শিরোনাম: জ্ঞান, স্বনির্ভরতা ও দ্বীনের খিদমত
—–
ড. মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
৮ / ৮ / ২০২৬
প্রশ্ন:
আসসালামু ʻআলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। সম্মানিত ডক্টর সাহেব, দামাতবারাকাতুকুম, জিয়াদামাজদুকুম। আশা করি আল্লাহ-র অনুগ্রহে আপনি সুস্থ ও সুরক্ষিত আছেন। আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরছি।
আমরা যারা তালিবে ইলম ও ইসলামের খিদমতে আগ্রহী, তাদের জন্য আজ সব থেকে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক প্রশ্ন। ফারেগ হওয়ার পর আমরা যদি গবেষণা, দাওয়াহ ও দ্বীন-সেবায় মন দিতে চাই, তবে এই আর্থিক শৃঙ্খলই সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। অনুগ্রহ করে এর সমাধান বাতলে দিন এবং বলুন, এখন থেকেই আমাদের কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আমরা নিজ সীমানা ছাড়িয়ে উম্মাহর কল্যাণ নিয়ে ভাবতে পারি।
উত্তর:
ওয়া ʻআলাইকুমুস্ সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনি সমকালীন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এটি কেবল ব্যক্তিবিশেষের নয়; অসংখ্য মাদরাসা-ছাত্র ও তরুণের সাধারণ উৎকণ্ঠা, যারা ফারেগ হওয়ার পর ইলম, তাহকীক, দাওয়াহ,ইসলাহ ও দ্বীন-সেবায় আন্তরিক অবদান রাখতে চায়, কিন্তু ভবিষ্যতের অর্থকষ্ট তাদের যাত্রা থামিয়ে দেয়। এ নিয়ে গভীর চিন্তা ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান সময়ের দাবি।
প্রথমেই বুঝে নিতে হবে—ইসলাম মানুষকে আর্থিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়নি। আধ্যাত্মিক জীবনের পাশাপাশি তার আর্থসামাজিক দায়িত্বও আছে। একজন আলিমও পরিবারের ভরণ-পোষণ ও ন্যূনতম চাহিদার দায়ভার বহন করেন। যদি তিনি দারিদ্রে এতটাই পর্যুদস্ত হন যে অধিকাংশ মনোযোগ জীবিকার সংকটে আটকে যায়, তবে তার জ্ঞান, চিন্তা ও দাওয়াহ-শক্তি বিকশিত হবে কী করে? তাই দ্বীনের খিদমত ও আয়ের স্বনির্ভরতাকে পরস্পরের বিপরীত নয়, বরং পরিপূরক মনে করা দরকার। সুদৃঢ় আর্থিক ভিত্তি থাকলে মানুষ অধিক মর্যাদা, স্বাধীনতা ও একাগ্রতা নিয়ে দ্বীনের খিদমত করতে পারে।
ইতস্তত ভুল ধারণা আছে যে আধুনিক শিক্ষা বুঝি দ্বীনি শিক্ষার বিপক্ষ। বাস্তবতা উল্টো: কিসের উদ্দেশ্য, কী নিয়তে ও কোন নৈতিক বোধে তা আয়ত্ত করা হচ্ছে—আসল প্রশ্ন সেখানে। আজকের জমানায় আধুনিক শিক্ষা দ্বীনি ইলমের বড় সহায়ক। কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়তের মূলভিত্তি জানলেই চলবে না; যিনি সমকালীন বিজ্ঞান, সমাজ, অর্থনীতি, আইন, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম সম্পর্কে অজ্ঞ, তিনি তাঁর যুগের মানুষের প্রশ্ন, মানসিক কাঠামো ও বাস্তব সংকটকে কীভাবে সঠিকভাবে বুঝবেন? ব্যাংকিং-ব্যবস্থা, আধুনিক বাণিজ্য, AI, বায়োটেক, পরিবার কাঠামোর বিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য, সোশ্যাল মিডিয়া, আন্তর্জাতিক আইন—এসব বিষয়ে হালাল-হারাম, নীতি-পথনির্দেশ দিতে হলে আলিমকে এসবের প্রকৃত স্বরূপ ও প্রভাবও জানতে হবে।
দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সম্পর্ক এক কথায়: দ্বীনি ইলম বলে দেয় ‘হক’ কী; আধুনিক বিদ্যা শেখায়, সমকালীন বাস্তবতায় সেই ‘হক’ কিভাবে উপস্থাপন ও প্রয়োগ করতে হবে।
সম্মানজনক আয়-পেশা গ্রহণকে দ্বীনদারির বিরোধী মনে করা ভুল। যোগ্যতানুসারে ভালো চাকরি, পেশাগত মাহারাত বা হালাল ব্যবসা—কোনোটাই নিন্দনীয় নয়। বরং যখন মৌলিক আর্থিক উদ্বেগ কিছুটা দূর হয়, তখন গবেষণা, রচনা, পাঠদান ও দাওয়াহ-কার্যক্রমে বেশি সময় ও একাগ্রতা মেলে। আর্থিক স্বনির্ভরতা মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে, তাকে অন্যের করুণা-নির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখে, নিজের অগ্রাধিকারে কাজ করার স্বাধীনতা দেয়।
যাদের জন্য চাকরি উপযোগী নয়, তাদের জন্য ব্যবসাই উত্তম। কেউ বাণিজ্য করবে, কেউ শিক্ষা-সেবা, কেউ প্রকাশনা, কেউ প্রযুক্তি, কেউ অনলাইন উদ্যোগ—মূল কথা, উপার্জন হালাল, পন্থা সঠিক ও লক্ষ্য উন্নত হবে।
গুরুত্বপূর্ণ কথা: ফারেগ হওয়ার জন্য অপেক্ষা নয়—প্রস্তুতি ছাত্রজীবন থেকেই। ভাষাজ্ঞান, বিশেষত ইংরেজিতে পারদর্শিতা; কম্পিউটার ও ডিজিটাল স্কিল; গবেষণা-রচনা ক্ষমতা; অনুবাদ, যোগাযোগ, প্রশাসনিক দক্ষতা; আর্থিক সচেতনতা এবং অন্তত এক পেশাগত ক্ষেত্রের উপর দখল ভবিষ্যতে অপরিহার্য সম্পদ।
তবে এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তি-আরাম নয়। লক্ষ্য—প্রথমে নিজেকে শক্ত পায়ে দাঁড় করানো, তার পর অন্যকে ভরসা দেওয়ার যোগ্য হওয়া; নিজের চাহিদা পূরণে সক্ষম হওয়া, তার পর মানবতার চাহিদা নিয়ে ভাবা।
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন—এখন থেকে কী করলে ভবিষ্যতে মানুষ নিজের সীমানা ছাড়িয়ে চিন্তা করতে পারবে? উত্তর সংক্ষেপে: নিজেকে শক্ত করুন, কিন্তু নিজেকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাবেন না। এমন ইলম নিন যা আপনাকে যুগের সঙ্গে যুক্ত রাখে, এমন হুনর নিন যাতে কারও মুখাপেক্ষী না হতে হয়। হালাল উপার্জনে স্বচ্ছল হন, যাতে মানসিক প্রশান্তি নিয়ে দ্বীনের খিদমতে নিবিষ্ট থাকতে পারেন। নিজের জীবনের খরচ-অগ্রাধিকার পরিমিত করুন, যাতে আয় ও সময়ের একটি অংশ উম্মাহর জন্য বরাদ্দ করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা—হৃদয়ে উম্মাহর ব্যথা, মানবতার মমতা ও খিদমতের আগ্রহ লালন করুন।
আমাদের প্রয়োজন এমন