ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
প্রশ্ন:
ভোপালের প্রখ্যাত আলেমে-দীন মাওলানা হায়দার আলী নাদভী লিখেছেন—
“মাওলানা, আমার প্রশ্ন হল: সালাফি আলেমরা কেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহিমাময় সত্তাকে ওসিলা করে দোয়া করা থেকে মানুষকে নিষেধ করেন, অথচ পূর্বের সব আলেম-উলামা এটিকে সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ বলেছিলেন? ইবনু তাইমিয়া আসার আগ-পর্যন্ত কেউ একে হারাম বলেননি। সব মাযহাবের আলেমরাই এ-ওসিলা বৈধ বলেছেন; তাহলে সালাফিরা একে হারাম বলতে এত জোর কেন?”
“ওসিলা আসলে কী, তার প্রকৃত সত্য কী—দয়া করে সুস্পষ্টভাবে জানাবেন। আসলে আমার কয়েকজন বন্ধু এই প্রশ্ন করেছে। আমি আপনার নিকট জানতে চাই; আপনাকে জিজ্ঞেস করলে মন শান্ত হয়। জাযাকাল্লাহু খাইরান।”
উত্তর:
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যার একাধিক দিক রয়েছে। বিষয়গুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা সেগুলো শিরোনাম আকারে উপস্থাপন করছি।
১. তাওয়াস্সুলের ধারণা
‘ওসিলা’ ও ‘তাওয়াস্সুল’—দুটোরই মুখ্য অর্থ ‘কাছে আসা’, ‘নৈকট্য লাভ’। আল-কুরআনের সূরা মায়িদা ৩৫-এ আল্লাহ বলেন: “وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ”—“আর তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় তালাশ কর।” আজানের জবাবের হাদীসে আছে: “آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ”—এখানে ‘ওসিলা’ বলতে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান বোঝানো হয়েছে (সহীহ বুখারী, হাদীস জাবির রা.)।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রকৃত মাধ্যম হল ঈমান ও সৎকর্ম। কুরআন-হাদীসে এই তাওয়াস্সুলেরই আদেশ আছে। কেউ যদি বলে, “হে আল্লাহ! আমার আপনার প্রতি ঈমান আছে, আমি আপনাকে ভালোবাসি, আমি আপনার রাসূলকে ভালোবাসি”—এটি কর্মগত তাওয়াস্সুল, আর এটি সঠিক।
কিন্তু যে তাওয়াস্সুলে ঈমান-সৎকর্ম নেই, কিংবা সে দুটির প্রতি ইঙ্গিতও নেই—তার জন্য কুরআন-সুন্নাহয় কোনো দলিল নেই। উদাহরণস্বরূপ—“অমুকের জাহ (মর্যাদা) বা অমুকের ওসিলা ধরে, হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করুন/আমার দোয়া কবুল করুন।” এ ধরনের তাওয়াস্সুল পরে উদ্ভূত বিষয়। কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওসিলা, কখনো কোনো শায়খের ওসিলা—ইত্যাদি ধারণা প্রচলিত আছে। বহু সুফি পথের অনুসারীরা তাদের পুরো সিলসিলা ধরে ওসিলা করে দোয়া করেন।
২. তাওয়াস্সুলের সূচনা
এই অর্থের তাওয়াস্সুল পরবর্তী যুগে, বিশেষত বিভিন্ন তাসাউফি তরিকার প্রসারের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই সেটিকে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতে শুরু করেন। আপনার প্রশ্ন থেকেও যেন মনে হয়, তাওয়াস্সুলই মূল, আর ইবনু তাইমিয়ার সময় থেকে এর নাকচ শুরু হয়েছে। আফসোস, বিদআতকে মূল ধর্ম মনে করা হয়েছে আর আসল ধর্মকে নতুন বিষয় ভাবা হয়েছে।
‘শরহুল আকীদাহ ত্বাহাওয়িয়্যাহ’-তে হানাফি ইমাম ইবনুল-ইজ্জ লিখেছেন—
“ولِهٰذا قال أبو حنيفة وصاحباه … يُكْرَهُ أَنْ يَقُولَ الدَّاعِي: أَسْأَلُكَ بِحَقِّ فُلَانٍ …”
অর্থাৎ ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর নিকট নবি-রাসূল, কাবা, মাশ‘আর ইত্যাদির ‘হক’ ধরে দোয়া করা মাকরূহ।
৩. এই তাওয়াস্সুলের দলিল আছে কি?
কুরআনে, সুন্নাহয়, সাহাবা-তাবেয়ীন-এর আমলে কিংবা চার ইমাম—আবূ হানিফা, মালিক, শাফেয়ী, আহমাদ—কারও কাছেই এ ধরনের তাওয়াস্সুলের প্রমাণ নেই।
সহীহ বুখারীর একটি হাদীস—আনাস ইবনু মালিক রা. বর্ণনা করেন: দুর্ভিক্ষ হলে খলিফা উমর রা. ‘আব্বাস ইবনু আবদুল-মুত্তালিব’কে দিয়ে ইস্তিস্কা করাতেন এবং বলতেন, “হে আল্লাহ! আমরা আগে আমাদের নবীর ওসিলা করে তোমার কাছে বৃষ্টি চাইতাম, তুমি দিতেও। এখন আমরা আমাদের নবীর চাচার ওসিলা ধরে চাইছি, তুমি বৃষ্টি দাও।” অতঃপর বৃষ্টি হতো।
অনেকে এটিকে প্রচলিত ওসিলার দলিল বানাতে চান, অথচ হাদীসটি বরং তার প্রতিবাদী সাক্ষ্য। জীবিত অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়া-ই ছিল; ওফাতের পর সাহাবিরা জীবিত আব্বাস রা.-এর দোয়া নিলেন। যদি প্রচলিত ওসিলা মান্য হতো, তবে রাসূলের ইন্তেকালের পরও সরাসরি তাঁর ওসিলা-ই নিতেন; সাহাবিরা তা করেননি।
৪. তাওয়াস্সুলের নিষিদ্ধ হওয়া
দোয়া ইবাদত; বরং ইবাদতের সারাংশ। ইবাদত হওয়ার জন্য ওহির প্রমাণ লাগবে; শুধু মানুষের ধারণায় কিছু ইবাদত হয় না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو ردٌّ” —যে আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নব উদ্ভাবন করে যা এর অঙ্গ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত (বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি)।
আল্লাহ কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, “وَلِلَّهِ الأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا” (আ‘রাফ ১৮০)—নিজের সুন্দর নামগুলোর ওসিলা ধরে তাঁকে ডাকো। সূরা মায়িদার “وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ” আয়াতে নৈকট্যের পথ অনুসন্ধানের নির্দেশ আছে, আর কুরআন-সুন্নাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে—সেটা ঈমান ও সৎকর্ম। যে ঈমান-আমলে যত উন্নতি করবে, সে আল্লাহর তত নিকটবর্তী হবে।
৫. তাওয়াস্সুলের কুপ্রভাব
আল্লাহর দরজা সারাক্ষণ খোলা। তিনি চান, বান্দারা সরাসরি তাঁর কাছেই চাইবে; অন্যের কাছ থেকে চাইতে তিনি নিষেধ করেন। তিনি যদি দোয়া কবুল না-ই করতেন, তখন হয়তো অন্য কারও দরজায় কড়া নাড়ার অবকাশ থাকত। কিন্তু যখন দিন-রাত, সব অবস্থায় তিনি দোয়া কবুল করেন, তখন তাঁর দরবারে তৃতীয় কোনো পক্ষের কী দরকার?
এই ভেবে বসা—আল্লাহ দিতে চান না, তাই আমরা অমুক-তমুকের নাম দেখিয়ে তাঁকে যেন বাধ্য করব—এমন ধারণা আল্লাহর শানে চরম বেয়াদবি ও ধৃষ্টতা। সামান্য চিন্তাতেই এর কুৎসিত দিক উদ্ভাসিত হয়।
৬. আল্লাহর কাছে সরাসরি চাই—এটাই নবি ও সালাফের পথ
আল্লাহর নিকট চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি হল সরাসরি চাওয়া। নবীদেরও এ-ই রাস্তা, সালাফে-সালেহীনেরও এ-ই পথ।
আমি ছাত্রজীবনে প্রথমবার দিল্লির নিজামুদ্দীন তাবলিগি মারকাজে গিয়ে জামাতের আমীর হযরত মাওলানা ইন‘আমুল হাসান রহ.-এর দোয়া শুনি। দোয়ার শেষে তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! কেবল আপনার অনুগ্রহে আমাদের দোয়া কবুল করুন।” শুনে মনে অপরিসীম আনন্দ জেগেছিল, তাঁর মর্যাদা চোখে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ঈমানি গায়রতের দাবি—আল্লাহর কাছে শুধুই তাঁর ফজল-ও-করম ধরেই চাই।
———
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ: এই নিবন্ধটি AI দ্বারা অনুবাদ করা হয়েছে।
https://t.me/DrAkramNadwi/10522