AkramNadwi

শিরোনাম: দেওবন্দি চিন্তাধারা ও ইমাম মাহদির আগমন —

শিরোনাম: দেওবন্দি চিন্তাধারা ও ইমাম মাহদির আগমন
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১০/৬/২০২৬

|| প্রশ্ন

সম্প্রতি আমি তিউনিসের খ্যাতনামা ধর্মগ্রন্থের ভাষ্যকার, আইনজ্ঞ এবং বহুমাত্রিক আলেম শায়খ মুহাম্মদ আত-তাহির ইবনু আ’শূরের “আল-মাহদী আল-মুনতাযার” শীর্ষক একটি রচনা পাঠ করেছি। সেখানে তিনি লিখেছেন—
“ধর্মের অপরিহার্য কর্তব্য তিন প্রকার: আকীদা, আমল ও আদাব। শেষ যুগে ইমাম মাহদির আবির্ভাবে ঈমান আনা এ তিনটির কোনো একটিতেও অন্তর্ভুক্ত নয়; এটি সে সব আকীদার অংশ নয়, যেগুলিতে একজন মুসলমানের অবিশ্বাস শরিয়ত-দৃষ্টিতে অবৈধ। সুতরাং কেউ চাইলে মাহদির আবির্ভাবে বিশ্বাস রাখতে পারে, আবার না-ও রাখতে পারে; এ দুই অবস্থার কোনোটিই তার ঈমানকে প্রভাবিত করে না।”

এই দৃষ্টিভঙ্গি উপমহাদেশে প্রচলিত সাধারণ ধর্মীয় ধারা থেকে যথেষ্ট ভিন্ন মনে হয়, যেখানে ইমাম মাহদির আগমনে ঈমানকে প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ আকীদাগত বিষয় বলে ধরা হয়। কোনো কোনো মহলে এ সম্পর্কে প্রশ্ন তুললে, নতুন করে ভেবে দেখলে, বা প্রচলিত আখ্যান থেকে ভিন্নমত বা সংশয় প্রকাশ করলে কঠিন ধর্মীয় পরিণতি ডেকে আনার হুমকি দেওয়া হয়।
আমার প্রশ্ন, উপমহাদেশের আলেমদের—বিশেষত দেওবন্দি মাকতাবের আলেমদের—মধ্যে এমন কেউ কি ছিলেন, যাঁরা ইবনু আ’শূরের অনুরূপ মত গ্রহণ করেছেন এবং স্পষ্ট বলেছেন যে মাহদির আগমনে বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক ও অপরিহার্য আকীদার অন্তর্ভুক্ত নয়?
—জুবায়ের চৌথিয়া, ইংল্যান্ড

|| উত্তর
আপনি আল্লামা মুহাম্মদ আত-তাহির ইবনু আ’শূর রাহিমাহুল্লাহর যে উদ্ধৃতি পেশ করেছেন, তা একটি অত্যন্ত মৌলিক ও নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করে: ইমাম মাহদির আবির্ভাবে বিশ্বাস কি সেই সব আকীদার ভেতর পড়ে, যেগুলো মানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য শরিয়ত-অনুমদিত ওয়াজিব, নাকি এটি এমন একটি ইখতিলাফি ইশু যেখানে মতভেদের অবকাশ রয়েছে?

এর জবাব দিতে গিয়ে প্রথমেই দুটি ভিন্ন বিষয়ের ভেদ করা জরুরি। এক. কোনো বিষয়ের সম্পর্কে হাদিস আছে কি নেই, কিংবা সেসব হাদিস কোনো কোনো আলেম গ্রহণ করেছেন কি করেননি। দুই. সেই বিষয়টিকে ইসলামের মৌলিক, অপরিহার্য ও সিদ্ধান্তগত আকীদার অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে কি হবে না। অনেকে এমন বহু বিষয়ে হাদিস গ্রহণ করেছেন, তবু সেগুলিকে ইমানের রুকন বা দীনী জরুরিয়াতের তালিকায় রাখা হয়নি। ইমাম মাহদির প্রসঙ্গেও মূল বিতর্ক এখানেই।

আল্লামা ইবনু আ’শূরের বক্তব্য এই নয় যে মাহদির আবির্ভাবের আকীদা রাখা ভুল; বরং তাঁর মূল কথা—এটি সে সব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার গ্রহণ বা অস্বীকারের ওপর একজনের ইসলাম নির্ভরশীল। ফলে কেউ মাহদির আবির্ভাবে বিশ্বাস করুন বা না করুন—তার ঈমান ও ইসলাম অপরিবর্তিত থাকে।

উপমহাদেশের বিদ্যাচর্চা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণভাবে মাহদির আগমনের ধারণা গৃহীত হলেও, বিভিন্ন মাকতাবের ভিতর এমন আলেমও ছিলেন, যাঁরা ঐতিহ্যিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করেছেন, সংশ্লিষ্ট হাদিসকে দুর্বল বলেছেন, অথবা কমপক্ষে এটিকে ইসলামের আবশ্যিক আকীদা গণ্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়ে সর্বত্র সর্বকালীন ঐকমত্য রয়েছে—এ ধারণা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।

এখানে ইমাম আবু জা’ফর তাহাবি (৩২১ হি.)-র প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-আকীদাতুত তাহাবিয়া” অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই গ্রন্থটি আহলে সুন্নাহ, বিশেষ করে হানাফীদের আকিদার সবচেয়ে বিখ্যাত ও বহুল স্বীকৃত সারসংক্ষেপগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়। তাকেই ইমাম তাহাবি ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের আকীদার প্রতিফলন হিসেবে রচনা করেন। শত শত বছর ধরে এটি বহুমতের মাদরাসায় পাঠ্য ও সর্বজনস্বীকৃত। লক্ষ্যণীয়—পুরো গ্রন্থে ইমাম মাহদির উল্লেখই নেই। কোনো আকীদার গ্রন্থে কোনো প্রসঙ্গ না-থাকা তার বাতিলতার প্রমাণ নয়, তবে যখন কোনো সার্বজনীন আকীদার কিতাবে এটি স্থান পায়নি, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, একে ‘সকল মুসলমানের জন্য অপরিহার্য বিশ্বাস’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। এই দিক থেকে ইবনু আ’শূরের অবস্থান ক্লাসিকাল আকীদা-সম্পাদনার ধারার বাইরে বা বিচ্ছিন্ন নয়।

উপমহাদেশেও বিভিন্ন ধারার বহু আলেম মাহদির প্রসঙ্গ ঘিরে আসা হাদিস গ্রহণ করেননি, বা সেগুলিকে দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। তাঁদের মতে এই ধ্যানধারণা মূলত শিয়া বর্ণনা, রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরবর্তী ধর্মীয় কল্পনালোক দ্বারা প্রভাবিত। এ ধারার মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয়—মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, আল্লামা তামন্না ইমাদি ফলোয়ারি, আল্লামা শাহ মুহাম্মদ জাফর নাদভী, আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল ও মাওলানা আমীন আহসান ইসলাাহী প্রমুখ।

এঁদের মতামতে আংশিক পার্থক্য থাকলেও একটিই যৌথ দিক—কোনো ক্ষেত্রেই মাহদির প্রশ্নকে ইসলামের মৌলিক আকীদা বলে ধরা হয়নি; বরং অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট হাদিসের সনদগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লামা তামন্না ইমাদি মজিবী ফলোয়ারির নাম বিশেষভাবে উজ্জ্বল। তিনি “ইন্তিজারে মাহদি ও মসীহ” শীর্ষক একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থে মাহদি ও ঈসা (আ.)-এর

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *