Skip to main content

AkramNadwi

মহিষকে রাখে, কিন্তু দুধকে তাদের জীবন থেকে দূরে যেত

মহিষকে রাখে, কিন্তু দুধকে তাদের জীবন থেকে দূরে যেতে দেয় না।

কিন্তু মৌলিক সাদৃশ্য তখনও প্রকাশ পায়নি। আমেরিকায় আমি আরেকটি বিষয় দেখলাম যা বারবার আমাকে নদওয়ার কথা মনে করিয়ে দিত। এখানে আমি এমন পরিবার দেখেছি যেখানে বাবা একজন ইতিহাসবিদ, কিন্তু ছেলে ইতিহাসে আগ্রহী নয়; বাবা সারাজীবন প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গবেষণা করেন, রাজাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করেন, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের গ্রন্থ খুলে বসেন, আর ছেলে বলে, “আমি নৃত্যশিল্পী হবো।” বাবা ইতিহাসের পাতায় ঝুঁকে থাকেন; ছেলে নিজের পায়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়।

একজন ভদ্রলোক একজন বিজ্ঞানী, তার জীবন ল্যাবরেটরির কাঁচের সামগ্রী, যন্ত্র এবং সূত্রের মধ্যে কাটে, পদার্থের রহস্য অনুসন্ধানে নিবিষ্ট। কিন্তু তার ছেলে বিজ্ঞান নয়, সংগীতের জগতে নিজের ঘর বানাতে চায়। বাবা পরমাণুর দিকে তাকান; ছেলে সুরের গভীরে যেতে চায়।

আরেকজন ভদ্রলোক সাহিত্যের অধ্যাপক। তার বাড়িতে বই ছড়িয়ে আছে বসন্তের পাতার মতো: কবিতা, উপন্যাস, সমালোচনা, সাহিত্য ইতিহাস— সবকিছুই সেই পরিবেশে শ্বাস নেয়। অথচ ছেলে সাহিত্য নয়, খেলাধুলার মাঠের প্রতি আকৃষ্ট। বাবা উপমার মধ্যে জীবন খোঁজেন; ছেলে মাঠে বলের পেছনে ছুটে বেড়ায়।

এভাবে আমি বুঝলাম যে, আমেরিকায় বাবার জীবন ছেলের ভাগ্যের নকশা নয়। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম নিজেদের পথ তৈরি করতে স্বাধীন। ইতিহাসবিদের ছেলে নৃত্যশিল্পী হতে পারে, বিজ্ঞানীর ছেলে সংগীতশিল্পী, সাহিত্যিকের ছেলে ক্রীড়াবিদ। বাবা যে দরজা দিয়ে জীবনে প্রবেশ করেছেন, সেই দরজা দিয়েই ছেলেকে প্রবেশ করতে হবে— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

আর এখানেই নদওয়ার কথা মনে পড়ে। নদওয়ায় আমি কখনো এমন কাউকে দেখিনি— বা অন্তত মনে পড়ে না— যে বলেছে, “আমি আলেম হবো না; আমি নৃত্যশিল্পী হবো।” কেউ বলেনি, “বই ভালো, কিন্তু আমার মন সংগীতে।” কেউ ঘোষণা করেনি, “সাহিত্যের বদলে আমি খেলাধুলার মাঠ বেছে নেব।”

নদওয়ায় স্বপ্নের আকাশ ছিল বিশাল, কিন্তু সেই আকাশে কয়েকটি নক্ষত্র অসাধারণ দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করত: শিবলী নোমানী, সুলায়মান নদভী, আবুল হাসান আলী নদভী। এই নামগুলো শুধু বইয়ের প্রচ্ছদে নয়, ছাত্রদের স্বপ্নের দিগন্তেও লেখা ছিল। কেউ হতে চাইত মুফাসসির, কেউ মুহাদ্দিস, কেউ ফকিহ, কেউ ইতিহাসবিদ, কেউ সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক। এই সব পথের উপর ছিল একটি বৃহত্তর আকাশ: জ্ঞান ও সাহিত্য।

খেলাধুলা ছিল, কিন্তু প্রান্তে; বিনোদন ছিল, কিন্তু ফুটনোটে; কবিতা ছিল, কিন্তু উচ্চতর উদ্দেশ্যের ছায়ায়। মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল— পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া জ্ঞান-ঐতিহ্যের মধ্যে নিজস্ব আলো জ্বালানো।

আমেরিকায় প্রশ্ন হয়: তুমি কী হতে চাও? নদওয়ায় প্রশ্নটি হয়তো একটু ভিন্ন ছিল: তুমি কাকে অনুসরণ করতে চাও? বাহ্যিকভাবে পার্থক্য সামান্য, কিন্তু আমার মতে এটি একটি সম্পূর্ণ সভ্যতার পার্থক্য। প্রথমটি পেশা সম্পর্কে; দ্বিতীয়টি চরিত্র সম্পর্কে। প্রথমটি জিজ্ঞেস করে তুমি জীবনে কী কাজ করবে; দ্বিতীয়টি জিজ্ঞেস করে তুমি জীবনে কাকে অনুসরণ করবে।

আমেরিকা আমাকে শিখিয়েছে যে স্বাধীনতার অর্থ হলো ছেলে তার বাবার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। নদওয়া আমাকে দেখিয়েছে যে ভালোবাসার অর্থ হতে পারে— একজন মানুষ তার পূর্বসূরিদের মতো হতে গর্ববোধ করে।

এখানে বাবা বলে, “বাবা, তুমি যা হতে চাও, তাই হও।” সেখানে প্রশ্ন হতে পারে, “বাবা, বড় হয়ে তুমি কাকে অনুসরণ করতে চাও?” আর উত্তর প্রায়ই এমন কারো নাম হতো, যিনি জ্ঞানকে জীবিকা নয়, জীবন বানিয়েছিলেন।

আজ, কোনো উজ্জ্বল আলোয় ভরা আমেরিকান রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যখন আমি বড় দোকানের কাঁচের দেয়ালের পেছনে সারি সারি দুধের বোতল দেখি, তখন আমার মনে পড়ে মাকারিম নগরের মহিষগুলো। আর যখন আমি দেখি কোনো আমেরিকান তরুণ তার বাবার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে, তখন মনে পড়ে নদওয়ার সেই আঙিনা, যেখানে তরুণ চোখগুলো তাদের পূর্বসূরিদের জ্বালানো প্রদীপের দিকে তাকিয়ে থাকত।

তখন আমি ফীরুজ ভাইয়ের সেই কথাও মনে করি: “আমার গ্রামে আমার অনেক মহিষ ছিল; এখানে কোনো মহিষ নেই, ছাগল নেই, মুরগি নেই।” আমার হৃদয়ে আমি বলি: ফীরুজ ভাই, আপনি আপনার মহিষের জন্য শোক করছেন; আমি নদওয়ার স্মৃতিতে আবেগাপ্লুত হচ্ছি। আপনার গ্রামের মহিষগুলো মাকারিম নগরে পাওয়া যেত, আর আমেরিকায় তাদের দুধ সুপারমার্কেটে আছে; কিন্তু নদওয়ার সেই জগৎ— যেখানে শিবলী ছিল স্বপ্ন, সুলায়মান নদভী ছিল আদর্শ এবং আলী মিয়াঁ ছিল এক উজ্জ্বল প্রদীপ— তার দুধ না মাকারিম নগরে, না কোনো সুপারমার্কেটে পাওয়া যায়।

ওটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত একটি স্বপ্ন। এবং হয়তো এই কারণেই মহিষের এই সাধারণ গল্পটি আমাকে অসাধারণ কিছু স্মরণ করিয়ে দিল: আমেরিকা মানুষকে শিখিয়েছে যে তারা নিজেদের জন্য যেকোনো পথ বেছে নিতে পারে; নদওয়া আমাকে শিখিয়েছে যে কোনো পথে হাঁটার আগে দেখা উচিত, সামনে এমন কোনো প্রদীপ আছে কি না যা পথ দেখাতে পারে।

মহিষের

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *