AkramNadwi

শিরোনাম : অদৃশ্যে বিশ্বাস।

শিরোনাম : অদৃশ্যে বিশ্বাস।<br>

بسم الله الرحمن الرحيم.

তারা জিজ্ঞেস করল: “পবিত্র কুরআনের দ্বারা পথপ্রাপ্ত হওয়ার শর্ত কী?”
আমি বললাম: “যা আল্লাহ তাআলা নিজেই নির্দেশ করেছেন-
‘এই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি পরহেজগারদের জন্য পথনির্দেশ, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।’

এখানে আল্লাহ পরহেজগারদের এমন বৈশিষ্ট্য দ্বারা বর্ণনা করেছেন, যা তাদের অন্যদের থেকে পৃথক করে। এই গুণগুলোই তাদেরকে আল্লাহর হিদায়াত গ্রহণের যোগ্য করে তোলে, এবং এমন এক উচ্চ মর্যাদার জন্য প্রস্তুত করে দেয়, যেখানে তারা ঐশী আলোর ঝরনাধারায় স্নাত হয়, যে আলো তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনে, পশুত্ব থেকে যুক্তিবোধ ও বিবেচনাসম্পন্ন মানবিকতায় উন্নীত করে, শয়তানি প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে তাদের হৃদয়কে করে বিনম্র, নমনীয় ও আল্লাহমুখী।

তারা বলল: “কেন অদৃশ্যে বিশ্বাসকে অন্য সব গুণের আগে স্থান দেওয়া হয়েছে?”
আমি বললাম: এই পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের উপকারে আসে, আবার অনেক কিছু আছে যা আমাদের ক্ষতি করে। আমরা প্রকৃতিগতভাবে উপকার অর্জন ও ক্ষতি থেকে বাঁচতে চাই। এসব উপকার ও ক্ষতির কিছু আমাদের চোখে দেখা ও হাতে ছোঁয়া যায়, যা আমরা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করি। এসব বিষয়ে আনন্দ বা কষ্টভোগে মানুষ ও পশু সবাই অংশীদার।

কিন্তু এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের বাইরে, যা আমরা দেখতে, শুনতে বা স্পর্শ করতে পারি না। এসব বিষয়ে মানুষই একমাত্র সত্তা, যে তা উপলব্ধি করে, তা নিয়ে চিন্তা করে, তা অর্জনের বা তা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে।

অতএব, যাদের জন্য আল্লাহ এই কিতাব নাজিল করেছেন, অর্থাৎ মুত্তাকী ব্যক্তিগণ, তাদের চিন্তা-চেতনা শুধু দৃশ্যমান জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাদের আসল মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে অদৃশ্যের প্রতি। এইখানেই তারা অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র ও উচ্চতর হয়ে ওঠে।

তারা বলল: তবে আমাদের জন্য ‘অদৃশ্যে বিশ্বাস’ মানে কী? একটু বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দিন।

আমি বললাম: আমাদের জীবনে, এই দুনিয়া ও আখিরাতে, অনেক চাওয়া-পাওয়া আছে, যার অধিকাংশই আমরা জানি না। আবার যে সামান্য জানি, তারও পুরোটা অর্জনের ক্ষমতা আমাদের নেই। তদুপরি, এই চাওয়া-পাওয়া পূরণের জন্য যে সব উপায়, শক্তি ও কারণ প্রয়োজন, সেগুলো সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান ও সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।

অর্থাৎ, আমরা যা জানি তার তুলনায় যা জানি না তা বহু গুণ বেশি; এবং যা করতে পারি তার তুলনায় যা পারি না, তা বহুগুণ গুরুতর। সুতরাং আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সামান্য, এতটাই অল্প যে তা নির্ভরতার যোগ্য নয়। আমাদের সামর্থ্যও দুর্বল, ভঙ্গুর ও অচল, যার উপর নির্ভর করা যায় না।

মানুষ যখন কোনো বিষয়ে নিজের জ্ঞান ও ক্ষমতাকে সীমিত মনে করে, তখন সে নির্ভর করে এমন কারও উপর, যিনি অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ। যেমন, কেউ যদি গাড়ি কিনতে চায় কিন্তু গাড়ি সম্পর্কে কিছুই না জানে, তবে সে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির পরামর্শ নেয় এবং তার মতের উপরই নির্ভর করে।

তারা বলল: “তবে কি বুদ্ধি অদৃশ্যে বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে পারে? যুক্তি কি এতে সন্তুষ্ট হয়?”

আমি বললাম: নিশ্চয়ই, অবশ্যই পারে! বরং অদৃশ্যে বিশ্বাসই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। মানুষের বুদ্ধি জানে যে বাস্তবতার কিছু দিক তার দৃষ্টির বাইরে, যা সে দেখতে বা শুনতে পায় না, তবুও সেগুলোর প্রভাব তার জীবনে স্পষ্ট। তাই সে এমন বিষয়েও বিশ্বাস স্থাপন করে যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, কিন্তু যা তার বিবেক ও যুক্তি দ্বারা নিশ্চিত। সে এমনভাবে বিশ্বাস করে যেন তা চোখে দেখেছে, কানে শুনেছে।

মানুষ মানুষ হয়েছে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার দ্বারা, যার মাধ্যমে সে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে পারে। এ কারণেই সে পশুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা কেবল ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আনন্দ-দুঃখ পায়, কিন্তু চিন্তা ও বিচারশক্তিতে অক্ষম।

তারা বলল: “কিন্তু অবিশ্বাসীরাও তো মানুষ, তারা তো আদমসন্তান, তবুও তারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে না!”

আমি বললাম: মুসলমান ও অবিশ্বাসী উভয়েই অদৃশ্যের ধারণা সম্পর্কে জানে। কিন্তু পার্থক্য হলো, অবিশ্বাসীরা মনে করে, তারা যেহেতু তা জানে না, তাই কেউই তা জানে না। আর মুসলমানরা বিশ্বাস করে, যদিও তারা নিজেরা তা জানে না, কিন্তু এমন একজন আছেন যিনি সব জানেন, তিনি আল্লাহ।

অতএব, অবিশ্বাসীরা বাস্তবে পশুর মতো, কারণ তারা কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জিনিসেই সীমাবদ্ধ থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“আর যারা কুফরি করে, তারা উপভোগ করে ও খায় যেমন পশুরা খায়, আর তাদের আবাস হবে আগুন।” (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ১২)
আবার বলেছেন:
“তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে বুঝে না; তাদের চোখ আছে, কিন্তু দেখে না; তাদের কান আছে, কিন্তু শোনে না। তারা পশুর মতো, বরং তাদের চেয়েও পথভ্রষ্ট। তারাই গাফেল।” (সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ১৭৯)

আরও বলেছেন:
“আর আল্লাহ অপবিত্রতা আরোপ করেন তাদের উপর যারা বুদ্ধি ব্যবহার করে না।” (সূরা ইউনুস, আয়াত ১০০)

তারা বলল: “তবে কে জানে আমাদের চাওয়া-পাওয়া ও তার উপায়সমূহ? কে তা পূর্ণ করার ক্ষমতা রাখে?”

আমি বললাম: একমাত্র আল্লাহ, যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, পরম প্রজ্ঞাবান, দয়ালু ও করুণাময়। তিনিই জানেন আমাদের সকল প্রয়োজনের সূক্ষ্মতম বিবরণ, তিনিই তা পূর্ণ করার ক্ষমতা রাখেন। তিনিই জানেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন সেই সব কারণ ও উপায়, যেগুলোর মাধ্যমে আমাদের চাহিদা পূর্ণ হয়।

অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো, তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখা, এবং এই বিশ্বাসেই নিহিত “অদৃশ্যে ঈমান”।

অর্থাৎ, “যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে”, তাদের অর্থ হলো, তারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহই একমাত্র যিনি তাদের সকল চাওয়া-পাওয়া জানেন ও পূরণ করতে সক্ষম। এসব বিষয় তাদের কাছে অদৃশ্য, তারা তা দেখতে পায় না, জানতে পারে না, কিংবা তার উপর কোনো নিয়ন্ত্রণও রাখে না।

এখানে “অদৃশ্যে” শব্দটি অবস্থা নির্দেশক, অর্থাৎ বিশ্বাসের বিষয় নয় অদৃশ্য নিজে, বরং বিশ্বাসের বিষয় আল্লাহ নিজেই, যিনি অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন। আর আল্লাহতে বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত হলো, তাঁর ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল, আখিরাত ও তাকদিরে বিশ্বাস।

এভাবেই “অদৃশ্যে” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে অন্যান্য আয়াতেও :
“এবং এটি পরহেজগারদের জন্য স্মরণিকা, যারা তাদের প্রতিপালককে অদৃশ্যে ভয় করে এবং কিয়ামতের সময় নিয়ে শঙ্কিত থাকে।” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৪৮-৪৯)

“তুমি তো সতর্ক করো সেইসব মানুষকে, যারা তাদের প্রতিপালককে অদৃশ্যে ভয় করে, সালাত কায়েম করে, এবং যারা আত্মশুদ্ধি অর্জন করে, সে তো নিজেরই কল্যাণের জন্য করে। আর প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই।” (সূরা ফাতির, আয়াত ১৮)

এবং ইউসুফ (আ.)-এর কথায়—
“যাতে সে জানে, আমি গোপনে তার প্রতি খিয়ানত করিনি।” (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৫২)

তারা জিজ্ঞেস করল: “তবে কি অদৃশ্য জগত কেবল এই দুনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?”

আমি বললাম: না, বরং অদৃশ্য দুটি প্রকারের—
একটি হলো এই দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অদৃশ্য, আর অন্যটি হলো আখিরাতের সঙ্গে সম্পর্কিত অদৃশ্য।

দুনিয়ার অদৃশ্য বিষয়ে অবিশ্বাসীরাও কোনো না কোনোভাবে তার অস্তিত্ব স্বীকার করে। কিন্তু আখিরাতের অদৃশ্য বিষয়ে তারা বিশ্বাস করে না, বরং সেটির অস্তিত্বই অস্বীকার করে।

তারা বলল: “তাহলে আখিরাতসংক্রান্ত অদৃশ্যের কোনো প্রমাণ আছে কি?”
আমি বললাম: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আছে। আখিরাতের অস্তিত্বের যেই প্রমাণ, সেই প্রমাণই আখিরাতের অদৃশ্যেরও প্রমাণ।

তারা বলল: “তবে অনুগ্রহ করে সেটি স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করুন।”

আমি বললাম: ইনশা আল্লাহ, আমি আখিরাত সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে সেটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

——————–

ক্যাটাগরি : তাফসির, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা, কোরআন।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7636

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *