শিরোনাম: তাযকিয়া
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১২/৬/২০২৬
আজ ইনশাআল্লাহ্ আমি আমাদের ঐতিহ্যে ‘তাযকিয়া’-র অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করব। আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকবে—লোভ, হিংসা, ঈর্ষা, অহংকার, ক্রোধ, সংকল্পের আলসেমি ইত্যাদির মতো অন্তরের রোগ থেকে নফসকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়টি। যেমন ভাঙা হাড় দেহের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে দৃশ্যমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে—বেদনাদায়ক কষ্টে কোনো কিছু ধরা-বহন করা যায়, খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে চলা যায়, কিন্তু স্বাভাবিক হাঁটা-দৌড়ানো যায় না—তেমনি হৃদয়ের রোগগুলির প্রভাবও বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য; এর কুপ্রভাব ব্যক্তি-স্বয়ং ও অন্য সকলের ওপর পড়ে। পার্থক্য হলো, ভাঙা হাড় চোখে দেখা যায়; অথচ এই অভ্যন্তরীণ ব্যাধিগুলো সাধারণত অদৃশ্য, এমনকি টের পাওয়াই কঠিন। সুতরাং এসব রোগ মোকাবিলা ও নিরাময়ের তদবির শারীরিক ফিজিওথেরাপির চেয়ে বহু কঠিন, দীর্ঘস্থায়ী ও অধিকতর কঠোর আত্ম-অনুশাসন দাবি করে।
ইনশাআল্লাহ্ আমি হৃদয়ের কয়েকটি প্রচলিত ব্যাধি এবং সেগুলোর মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় স্ব-শৃঙ্খলার কথা সংক্ষেপে তুলে ধরব—কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমাদের ঐতিহ্যে লোভ, হিংসা ইত্যাদি নিষ্পেষণের যেসব নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলোর আলোকে। তবে তার আগে তাযকিয়ার সামগ্রিক প্রকৃতি ও লক্ষ্য নিয়ে প্রাথমিক কয়েকটি ভাবনা পেশ করা জরুরি; কারণ যে-কোনো বৃহৎ সাধনা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সহজ হয়, যদি আমরা জানি কেন সে সাধনায় প্রবেশ করছি।
‘তাযকিয়া’ এবং ‘যাকাত’—দুটি শব্দই একই মূল ধাতু থেকে নির্গত। যাকাতের প্রধান উদ্দেশ্য দারিদ্র্য-নিবারণ নয়; তা গৌণ হলেও চমৎকার একটি ফল। মূলত যাকাতের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সমাজ-সমষ্টির নির্দেশনায় ব্যক্তিগত ‘সদকা’-র অভ্যাসকে সঞ্জীবিত করে। যাকাত ও সদকা সম্পদের ওপর আমাদের আসক্তি দুর্বল করে; সম্পদের অংশবিশেষ আমরা আল্লাহ্র মাখলুকের খেদমতে ছেড়ে দিই। অর্থ-সম্পদ আমাদের মালিকানার একটি ক্ষেত্র মাত্র। কোনো সময়ে আমাদের দেওয়া জ্ঞান বা দক্ষতা কারও অতি-প্রয়োজনীয় হতে পারে—সেটিও আমরা উদারভাবে বিলাতে পারি। কখনো আমাদের ধৈর্য ও স্থিরতা অন্যদের তুলনায় প্রবল হতে পারে—তখন বিবাদ-বিরোধ প্রশমনে তা কাজে লাগানো আমাদের দায়িত্ব। সংকটকালে আমাদের কারও ভরসা দৃঢ় হতে পারে যে আল্লাহ্ই সব বিষয় পরিচালনা করেন এবং শেষাবধি যে ফল আসবে তা আমাদের বর্তমান ধারণার চেয়ে উত্তম—সে বিশ্বাস দিয়ে আমরা অন্যদের মনোবল জাগাতে পারি।
হাদীসে এসেছে, সদকার কোনো সীমা নেই; যাকাতের মতো এর নির্দিষ্ট হার নেই। এমনকি একজন মুসলিম ভাইকে হাসিমুখে সালাম করাও সদকা—অর্থাৎ আমাদের যা আছে তা অপরের উপকারে অজেয়ভাবে বিলিয়ে দেওয়ার প্রয়াস। এই দৃষ্টিতে যাকাত হলো একটি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, যা আমাদেরকে সৃষ্টিজগতের সর্বব্যাপী রহমতে আমাদের অংশগ্রহণের কথা সক্রিয়ভাবে স্বীকার ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রকাশে উদ্দীপ্ত করে; আর সেই রহমত আমরা দুনিয়ায় কখনো ভালো, কখনো মন্দ বলে অনুভব ও বিচার করি।
যাকাত ও সদকা উভয়ই সাধারণ নাম; এগুলো কোনও নির্দিষ্ট কাজ বা ফলাফলকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ‘তাজকিয়া’ও একটি বিশেষ্য, তবে এটি গঠনগতভাবে ‘তাআলীম’ (শিক্ষাদান) ও ‘তাওহীদ’ (আল্লাহর একত্ব বিশ্বাস)-এর আদলে ক্রিয়াপদীয় বিশেষ্যে রূপ পেয়েছে। তাজকিয়া মানে—অন্তরকে ক্রমাগত পরিশোধন ও পরিশুদ্ধ করার সাধনা। ‘ক্রমাগত’—কারণ এটি একক কোনও কাজ, অবস্থা বা চূড়ান্ত ফলাফল দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর কোনও সমাপ্তি নেই। সুবিদিত যে, আজীবন ইবাদত ও নেক আমলের পাথেয় মাত্র একটি বিদ্রোহী বাক্য বা কর্ম—যদি তাওবার সুযোগ না থাকে—নষ্ট করে দিতে পারে। অপরপক্ষে, আসন্ন মৃত্যুর আগে নিখাদ আন্তরিকতা ও আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা নিয়ে উচ্চারিত একটি তওবা বাক্য সারাজীবনের পাপকে ছাপিয়ে যেতে পারে।
এমন এক দীনি সাধনা যার শেষ নেই, তা কেবল অবিরাম আল্লাহভীতির উপরই টিকে থাকতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় গড়ে ওঠা বা প্রভাবিত কিছু মুসলিম ‘আল্লাহভীতি’ ধারণাটি মেনে নিতে চান না। তাঁদের ধারণা—মানুষকে কেবল আল্লাহ-প্রেম থেকেই কাজ করা উচিত; ভীতি থেকে কাজ করা নাকি মর্যাদাহীন। সুফি ধারার কিছু অংশে এ প্রবণতা দেখা যায়, অথচ এটি তাজকিয়ার উদ্দেশ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
প্রথমত, আল্লাহভীতি ও আল্লাহ-প্রেমকে পরস্পরবিরোধী ভাবা বড় ভুল। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার বাস্তবতায়—শুধু ইসলামে নয়, সব ঐতিহ্যেই—ভীতি ক্রমেই প্রেমে রূপ নেয়, কিংবা ভীতির আড়ালেই প্রেমের সত্তা উদ্ভাসিত হয়। এতে কোনো অতিরিক্ত সাধুত্ব বা রহস্যবাদ নেই। মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাই বলে—যে শৃঙ্খলাকে শুরুতে অনিচ্ছায় মেনে নিতে হয়, উপকার উপলব্ধি হলে সেই শৃঙ্খলাই ভালোবাসায় পরিণত হয়। নিষিদ্ধ ভোগ-বিলাসের প্রতি নিরন্তর হাহাকার না থাকলে অনিচ্ছা ধীরে ধীরে স্বেচ্ছা, পরে স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসায় রূপ নেয়। পরকালে আল্লাহর অসন্তুষ্টি বা শাস্তির ভয় প্রাথমিক প্রেরণা হতে পারে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা থেকে যে কল্যাণ