Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : “অল্প আহার করা”

মানুষের জীবনে ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা এক অপরিহার্য বিষয়। এগুলোর মধ্যে একধরনের স্বাভাবিক আনন্দ আছে, যা প্রয়োজন ও আনন্দ—এই দুইয়ের মিলনে আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের উচ্ছ্বাস ও তাড়নায় আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—আমাদের সত্যিই তা প্রয়োজন কি না। আর যদি প্রয়োজন হয়ও, তবে আমরা তার সীমা ভুলে যাই।

আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে আমাদের দুটি মৌলিক ভুল আছে:
প্রথমত, প্রয়োজন না থাকলেও ইচ্ছার পিছু ধাওয়া করা,
দ্বিতীয়ত, তার সীমা লঙ্ঘন করা।

আকাঙ্ক্ষার অনুসরণই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আর সেটাই তার সমস্ত দুঃখ ও বিপদের মূল শিকড়। আমরা ভুলে যাই, আমাদের প্রধান শত্রু শয়তানও এই ইচ্ছার পথ দিয়েই আমাদের বিভ্রান্ত করে। জ্ঞানের দাবি হলো—আমরা যেন আকাঙ্ক্ষাকে লাগাম দিই, কামনার ফাঁদে না পড়ি, শয়তানের কৌশল থেকে সাবধান থাকি এবং বিপদ-দুঃখের মূল কারণকে ছেঁটে ফেলি।

কিন্তু আমরা তা করি না, কারণ তা সহজ নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়? কীভাবে খাওয়া-দাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, যৌন বাসনা, অহংকারের বাসনা ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক দুর্বলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব? আর যদি কেউ এর কোনো উপায় বলে দেয়ও, আমরা তাতে কেন স্থির থাকতে পারি না?

আমার মতে, সব ইচ্ছার একসঙ্গে চিকিৎসা করা কঠিন, বরং হতাশাজনক। তাই শুরু করা উচিত এমন এক আকাঙ্ক্ষা থেকে, যেটিকে দমন করা তুলনামূলকভাবে সহজ, এবং যা অন্য আকাঙ্ক্ষাগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করবে। সেটি হলো—খাওয়া-দাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

যদি আমরা খাওয়া ও পান করার আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল শিখে ফেলি, তবে সব আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।

খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দমনের দুটি উপায় আছে—একটি বুদ্ধিবৃত্তিক (জ্ঞানভিত্তিক), অন্যটি কার্যকর (আচরণিক)।

১. জ্ঞানভিত্তিক উপায় :

এটির ছয়টি দিক আছে—কিছু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু স্পষ্টতার জন্য আলাদা করে বলা হলো।

প্রথমত, আমরা ভালোভাবে বুঝে নিই—ক্ষুধা ও তৃষ্ণা কেবল ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের খাবার বা পানীয়ের প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু তা কখনো বলে না, কি খাবো, কখন খাবো, বা কতটুকু খাবো। তৃষ্ণাও বলে না, কি পান করবো, কখন, বা কতটা। অর্থাৎ ইচ্ছা নিজে অন্ধ ও নির্বোধ।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু ইচ্ছা অন্ধ ও বোকা, তাই তাকে সঠিক পথে চালানোর জন্য আমাদের বুদ্ধির সাহায্য নিতে হবে।

তৃতীয়ত, আমরা ভাবি—ক্ষুধা বা তৃষ্ণার সময় কতক্ষণ আমরা ধৈর্য ধরতে পারি, যাতে দুর্বল না হয়ে পড়ি বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ না হই? যতটা সম্ভব ধৈর্য ধরতে হবে, কারণ ধৈর্যই মানুষের সব উন্নতি ও সাফল্যের সর্বশ্রেষ্ঠ চাবিকাঠি।

চতুর্থত, আমরা এমন খাদ্য গ্রহণ করি যাতে তিনটি গুণ থাকে:
১. তা হালাল ও পবিত্র,
২. স্বাস্থ্যকর ও শক্তিবর্ধক,
৩. এবং তা আমাদের মর্যাদা নষ্ট না করে—অর্থাৎ ভিক্ষা করে বা লোভে পড়ে না নেওয়া খাদ্য।

পঞ্চমত, নিজের শারীরিক গঠন ও অবস্থার ভিত্তিতে কোনো বুদ্ধিমান ও সৎ চিকিৎসকের পরামর্শে জেনে নিই—দিনে কয়বার খাবো, কখন খাবো, আর কতটা খাবো।

ষষ্ঠত, আমরা যেন সর্বদা পরিণতি ভেবে কাজ করি। যা কিছু আমাদের পেটে যায়, তার প্রভাব শরীরে স্থায়ীভাবে পড়ে—তা আর পরিবর্তন করা যায় না। পৃথিবীর অধিকাংশ রোগই খাওয়া-দাওয়ার অব্যবস্থাপনা থেকে জন্ম নেয়।

২. আচরণভিত্তিক উপায়

এটির চারটি দিক আছে:

প্রথমত, একেবারে ভালোভাবে ক্ষুধা না লাগা পর্যন্ত খাবো না। ভালো ক্ষুধা মানে হলো—দেহ যখন দুর্বল হয়ে কাজের শক্তি হারাতে বসেছে। আর খাবার সময় কিছুটা ক্ষুধা বাকি রেখেই থেমে যাওয়া উচিত। পশু পেট ভরে খায়, কিন্তু মানুষ খায় প্রয়োজন অনুযায়ী—পেট ভরানোর জন্য নয়।

দ্বিতীয়ত, চেষ্টা করো ছোট প্লেটে খাবার নিতে, আর খুব অল্প পরিমাণে তুলে খেতে। প্রয়োজন হলে পরে আবার নাও, কিন্তু প্রথমে যেন কেউ দেখে না ভাবে তুমি লোভী।

তৃতীয়ত, নিয়মিত রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তোল, এবং ইফতারের সময় সাহরির তুলনায় কম খাও।

চতুর্থত, বিনা মূল্যে পাওয়া খাবার থেকে বিরত থাকো, দাওয়াতে যত কম সম্ভব অংশগ্রহণ করো। আর যদি কোনোদিন দাওয়াতে যেতেই হয়, তাহলে ঘর থেকে কিছু খেয়ে যেও, যাতে সেখানে কম খাওয়া যায়। এরপরের দুই-তিন দিন রোজা রাখলে আত্মনিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।

খাওয়া-দাওয়ার নিয়ন্ত্রণ শুধু পেটের বিষয় নয়—এটা আত্মার প্রশিক্ষণ, মনের পরিশুদ্ধি, আর জীবনের ভারসাম্যের অনুশীলন। যে নিজের পেটকে জয় করতে পারে, সে তার নফসকেও জয় করতে পারে।

যদি আমরা এই নীতিগুলো মেনে চলি, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য উন্নত হবে, আয়ু দীর্ঘ হবে, কাজের সময় আমরা উদ্যমী ও প্রাণবন্ত থাকব, রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষিত থাকব, এবং শয়তান আমাদের সামনে নিজেকে দুর্বল অনুভব করবে।

শেষ কথা হলো—এটা কখনো ভুলে যেও না যে, কম খাওয়া নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) সুন্নত এবং সব জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তির জীবনধারা। অতিরিক্ত খাওয়া মানুষের বুদ্ধি ও হৃদয়কে দুর্বল করে দেয়, মনকে ভারী ও নির্বুদ্ধি বানায়, সাহস ও উদ্যমকে নিঃশেষ করে ফেলে। ক্রমে মানুষ শয়তানের কাছে পরাজিত হয়ে তার বশীভূত দাসে পরিণত হয়।

——————–
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা, আখলাক।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7382

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *