Skip to main content

AkramNadwi

মরীচিকার পর মরীচিকা।

মরীচিকার পর মরীচিকা।
নতুন যুগের এক হৃদয়বিদারক দিক—যা মানবতার বেদনা অনুভব করা মানুষের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়—তা হলো পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকেই সেই দরিদ্র প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, যারা ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যাদের নিজের পিতার পরিচয় নেই; যারা বংশ, বংশপরিচয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি—সবকিছুর দিক থেকেই শূন্য। এই বাস্তবতার পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক জীবনে যে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে, তা কারও অজানা নয়। মূল শিক্ষার অভাব, ভালোবাসা ও স্নেহময় পরিবেশের অনুপস্থিতি—এসবের পরিণতি হচ্ছে পশুত্বের আধিপত্য, রাগ ও কামপ্রবৃত্তির লাগামহীন বিস্ফোরণ, শালীনতা ও লজ্জাবোধের বিলুপ্তি, ভালো ও মন্দের সীমারেখা মুছে যাওয়া। এমন এক মহামারিতে সমাজ গ্রাসিত হয়েছে যে আর হাহাকারও শোনা যায় না। এই রোগ এমন এক ঘাতক ক্ষতে পরিণত হয়েছে, যার কথা কেউ মুখেও আনে না। একবার আমি অক্সফোর্ডের একটি হোস্টেলে এক পাকিস্তানি ও কয়েকজন ইংরেজ বন্ধুর সঙ্গে বসে ছিলাম। আলোচনার বিষয় ছিল সামাজিক সমস্যা। হঠাৎ এক ইংরেজ বন্ধু পাকিস্তানি বন্ধুটিকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি জানো, তোমার বাবা কে?” পাকিস্তানি তরুণটি উত্তেজিত হয়ে গেল, ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, “তুমি এত বড় অপমানজনক কথা আমাকে কেন বললে?” ইংরেজটি সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে বলল, “এটা কোনো গালি নয়, এখানে এই প্রশ্নটা একেবারে সাধারণ। আমাদের মধ্যে এমন বহু মানুষ আছে যারা জানেই না তাদের পিতা কে। আমিও তাদের একজন।” আরও হৃদয়বিদারক এক ঘটনা শুনেছিলাম অক্সফোর্ডের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে। এক ছাত্র তার বন্ধুর কাহিনি বলছিল— সে এক মেয়ের প্রেমে পড়ে, তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের বিষয়ে পরামর্শ নিতে সে তার বাবার কাছে যায়। বাবা মেয়েটির নাম ও ঠিকানা জানতে চান। জানার পর বাবা গভীর দুঃখে বললেন, “যৌবনে আমার কিছু ভুল হয়েছিল; এই মেয়ে সেই ভুলেরই ফল। তুমি তাকে বিয়ে করতে পারবে না, কারণ সে তোমার বোন। আর এই কথাটা কখনো তোমার মাকে বলবে না।” এক বছর পর সেই তরুণ আরেকটি মেয়েকে ভালোবেসে ফেলে। সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে সে আবার বাবাকে জানায়। মেয়ে সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পর বাবা এবারও বলেন, “তুমি তাকে বিয়ে করতে পারবে না, কারণ সেও আমার অবৈধ সন্তান। আর এটাও তোমার মাকে বলো না।” এর কিছুদিন পর সে তৃতীয় এক মেয়েকে পছন্দ করে। এবারও যখন সে বাবাকে জানায়, বাবা বলেন, “এই মেয়েটিও আমার কন্যা।” রাগে তরুণটি চিৎকার করে বলল, “আমি এখন সব কথা মাকে বলব! আপনি সমাজে ভদ্র মানুষের মুখোশ পরে আছেন, অথচ আপনার জীবন এভাবে কলুষিত!” সে গিয়ে মাকে পুরো ঘটনা জানাল—তিনটি মেয়ের কাহিনি বিস্তারিতভাবে বলল। মা শান্তভাবে বললেন, “বাবা, তুমি তাদের যেকোনো একজনকে বিয়ে করতে পারো, কারণ আমি-ও যৌবনে কিছু ভুল করেছিলাম—এ মানুষ তোমার আসল বাবা নয়।” এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে সমাজ। বিয়ের বন্ধন ছাড়াই সন্তান জন্মদান এখন পশ্চিমে সাধারণ ব্যাপার। অক্সফোর্ডেই এক শিখ ভদ্রলোক আমাকে বলেছিলেন, তার অবিবাহিত ছেলের চারটি সন্তান আছে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আপনি ওর বিয়ে দেন না কেন?” তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “ছেলে বলে, বিয়ের দরকার কী? এতে শুধু খরচ বাড়ে।” সমাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে—কিন্তু কোন পথে? এসব ঘটনা না কল্পিত, না অতিরঞ্জিত। বাস্তব পরিস্থিতি আরও বিস্ময়কর, আরও মর্মাহতকর। পারিবারিক ও নৈতিক সমস্যাগুলো এখন আর সমস্যা হিসেবেই দেখা হয় না। সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত কেবল অর্থ উপার্জন ও আয়ের বৃদ্ধি নিয়ে। এই প্রবাহ এমন এক বন্যায় পরিণত হয়েছে, যা পুরো মানবসমাজকে তছনছ করে দিয়েছে; এমন এক আগ্নেয়গিরি, যা পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে নিচ্ছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এই ব্যাধি মুসলমানদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা তুচ্ছ ও গৌণ বিষয়গুলোতে এতটা ডুবে আছি যে, মৌলিক মূল্যবোধ একে একে হারিয়ে যাচ্ছে—আর আমাদের কানে তা পৌঁছায় না। সমাজে যে মহামারিগুলো দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, সেগুলো আমাদের ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে, অথচ আমরা তা অনুভবও করছি না। বিপদের ঘণ্টা বাজছে, কিন্তু আমাদের কান বধির হয়ে গেছে। জাতির উত্থান ও পতনের কাহিনিগুলো দেয়ালে দেয়ালে লিখে যাচ্ছে ইতিহাস—তবু আমরা সেই স্পষ্ট অক্ষর ও উজ্জ্বল চিহ্ন পড়তে পারছি না। আজ যা অন্যায়, তা প্রচলিত রীতি হয়ে গেছে। জ্ঞানীরা বিস্ময়ে হতবাক—দক্ষিণ কীভাবে উত্তরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, আর পাখিরা কীভাবে জালের চারপাশে স্বেচ্ছায় ঘুরে বেড়াচ্ছে! সতীত্ব, পবিত্রতা, লজ্জা ও সুনামের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত যে চেতনা ছিল, তা আজ কোথায় হারিয়ে গেছে? আমাদের মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য এখন কাগজের সেই লেখার মতো, যেগুলোকে বাতাসের এক ঝাপটা মুছে দেয়—আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। হে বেখবর মানুষ! তুমি কি জানো, কত দুর্গম এই পথ? গন্তব্য মন থেকে আড়াল হয়ে গেছে, বাস্তবতার ওপর ঘন কালো মেঘ ছেয়ে আছে। মানবতার রাত হয়ে উঠেছে বিষণ্ণ, দিনগুলোও দুঃখে পরিপূর্ণ। আকাশ লজ্জিত, পৃথিবীও লজ্জিত, চারদিকে কেবল হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস, গ্রাম হোক বা শহর—সব জায়গায় ক্রন্দন ধ্বনি। জাগো! তোমার প্রভুর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করো, সৎপথ ও তাকওয়ার পথ বেছে নাও। নিজের প্রকৃত স্বভাব চিনে নাও, বুদ্ধির কথা শোনো, অবহেলা ও অজ্ঞতা থেকে ফিরে আসো, তবেই তুমি পাবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। আকাশপ্রেরিত ওহীকে বানাও তোমার পথপ্রদর্শক, আর ধরো পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতার দড়ি। এই আহ্বান এক অস্থির হৃদয়ের, এই আর্তনাদ এক বিদীর্ণ আত্মার। ——————– ক্যাটাগরি : আখলাক, পারিবারিক জীবন, তাজকিয়াহ, উপদেশ। — ✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড। ✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ। — 🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇 https://t.me/DrAkramNadwi/7459
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *