AkramNadwi

শিরোনাম : কে আসলে কুফর থেকে মুক্ত? ———-   ই

শিরোনাম : কে আসলে কুফর থেকে মুক্ত?
———-
 
ইংল্যান্ডের একটি মসজিদে ইমামের পদটি শূন্য হয়ে গেলে মসজিদের ট্রাস্টিবৃন্দ আমাদের এক বন্ধুকে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দিলেন। বেশ কিছু দিন তিনি নামাজ পড়ালেন, বাচ্চাদের কুরআন-তালিম দিলেন, বক্তৃতা করলেন। পরিচালনা কমিটি তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে স্থায়ী পদটির জন্য আবেদন করতে বলল। আমরা আনন্দিত হলাম—ভেবেছিলাম, অবশেষে এমন একজন ইমাম নিয়োগ পাবেন, যিনি মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়বেন, বিদ্বেষ নয়।

সাক্ষাৎকারের দিন নানা প্রশ্নের পর তাঁকে একটি কাগজ ধরিয়ে সই করতে বলা হল। পড়তেই যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। তাতে লেখা ছিল:

“রশীদ আহমদ গঙ্গোহী ও আশরাফ আলী থানভী—উভয়েই কাফির।”

তিনি শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “আমি কোনো মুসলিমকে কাফির বলি না,”—এবং সই করতে অস্বীকৃতি জানালেন। সাথে সাথে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করা হল; আমাদের সব আশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

ভারত ও ইংল্যান্ডে আমরা অসংখ্য মানুষ দেখেছি: কেউ দেওবন্দিদের কাফির বলে, কেউ বেরলভিদের; কেউ আহলে হাদীস-সালাফিদের পথভ্রষ্ট বলে, তো আরেক দল সুফিদেরই গোমরাহির শিকড় আখ্যা দেয়। অনেকে আশআরী ও মাতুরিদিদের বিভ্রান্ত মনে করে, কেউ কেউ জমাআতে ইসলামীকে আলাদা ফিরকা বানায়। সংক্ষেপে, প্রায় প্রতিটি মুসলিম দলই অন্য দলকে কোনো না কোনোভাবে কুফর বা গোমরাহির তকমা দিয়েছে।

ইসলামি সমাজের ইতিহাস পর্যবেক্ষণে প্রায় একই চিত্র পাই। উনিশ এবং বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে উপমহাদেশে তকফিরের বাজার তুঙ্গে ছিল। মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল শহীদকে প্রকাশ্যে কাফির ঘোষণা করা হয়েছিল, আজও সেই ধারার অবসান হয়নি। অনেকে স্যার সায়্যিদ আহমদ খানকে কাফির করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। মাওলানা কাসিম নানৌতভী ও মাওলানা গঙ্গোহী বারবার কুফরের ফতোয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। আল্লামা শিবলী নোমানি ও মাওলানা ফারাহিকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। তারও বহুপূর্বে ইমাম আবু হানিফাকেও হাদীস অস্বীকারের অপবাদ দেওয়া হয়েছিল; কেউ বলত, তাঁর জানা হাদীস মাত্র সতেরোটি! এমনকি কেউ কেউ তো তাঁকে ইবলিসের চেয়েও অভাগা বলে গালি দিয়েছে।

এই উপমহাদেশে তকফির, তাফসিক (অপরকে ফাসিক বলা) ও তাদলীল (গোমরাহ ঘোষণা)-এর রেওয়াজ গভীর শিকড় গেড়েছে। এর ফলাফল—প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, আন্দোলন, সংগঠন—সবাই একে অপরকে নিন্দা করা ও খারিজ করাকেই বড় ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে।

এ দুঃখজনক প্রয়াসের ফল—সব মুসলিমই যেন শেষমেশ কাফিরে পরিণত হয়। যদি শব্দটি কড়া লাগে, বলা যেতে পারে: প্রতিটি মুসলিমের ভেতরেই কোনো না কোনো কুফরী চিহ্ন খুঁজে বের করা হয়। অথচ কাউকে কাফির বলা ভীষণ গুরুতর ব্যাপার; চূড়ান্ত প্রমাণ ছাড়া কারো ওপর এ ফতোয়া জারি করা যায় না। নিঃসন্দেহ, যাঁরা তকফির করেছেন তাঁরা সম্মানিত আলেম ও মুফতি; তাঁরা নিশ্চিতই ভেবেছিলেন, তাঁদের কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে।

কিছু আলেম আর সাধারণ মুসলিম এই তকফিরের ঝড় থেকে দূরে থেকেছেন। তাই ধরে নেওয়া উচিত—তাঁরা নিরাপদ। কিন্তু এখানেও “দৃঢ় প্রমাণ” হাজির: কিছু আলেম সরাসরি বলেছেন, “যে কাফিরকে কাফির মনে করে না, সেও কাফির।” ফলে বিধানটা সর্বজনীন হয়ে গেল, কারো জন্য ছাড় রইল না।

কেউ হয়তো বলবেন—হয়তো আলেমরা তাড়াহুড়ো করেছেন বা ভুল করেছেন। প্রথমত, নিশ্চিত বলে বিবেচিত বিষয়ে এমন সন্দেহ সাধারণত গৃহীত হয় না। সামান্যতম সংশয় থাকলেও তাঁরা কাউকে কাফির বলতেন না। বরং আলেমেরা একটি নীতি উদ্ধৃত করেন—“কাউকে নিয়ে নব্বই-নব্বইটি কুফরের আলামত আর একটি ইসলামের আলামত থাকলেও, তাকেও কাফির বলা যাবে না।”

———-

ক্যাটাগরি : নাসিহাহ, ফাতাওয়া, আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ AI, সম্পাদনা, মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
https://t.me/DrAkramNadwi/9389

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *