শিরোনাম : আপনার রবের মহিমা ঘোষণা করুন।
——————–
এ সেই সত্যের বর্ণনা, যা প্রতিটি সৃষ্টির অন্তঃকরণে গোপনে লুকানো অথচ প্রতিটি সত্তায় উন্মোচিত; যা প্রতিটি শিরা-উপশিরায় প্রবাহমান; এ সেই বাস্তবতার ঘোষণা, যা অন্তরের গভীরে অদৃশ্য হয়েও জগতে স্পষ্ট, আবার জগতে স্পষ্ট হয়েও অন্তরে অদৃশ্য। আসমান-জমিন এর সাক্ষ্য দেয়; জড়-নির্জীব, উদ্ভিদ ও পশুপাখি এর সুরে গেয়ে ওঠে; সবুজ ঘাস সেই গানে দোল খায়, পাখিরা সুরেলা কণ্ঠে তা ঘোষণা করে। জিন-ইনসান ও ফেরেশতাদের প্রাণ এ সত্যে সিক্ত। কাফেররা মুখে অস্বীকার করে, কিন্তু তাদের দেহ, তাদের হৃদয়, তাদের বুদ্ধি—সবই এই সত্যের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।
সে সত্য কী? কান খোলো এবং শোনো!
সত্য এটাই—তোমাদের রবই সর্বশ্রেষ্ঠ। মহিমা ও গরিমা একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য। শ্রেষ্ঠত্ব তাঁরই অধিকার। তিনি একক, কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর বাইরে যা কিছু আছে সব তাঁরই সৃষ্টি, তাঁর মালিকানাধীন, তাঁরই মুখাপেক্ষী এবং তাঁরই ভরসায় টিকে আছে। তিনি সবার সহায়, এবং সকল সহায়তাকারীর সহায়।
হে নিজেদের কৃতিত্বের গান গাওয়া মানুষ! তোমাদের প্রশংসা মিথ্যা। তোমরা কিছুই ছিলে না, তিনিই তোমাদের বানিয়েছেন। তোমরা ছিলে অক্ষম, তিনিই তোমাদের সামর্থ্য দিয়েছেন। তোমরা ছিলে অদক্ষ, তিনিই তোমাদের দক্ষ বানিয়েছেন। মনে রেখো, তিনি যখন খুশি তোমাদের গুণাবলি কেড়ে নিতে পারেন, এমনকি তোমাদের অস্তিত্বও বিলীন করে দিতে পারেন। তখন কোনো শক্তি তোমাদের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
হে পূর্বপুরুষদের কীর্তি বর্ণনাকারীরা! মিথ্যা গৌরবে লজ্জা করো। বলো তো, তোমাদের পূর্বপুরুষরা কোথায়? গিয়ে তাদের কবর দেখো, খুঁড়ে দেখো—পাবে কেবল ভাঙা-চোরা হাড়। কোথায় সেই বাহু, যা তরবারি-ভাল্লুক খেলা করত? কোথায় সেই মস্তিষ্ক, যা চিন্তার যাদুতে মানুষকে মোহিত করত?
হে শিক্ষকদের ও পীরদের কর্মযজ্ঞ প্রচারকারীরা! তোমরা প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছ, তাদের সঙ্গে এমন গুণ জুড়েছ, যা তাদের ছিলই না। কোথায় তাদের সেই বুদ্ধি, যা পাহাড় থেকে জ্ঞানের ঝরনা বইয়ে দিত? আজ তাদের সামনে কুদুরির প্রথম লাইন খুলে ধরো, কিছুই বলতে পারবে না। তাদের কাছে কায়দা বাগদাদি খোলো, জিভ আটকে যাবে। তাদের চোখের দিকে তাকাও, চিনতে অস্বীকার করবে। কানে আজান দাও, তোমাদের সুর তাদের কাছে অপরিচিত হয়ে থাকবে।
হে ভ্রান্ত ধারনা ও কুসংস্কারের শৃঙ্খলে বাঁধা মানুষ! হে বিভ্রান্তিকে স্বাধীনতা মনে করা জনগণ! আমরা হৃদয়ের কথা ঠোঁটে আনবই, সত্যের স্লোগান দেবই। তোমরা গালি দাও, কষ্ট দাও, আমরা সহ্য করব। কিন্তু তোমাদের খুশি করার জন্য সত্য বলা থেকে বিরত হব না। আমরা বাস করি তোমাদেরই দুনিয়ায়, কিন্তু আমাদের লালনপালন হয়েছে বায়তুল্লাহর কোলে। আমরা উল্টেপাল্টে দেখেছি তোমাদের গ্রন্থসমূহ, কিন্তু আমাদের অন্তরে খোদিত রয়েছে সেই পবিত্র সফরের সত্য, যা বহু জাতির গ্রন্থাগারে চিরস্থায়ী রেখা টেনে দিয়েছে। মনে রেখো, আমরা তোমাদের মন্দিরসমাজে থেকেও তাওহীদের আওয়াজ তুলতে থাকব।
শোনো, এবং বারবার শোনো—অটল-অবিনশ্বর কেবল তোমাদের রব। আর সবকিছুর পরিণতি ধ্বংস। কেবল তাঁরই নাম চিরন্তন। তাঁর নাম স্মরণ করো, তাঁর মহিমা ঘোষণা করো। যখন মানুষ নিজেদের প্রশংসায় মত্ত হয়, তখন তোমরা তোমাদের রবের প্রশংসা করো। যখন জাতিগুলো তাদের নেতা-নেত্রীর গুণগান করে, তখন তোমরা তোমাদের রবের গুণগান করো। যখন তোমরা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করো, তখন আরও বেশি স্মরণ করো সেই সত্তাকে, যিনি স্মরণযোগ্য, যাঁর স্মরণ জীবন, যাঁর প্রশংসাই অনন্ত পুরস্কার।
যখন তোমরা এ সত্যের স্বীকৃতি দাও, তখন সমগ্র সৃষ্টিজগত সেই স্বীকৃতিতে তোমাদের সঙ্গে সুর মেলায়।
হে আল্লাহ! তুমি মহান, আর তোমাকে ছাড়া কোনো মহান নেই। সিকান্দার ও খিজরের কাহিনি নিছক মিথকথা। যদি কেউ তাদের জানাতো—আমাদের জীবন-স্রোত, আমাদের অমরতার উৎস কেবল “আল্লাহু আকবার।”
হে আল্লাহ! তুমি-ই একমাত্র সত্য উপাস্য, তোমাকে ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তোমার ইবাদতের আহ্বান ছাড়া সব আহ্বানই ভেলকি, সামিরির জাদু, মিথ্যা ও প্রতারণা। ইবরাহিম বলেছিলেন—“আমি আমার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি তাঁর দিকে, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা।”—এ কথা বলেই তিনি নিজের দূরদর্শিতা প্রমাণ করেছিলেন। আমরাও সেই ইবরাহিমি কলেমা বারবার পুনরাবৃত্তি করি।
সত্য এটাই—শুধু ইবরাহিমই ইবরাহিমি ছিলেন না, বরং গোটা সৃষ্টিজগতই ইবরাহিমি।
————–
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, আআত্মশুদ্ধি, উপদেশ।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7127