শিরোনাম : গাধারা কেন দৌড়াবে?
|০৬ |ফেব্রুয়ারি |২০২৬|
একজন গাধাওয়ালা গাধাগুলোর ওপর বোঝা চাপিয়ে হাঁকাতে হাঁকাতে চলছিল। সে তখনো পথের মোড়েই পৌঁছায়নি, হঠাৎ দূর থেকে ধুলো উড়তে দেখা গেল। ডাকাতদের আসার ধুলো। চারদিকে চিৎকার উঠল:
দৌড়াও! ডাকাত আসছে!
গাধাওয়ালার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সে নিজেও গাধাদের সঙ্গে সঙ্গে চেঁচাতে লাগল :
দৌড়াও! দৌড়াও! ডাকাত আসছে!
কিন্তু গাধাগুলো যেখানে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
একটি গাধা কান ঝাঁকাল, চোখ টিপল, তারপর গভীর গাম্ভীর্যে বলল :
আমরা কেন দৌড়াব? দৌড়াতে হলে তুমি দৌড়াও। আমাদের তো বোঝা বইতে হবে, সে তোমারই হোক বা আর কারোই হোক!
প্রশ্নটা এই নয় যে ডাকাত কারা।
প্রশ্নটা এই, গাধারা কেন দৌড়াবে?
আজ এক সংগঠনের নেতা চিৎকার করে বলেন, হে মুসলমানেরা! আমাদের সহযোগিতা করো। আমরা না থাকলে তোমাদের দ্বীন থাকবে না, শরিয়তও থাকবে না!
একটি প্রতিষ্ঠান বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দেয়, আমাদের চাঁদা দাও। আমরা থাকলে তোমরা থাকবে, আমরা গেলে তোমরাও যাবে!
একটি মাদরাসা সদকা ও দানের ঝুলি মেলে ধরে বলে,
তোমাদের সব যাকাত আর দান আমাদের দাও। আমরা তোমাদের দুর্গ। দুর্গ ভেঙে পড়লে তোমরাও আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে!
একটি খানকাহ মধুর আধ্যাত্মিক হাসি নিয়ে বোঝায়,
হে মুসলমানেরা! সুদ খেও না, এটা হারাম। তবে হ্যাঁ, তোমাদের সুদ আমাদের দাও। আমরা সেটাকে হালাল বানিয়ে খেয়ে নেব। আমরা বেঁচে থাকলে তোমরাও বাঁচবে!
আর মুসলমান?
মাথা নত করে, চোখ বন্ধ করে, বোঝা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হে মুসলমানেরা!
তোমরা কি সত্যিই গাধাদের থেকেও অধম হয়ে গেছ?
তোমাদের কি এতটুকু সাহসও নেই যে বলতে পারো, তোমাদের দোকান বন্ধ হলে তোমরাই বন্ধ হবে, আমাদের দ্বীন নয়। আমরা মুসলমান। আমাদের দ্বীন তোমাদের আগেও ছিল, তোমাদের ছাড়াও থাকবে। এই দ্বীনের হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই নিয়েছেন।
কিন্তু না,
তোমরা আনুগত্যকে ঈমানের বিকল্প বানিয়ে নিয়েছ। তোমরা মসলককে দ্বীনের সমার্থক ভেবে বসেছ। তোমরা সংগঠনের পরিচয়কেই মুক্তির সনদ মনে করেছ।
সত্য হলো, এই সব দোকান, দুর্গ, সংগঠনী বোর্ড যদি হারিয়ে যায়, ক্ষতি দ্বীনের হবে না। ক্ষতি হবে শুধু সেই দোকানদারদেরই। তারা তোমাদের পায়ে মসলক, মাশরব, জামাত, মাদরাসা আর খানকাহর শিকল পরিয়ে দিয়েছে। তারা নিজেদের আনুগত্যকেই সত্যের মানদণ্ড বানিয়েছে। মসলক আর মাশরবের নামে আলাদা আলাদা বাজার খুলে রেখেছে, যেখানে দ্বীনকে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যবসার বিস্তারের জন্য।
তোমাদের বলা হয়, এই বোঝা না তুললে দ্বীন পড়ে যাবে।
আর তোমরা (গাধাদের মতো) বোঝা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো।
অথচ যেদিন তোমরা এই নামধারী আনুগত্যগুলোর বোঝা ঝেড়ে ফেলবে, সেদিনই তোমাদের চোখে পড়বে, দ্বীন তো শুধু আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের নাম। আর এই আনুগত্য কোনো বোঝা নয়; এটাই তো খাঁটি রহমত। এসব কিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে যখন তোমরা আল্লাহর দ্বীনের পথে চলবে, তখন পা হবে হালকা, বিবেক হবে মুক্ত, আর আত্মা সিজদায় প্রশান্তি খুঁজে পাবে।
এ কোনো নতুন কাহিনি নয়।
নবী করিম সা. এর আগমনের আগে ইহুদি আলেমরাও মসলক ও মতপার্থক্যের নামে নিজেদের জাতির পায়ে অগণিত শিকল পরিয়ে দিয়েছিল। পুরো জাতি একসময় সেই বোঝার ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তখন আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করলেন, শেষ নবী এলে তিনি সেই সব শিকল কেটে দেবেন, আর শুধু আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যই অবশিষ্ট থাকবে।
“যারা অনুসরণ করে সেই রাসুলকে (প্রিয় নবীকে) যার বর্ণনা তারা তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়; তিনি তাদের সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজে বাধা দেন, তাদের জন্য পবিত্র জিনিস হালাল করেন, অপবিত্র জিনিস হারাম করেন, আর তাদের ওপর চাপানো বোঝা ও শৃঙ্খলগুলো নামিয়ে দেন। অতএব যারা তাঁর ওপর ঈমান এনেছে, তাঁকে সম্মান করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং তাঁর সঙ্গে অবতীর্ণ নূরের অনুসরণ করেছে, তারাই সফল।”
(আল-আ‘রাফ: ১৫৭)
হে মুসলমানেরা!
যদি তোমরা সত্যিই এই শিকলগুলো থেকে মুক্তি চাও, তবে তোমাদের নবীর পথে চলো, তাঁর সুন্নাহ শক্ত করে আঁকড়ে ধরো। দ্বীনের কোনো সংগঠনের ভরসা লাগে না, কোনো মাদরাসার বোর্ড লাগে না, কোনো খানকাহি সিলও লাগে না। দ্বীনের একমাত্র অবলম্বন রাসুলের আনুগত্য।
ইকবাল রহিমাহুল্লাহর যুগে যখন এই দলগত ডাকাডাকি বেড়ে গেল, তখন সেই দরবেশ এক জোড়া পঙ্ক্তিতেই পুরো সংস্কার বলে দিলেন:
মুস্তফার কাছে নিজেকে সঁপে দাও, দ্বীন তো তিনিই।
তাঁর কাছে না পৌঁছালে, সবই মূল্যহীন।
শেষে প্রশ্নটা সেই একই, বরং আগের চেয়েও বেশি তিক্ত,
গাধারা কেন দৌড়াবে?
যখন বোঝা আমাদের নয়, আর মুক্তির পথ আমাদের চোখের সামনেই খোলা।
———-
ক্যাটাগরি : সমালোচনা, ইসলামি চিন্তাধারা, উপদেশ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8369