শিরোনাম : এক আল্লাহর জন্যই সিজদা
———–
আল্লাহ তাআলা তাঁর সুস্পষ্ট বাণীতে বলেন:
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর জন্য সিজদা করে।” (সূরা রা‘দ ১৫)
আরও বলেন:
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর জন্য সিজদা করে।” (সূরা নাহল ৪৯)
এই দুই আয়াতে “আল্লাহর জন্য” শব্দটিকে আগে আনা হয়েছে। আর বাক্যে এভাবে কোনো শব্দকে অগ্রাধিকার দিয়ে আনা হলে তা একান্ততার অর্থ প্রকাশ করে। অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীর সব কিছু (চেতন বা অচেতন) সবাই একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই সিজদাবনত হয়।
এই অর্থকে আরও দৃঢ় করে আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারা তাঁর ইবাদত থেকে অহংকার করে না; তারা তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তাঁরই জন্য সিজদা করে।” (সূরা আ‘রাফ ২০৬)
আরও বলেন:
“তুমি কি দেখ না, আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে, সবাই আল্লাহরই জন্য সিজদা করছে?” (সূরা হজ ১৮)
এভাবে কুরআনের বহু আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সিজদা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত, অন্য কারও জন্য নয়।
কুরআন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধার অবকাশ রাখে না, সিজদা কেবল আল্লাহর জন্য, তাঁরই দরবারে। বরং আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় অন্যের জন্য সিজদা করতে নিষেধ করেছেন:
“সূর্যের জন্য সিজদা করো না, চাঁদের জন্যও নয়।” (সূরা ফুসসিলাত ৩৭)
এ সত্যকে সমর্থন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহসমূহ। কখনো কোনো নবীর কাছ থেকে এ কথা বর্ণিত হয়নি যে তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে সিজদা করেছেন বা কাউকে সে অনুমতি দিয়েছেন।
একইভাবে সাহাবায়ে কেরাম বা পরবর্তী নেককারদের থেকেও এমন কোনো আমল পাওয়া যায় না। বরং সকল আলেম একমত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য সিজদা হারাম। এমনকি কেউ কেউ এটিকে কুফর ও শিরক পর্যন্ত আখ্যা দিয়েছেন।
যখন এটি নিশ্চিত হলো যে সিজদা একমাত্র আল্লাহর জন্যই, তখন কুরআনে যেখানে সিজদার আদেশ সাধারণভাবে এসেছে, সেখানেও তা আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট বলে বুঝতে হবে।
যেমন সূরা কাওসারে বলা হয়েছে:
“তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করো।”
এখানে সালাতকে আল্লাহর জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ আমরা জানি, কুরআনে যখনই সালাতের আদেশ এসেছে, তা স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর জন্যই বোঝানো হয়েছে, যদিও সব জায়গায় তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
ঠিক তেমনি, যেখানে সিজদার কথা সাধারণভাবে এসেছে, সেখানেও তা আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। যেমন:
“সিজদা করো এবং নিকটবর্তী হও।” (সূরা আলাক ১৯)
অর্থাৎ আল্লাহর জন্য সিজদা করো।
আরও এসেছে:
“সে কি সেই ব্যক্তি, যে রাতের প্রহরে সিজদায় ও দাঁড়িয়ে ইবাদতে মগ্ন থাকে?” (সূরা যুমার ৯)
“তারা রুকুকারী, সিজদাকারী।” (সূরা তাওবা ১১২)
“যাদুকররা সিজদাবনত হয়ে পড়ল।” (সূরা আ‘রাফ ১২০, সূরা শু‘আরা ৪৬)
এসব জায়গায় সিজদা বলতে আল্লাহর জন্য সিজদাকেই বোঝানো হয়েছে।
“আল্লাহর জন্য” বাক্যে ব্যবহৃত ‘লাম’ কখনো সংযোগের জন্য, কখনো কারণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়:
“যাইদ আল্লাহর জন্য সিজদা করল, তার ছেলের পরীক্ষায় সাফল্যের কারণে।”
এখানে প্রথম ‘লাম’ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, আর দ্বিতীয় ‘লাম’ কারণ নির্দেশ করছে। সংক্ষেপে বলা যায়:
“যাইদ তার ছেলের জন্য সিজদা করল।”
অর্থাৎ সে আল্লাহর জন্যই সিজদা করেছে, কিন্তু ছেলের সাফল্য ছিল সেই সিজদার কারণ।
এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ যখন আদম আলাইহিস সালামের মর্যাদা প্রকাশ করতে চাইলেন, তখন ফেরেশতাদের বললেন:
“আদমকে সিজদা করো।” (সূরা বাকারা ৩৪)
এর অর্থ হলো—আদমের সৃষ্টিকে উপলক্ষ করে আল্লাহর জন্য সিজদা করো। এখানে যাঁর জন্য সিজদা, অর্থাৎ আল্লাহ, তিনি সুস্পষ্ট হওয়ায় উহ্য রাখা হয়েছে; আর কারণ বোঝাতে ‘লাম’ ব্যবহৃত হয়েছে।
ইবলিস এ সিজদা প্রত্যাখ্যান করেছিল অহংকার ও হিংসাবশত—সে বলেছিল, “আমি তার চেয়ে উত্তম।”
এই ব্যাখ্যা কোনো নতুন বা অদ্ভুত কিছু নয়; বরং এর মাধ্যমে আয়াত ও হাদিসগুলোর মাঝে চমৎকার সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু আলেমও এ মত পোষণ করেছেন।
একইভাবে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনায় বলা হয়েছে:
“তারা তার জন্য সিজদাবনত হয়ে পড়ল।” (সূরা ইউসুফ ১০০)
এর অর্থও এই যে, তার পিতা-মাতা ও ভ্রাতাগণ আল্লাহর জন্য সিজদা করেছিলেন—ইউসুফের সম্মান ও প্রতিষ্ঠার আনন্দে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হিসেবে।
এটি কখনোই বোঝানো উচিত নয় যে ইউসুফই ছিলেন সিজদার লক্ষ্য; কারণ তা তাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একত্ববাদী আদর্শের পরিপন্থী।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও বর্ণিত হয়েছে—তারা ইউসুফের উপলক্ষে আল্লাহর জন্যই সিজদা করেছিলেন, তাঁর প্রদত্ত নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে।
অতএব, সিজদা সর্বদাই আল্লাহর জন্য—অন্য কেউ নয়। আর যেসব ক্ষেত্রে অন্য কারও দিকে সিজদার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে, তা কেবল কারণ বা উপলক্ষ বোঝাতে, ইবাদতের লক্ষ্য হিসেবে নয়।
———-
ক্যাটাগরি : তাফসির, কোরআন, ইসলামি চিন্তাধারা