাদ থেকে নিজেকে রক্ষা করে; নিজের জন্য যা ভালোবাসে, অন্যের জন্যও তা-ই ভালোবাসে; ক্রোধ সংযত করে ও ক্ষমা করে; পরিবার ও সমাজে উৎকর্ষের সঙ্গে আচরণ করে।
এইসবই সেই সাধনা, যাকে কুরআন ঘোষণা করেছে, দেখা হবে এবং পূর্ণমাত্রায় প্রতিদান দেওয়া হবে। এগুলো ভূগোল বা সময়ের আকস্মিকতা নয়; বরং ঈমানের ধারাবাহিক ও জীবন্ত প্রকাশ।
অতএব, পবিত্র স্থানে মৃত্যুবরণ আশার কারণ হতে পারে, যদি তার জীবন নেক আমলে পূর্ণ থাকে। কিন্তু মুক্তি দেয় না মাটি বা বিশেষ কোনো দিন। চূড়ান্ত কল্যাণ নির্ভর করে মানুষের ঈমান ও সৎকর্মের ওপরই।
সবশেষে বলা যায়, ইসলামী আকীদা এক সূক্ষ্ম অথচ অপরিহার্য ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি বরকতময় স্থানগুলোর ফজিলত স্বীকার করে; আনুগত্যের অবস্থায় মৃত্যুবরণের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য মেনে নেয়; ইবাদতের সঙ্গে মৃত্যু মিলে গেলে কিংবা পবিত্র পরিবেশে শেষ নিঃশ্বাস ঘটলে আশা করার অবকাশ দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে অবিচল স্পষ্টতায় ঘোষণা করে, দিব্য বিচারের ভিত্তি হলো ব্যক্তিগত সাধনা। মানুষ কেবল তাই পাবে, যা সে সত্যিকার অর্থে কামনা করেছে এবং কর্মে রূপ দিয়েছে।
চূড়ান্ত সৌভাগ্য নির্ধারিত হয় না জীবনের শেষ মুহূর্তের আকস্মিকতায়; নির্ধারিত হয় সমগ্র জীবনের ঈমান ও আমলের দ্বারা । আখিরাতে স্থায়ী সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেখানেই, অন্য কোথাও নয়।
————–
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা, নাসিহাহ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8591