শিরোনাম: ইবনু মুকাফ্ফা রচিত “রিসালা ফি আস্-সাহাবা”
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
১৮/৮/২০২৬
ইবনু মুকাফ্ফা (১০৬-১৪২ হিজরি/৭২৪-৭৫৯ খ্রিস্টাব্দ)-এর “রিসালা ফি আস্-সাহাবা”-কে যদি আমরা তার সময়ের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে চাই এবং আরব ভাবধারার ইতিহাসে এর মান ও মর্যাদা অনুধাবন করতে চাই, তবে একে কেবল সরস বাক্শৈলীর একটি গদ্যরচনা বলে পাঠ করা যথেষ্ট নয়। বরং এর আগে ও পরে—উভয় অবস্থাতেই—এটিকে প্রথম দিককার আব্বাসীয় যুগের (বিশেষত আবু জা‘ফর মানসুর ১৩৬-১৫৮ হিজরি আমলের) রাজনৈতিক ও মানসিক জীবনের একটি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। এই গ্রন্থে আমরা এমন একজন চিন্তককে দেখতে পাই, যিনি অস্থিরতাপূর্ণ এক সময়ে বিশ্বাস করতেন যে শুধু শক্তি দিয়ে বিশৃঙ্খলা দমন করা যায় না, সৈন্য-সংখ্যা কিংবা ভূখণ্ড-বিস্তৃতি দিয়েও রাষ্ট্র টেকে না; বরং টেকসই শাসনের পূর্বশর্ত হল সুবিবেচনা, সৎপুরুষ তৈরি, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং শাসক-জনতা ও শাসক-কর্মকর্তার সুসম্পর্ক। এই কারণেই “রিসালা” আরবি গদ্যে রাজনৈতিক প্রকৃতির প্রাচীন নিদর্শনগুলোর একটি; এতে ইবনু মুকাফ্ফা একটি প্রতিবেদন ও পরামর্শপত্রের ঢঙে যেসব ত্রুটি লক্ষ করেছেন, তা পেশ করেছেন এবং নিজের অভিমত অনুযায়ী সংস্কারের পথ নির্দেশ করেছেন।
ইবনু মুকাফ্ফা এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে উপেক্ষা করে প্রাচীন আরবি গদ্যের কোনো গবেষক এগোতে পারেন না। তাঁর মস্তিষ্কে দুইটি সংস্কৃতির সেতুবন্ধ, দুইটি সভ্যতার সমাহার—ফলে তিনি আরবের ভেতর থেকে জীবনকে দেখেছেন, আবার বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিচার করেছেন। পারস্যীয় বংশোদ্ভূত এই মনীষী দক্ষিণ ইরাকের বাসরা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন—সেই সময় যা ছিল বিদ্যা-বুদ্ধি ও সাহিত্য-সংস্কৃতির উর্বরতম ভূমি। সরকারি কর্তাব্যক্তিদের সান্নিধ্যে এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ‘আবদুল্লাহ ইবনু মুকাফ্ফা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ইসলাম গ্রহণ তাঁর পূর্ব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায়নি; বিশেষত রাজনীতি, নীতিবিজ্ঞান ও শাসনকলা-সংক্রান্ত পারস্যীয় প্রজ্ঞা তাঁর ভাবনায় সদা জীবন্ত ছিল। সেই সূত্রেই তাঁর রচনায় আমরা কার্যবাদী যুক্তিবোধ ও নৈতিক প্রবণতার মিশ্রণ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত প্রজ্ঞা ও সমকালীন সমাজ-পর্যবেক্ষণের দৃঢ় সমন্বয় প্রত্যক্ষ করি।
এই সমন্বয়ই তাঁকে আরবি গদ্যের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছে। ইবনু মুকাফ্ফা গদ্যকে কেবল রসোদ্রেক ভাষা নয়, বরং চিন্তা ও সংস্কারকর্মের বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। “কালিলা ও দিমনা”য় তিনি গল্পের আবরণে রাজনৈতিক-সামাজিক প্রজ্ঞা ছড়িয়েছেন; “আদাবুল কবীর” ও “আদাবুস সাগীর”-এ আত্মশুদ্ধি ও আচরণ-সংস্কারের শিক্ষা দিয়েছেন; আর “রিসালা ফি আস্-সাহাবা”য় তিনি সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, কর্মচারী ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং চিরন্তন প্রশ্ন উচ্চারণ করেছেন—শাসনকর্তারা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তবে রাষ্ট্র কীভাবে টেকে? শাসক, অভিজাত ও সহযোগীরা সৎ না হলে সাধারণ মানুষের হাল কীভাবে সোজা হবে?
গ্রন্থের শিরোনামে ‘সাহাবা’ শব্দটি পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে; এখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবি-বর্গ নয়, বরং শাসকের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত সহযোগী—মন্ত্রী, সচিব, দরবারী, আমলা ও গভর্নরদের বোঝানো হয়েছে। এ বিষয়টি গোটা রচনাটির মূল চাবিকাঠি; কারণ ইবনু মুকাফ্ফা বোঝাতে চেয়েছেন—রাষ্ট্র শুধু খলিফার হাতে শাসিত হয় না, বরং তাঁর ঘনিষ্টজনরাও শাসনে বড় সহশাসক। তারা ভালো হলে রাষ্ট্রের বহু কাজ সহজ হয়, আর যদি তারা খারাপ হয়, তবে সৎ খলিফার পক্ষে-ও রাষ্ট্র রক্ষা করা দুঃসাধ্য—কারণ দুর্নীতিপরায়ণ সহযোগীরা শাসকের দৃষ্টিকে আড়াল করে, তার ও প্রজার মাঝে প্রতিরোধ-প্রাচীর দাঁড় করায়।
এইখানেই ইবনু মুকাফ্ফার সাহসীরূপ স্পষ্ট হয়। তিনি খলিফার গুণকীর্তনে থেমে থাকেন না; বরং সেসব গুণকেই আরও বাড়িয়ে তোলার আহ্বান জানান। যথোচিত সম্মানসূচক ভূমিকা দিয়ে তিনি আলোচনা শুরু করেন, তারপর ধীরে-ধীরে সমালোচনা ও উপদেশে প্রবেশ করেন। যেন বলতে চান—আল্লাহ আপনার রাজত্ব দান করেছেন, এটি মূল নিয়ামত নয়; বরং মানুষের কল্যাণে এ রাজত্ব ব্যবহার করার সামর্থ্যই হল আসল অনুগ্রহ। তাই তিনি সূচনা করেন নবী ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনি উল্লেখ করে, যিনি রাজত্ব-সমৃদ্ধি লাভেও মৃত্যুর পরিণতি ভুলে যাননি; দোয়া করেছেন—‘মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন, আমাকে সৎকর্মীর দলে শামিল করুন’। উপদেশকে তিনি বিরোধিতা বানাননি, সমালোচনাকে বিদ্রোহে বদলাননি; বরং সকলকে নৈতিক উৎকর্ষের এক ধারাবাহিকতায় দাঁড় করিয়েছেন।
আজ আমরা এই রচনা পাঠ করলে সাহিত্য ও রাজনীতির এমন অনুপম মিশ্রণে বিস্মিত হই। বাক্য তাঁর হাতে স্রেফ অলঙ্কার নয়; তা যুক্তির ধারালো অস্ত্র। তিনি খলিফাকে শুধুই বলেন না—‘রাষ্ট্র নষ্ট’; বরং নষ্টের কারণগুলো ধরেন, ব্যাধির নির্দিষ্ট উপসর্গ চিহ্নিত করেন এবং প্রতিকার-পথ বাতলে দেন। সুতরাং “রিসালা ফি আস্-সাহাবা” সাময়িক রাজনৈতিক উপদেশ নয়, এক