Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : কোলাহলের ভেতর হকের পথচলা হকের পথে যারা,

শিরোনাম : কোলাহলের ভেতর হকের পথচলা
হকের পথে যারা, তাদের জন্য কিছু কথা
———

|| প্রশ্ন

একজন সুসভ্য ও বিদ্বান নাদভী আলেম জানতে চাইলেন—

“সমকালীন সমস্যাগুলোর প্রেক্ষিতে আমরা যখনই কোনো দীনী-ইলমী খেদমতে হাত দিই, তখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী আমাদের মোকাবিলায় দাঁড়ায়। তারা আমাদের দলিল-প্রমাণ নিয়ে আলোচনা না করে সরাসরি ‘মুনকিরে হাদীস’, ‘সাহাবা-অবমাননাকারী’, ‘মুখালিফে জুমহুর’, ‘ফাসিক’, এমনকি ‘কাফের’ বলে গালি দেয়। এই অপবাদ-ঝড়ে মন ভেঙে যেতে চায়। তাদের সঙ্গে সঠিক আচরণ কী?”

|| উত্তর

হকের পথিকের প্রতি আমার প্রথম অনুরোধ—আপনি আগে আপনার “কিবলাতুন্‌নযর” ঠিক করুন।

যার দৃষ্টিপাত মানুষের মুখাবয়বে আটকে থাকে, সে প্রতিটি ভ্রুকুটি দেখে আঁতকে ওঠে; আর যার দৃষ্টি আল্লাহর রেজায় নিবদ্ধ, তুমুল ঝড়েও সে পথ হারায় না।

অতএব দীনী বা ইলমী কোনো কাজের সংকল্প করলে, প্রথমেই তা কোরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে পরখ করুন। সোনার জহুরি যেমন বারবার কসোটিতে ঘষে ধাতু পরীক্ষা করে, তেমনি দলিল-প্রমাণ খুঁটিয়ে দেখুন। নিজের নফসকে সন্তুষ্ট করার আগে বুদ্ধিকে, আর বুদ্ধিকে সন্তুষ্ট করার আগে ওহীর সামনে মাথা নত করুন।

যখন অন্তর সাক্ষ্য দেবে যে আপনি সর্বোচ্চ সততার সঙ্গে কিতাব-ও-সুন্নাহর অনুসরণ করেছেন, তখন পা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন। এরপর মানুষের কণ্ঠস্বরকে হাওয়ার দোলার চেয়েও তুচ্ছ গণ্য করুন।

মনে রাখবেন—কোলাহল কখনো দলিল নয়। মেঘ যতই গর্জুক, শস্যক্ষেতকে সেচ দেয় বৃষ্টিই। আওয়াজের উচ্চতা হকের প্রমাণ নয়, যেমন বিদ্যুতের ঝলক কোনোদিন সূর্যের আলো হতে পারে না।

কিছু লোক কথাকে তরবারি ভেবে হাঁকডাক তোলে, অথচ সেগুলো কাঠের খাপ মাত্র। তাদের কাছে প্রমাণ কম হলে উপাধি বেড়ে যায়—‘মুনকিরে হাদীস’, ‘সাহাবা-অবমাননাকারী’, ‘মুখালিফে জুমহুর’, ‘গোমরাহ’, ‘ফাসিক’, ‘কাফের’। মনে হয়, তাদের কাছে ভিন্নমতের একমাত্র চিকিৎসাই তাকফীর-ফতোয়া।

কিন্তু ভেবে দেখুন—কেউ যদি আপনাকে ‘কাফের’ বলে, এতে কি আপনার ঈমান মাটিতে পড়ে যায়? কেউ আপনাকে ‘ফাসিক’ বললেই কি আল্লাহর ফয়সালা বদলে যায়? কখনোই না। মানুষের ফয়সালায় নয়, আল্লাহর ফয়সালায় মানুষের উন্নতি-অবনতি নির্ধারিত হয়।

যে আল্লাহর কাছে কবুল, দুনিয়াজুড়ে গালিগালাজও তাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না; আর যে আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত, তাকে দুনিয়ার প্রশংসাও কবুল বানাতে পারে না। সুতরাং এই শব্দ-বাণকে ভয় কেন?

কারো জুলুমে যদি আপনাকে ‘কাফের’ বা ‘ফাসিক’ বলা হয়, আর আপনি আল্লাহর জন্য ধৈর্য ধরেন, তবে সে পাপ তার কাঁধে, আর আপনার সবরের সওয়াব আপনার আমলনামায় জমা হয়। সে ভাবছে, সে আপনাকে ক্ষতি করছে, অথচ নিজের হাতে আপনার সওয়াব বাড়িয়ে দিচ্ছে—নষ্ট হলো আসলে তারই।

প্রাচীন এক গল্প—শেয়ালকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “তুমি সিংহের হাত থেকে বাঁচার প্রজাপতি কৌশল জানো, সবচেয়ে কার্যকর কোনটি?” শেয়াল বলল, “সবচেয়ে সফল কৌশল—সিংহ আমাকে না দেখুক, আর আমি সিংহকে না দেখি।” এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে বড় শিক্ষাঃ জীবনের বহু যুদ্ধ ময়দানে নেমে নয়, ময়দান পার হয়ে জেতা যায়।

প্রতিটি পাথরের জবাব পাথর নয়। নদী পাহাড়ের সঙ্গে লড়ে না; পথ ঘুরিয়ে নেয়, শেষমেশ পাহাড়ই তার প্রবাহে ক্ষয়ে যায়।

আমি কোলাহল-সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে এই নীতিই নিয়েছি—তাদের লেখা পড়ি না, বক্তৃতা শুনি না, অভিযোগের ভার মাথায় নিই না। কারণ, যে সমস্ত শক্তি জবাব-দানে ব্যয় করে, তার কাছে গঠনমূলক কাজের জন্য আর কিছু থাকে না।

 ওরা চায়, আপনি কলম ফেলে তর্কে মেতে উঠুন, গবেষণা ছেড়ে আত্মপক্ষসমর্থনে ব্যস্ত হোন, নির্মাণ ছেড়ে প্রতিক্রিয়ার নেশায় দিন কাটান। আপনি যদি সেটাই করেন, ওরা জিতে গেল। আর যদি আপন পথেই চলেন, তাদের সমস্ত কোলাহল মরুভূমির ধুলো হয়ে উড়ে যাবে—কিছুক্ষণ দিগন্ত মলিন করবে, সূর্যকে না।

অনেক আগেই মনে স্থান দিয়েছি—যে স্থবিরতাকে চ্যালেঞ্জ করবে, তাকেই উপাধির বাণে বিদ্ধ হতে হবে। দলিল ফুরালে স্বর চড়ে, বুরহান দুর্বল হলে অপবাদ শক্তি পায়, Tahqiq হারিয়ে গেলে তাকফীরই আশ্রয়। তবে এ অস্ত্র শুধু তাদেরই ক্ষত করে, যারা এতে ভয় পায়। যিনি তাদের কোলাহলকে অন্তর-দরজায় ঢুকতেই দেন না, তীর ধনুক ছাড়তেই মাটিতে পড়ে যায়।

ইতিহাসও তাই বলে—যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ফতোয়া জারি হয়েছিল, পরবর্তী প্রজন্ম তাদের মশাল বানিয়েছে; আর যারা সেই ফতোয়া দিল, তাদের নাম সময়ের ধুলো গিলে খেয়েছে। দুনিয়ার নিয়ম—কাফেলা যাদের কারণে চলে, দুনিয়া তাদেরই স্মরণে রাখে, পথরোধকারীদের নয়। 

অতএব আপনার সময়ের হেফাজত করুন। সময় পানির মতো—নালায় দিলে ক্ষেত সজীব, বালিতে ঢাললে চিহ্নও থাকে না। শক্তি ব্যয় করুন কোরআন বোঝায়, সুন্নাহ জানায়, মানুষের সংস্কারে, উম্মাহর সেবায়।

প্রত্যেক কোলাহলের জবাব দিতে বসা মানে, এক মালী প্রতিটি ঝরা পাতার জন্য শোক করে আর বাগান লাগানো ভুলে যায়।

শেষ কথা—হক্বের পথে অগ্রসর হওয়ার চাবি চারটি জিনিসে লুকিয়ে আছে:

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *