তাই নীতিগত ও স্বচ্ছ অবস্থান এটিই হওয়া উচিত, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান বলে, তাকে মুসলমান হিসেবেই গণ্য করা হবে; আর যে নিজেকে ইসলাম থেকে বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে, সে তার নিজের স্বীকারোক্তির দায় বহন করবে।
হৃদয়ের অবস্থা, নিয়তের সত্যতা ও চূড়ান্ত বিচার আল্লাহ তাআলার হাতে ন্যস্ত। মানুষের এখতিয়ার সীমিত, আর এই সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করাই প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক তাকওয়া।
❖ দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর:
ইমামদের কাউন্সিল, আলেমদের পরিষদ, বোর্ড অব স্কলার্স বা ধর্মীয় কমিটিগুলো কখনোই শরয়ি ক্বাযা (বিচারালয়)এর বিকল্প হতে পারে না। কারণ ক্বাযা কেবল জ্ঞানভিত্তিক কোনো পদ নয়; এটি মূলত একটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব। ক্বাযির রায়ের পেছনে থাকে রাষ্ট্রীয় শক্তি, কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থা এবং একটি সুসংহত আইনি কাঠামো। এ কারণেই তিনি হত্যা, ডাকাতি, হুদুদ, তাযির এবং অন্যান্য ফৌজদারি বিষয়ে চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
বর্তমান যুগে, যখন মুসলমানরা অনৈসলামিক বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে বসবাস করছে, তখন আলেমদের কমিটিগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে ক্বাযি হিসেবে গণ্য হতে পারে না। কারণ, তাদের হাতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই,
তাদের রায় আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়,
এবং তারা কোনো শাস্তি কার্যকর করতে সক্ষম নন।
অতএব, এসব কমিটির অবস্থান ক্বাযির নয়; বরং তারা মূলত মুফতি, পরামর্শদাতা এবং সামাজিক পথপ্রদর্শক।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তাদের ভূমিকা গৌণ বা তুচ্ছ। বরং বর্তমান বাস্তবতায় তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীরভাবে ইতিবাচক, বিশেষ করে দুটি ক্ষেত্রে।
প্রথমত, সমষ্টিগত দীনী শৃঙ্খলা বজায় রাখা। যেমন—রমজান ও ঈদের ঘোষণা, জামাআতভিত্তিক ইবাদতের সময় নির্ধারণ, এবং কমিউনিটির দীনী বিষয়ে ঐক্য ও সমন্বয় সৃষ্টি করা। এ ধরনের উদ্যোগ উম্মাহকে বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তি থেকে রক্ষা করে এবং সামষ্টিক সচেতনতা ও ঐক্যবোধকে দৃঢ় করে।
দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক বিরোধে মধ্যস্থতা (mediation)। আলেমদের কমিটিগুলো মানুষের পারিবারিক, ব্যবসায়িক কিংবা সামাজিক বিরোধে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে; নৈতিক প্রভাব ও বিবেকের ভাষায় ন্যায়বিচারের পথে আহ্বান জানাতে পারে; এবং উভয় পক্ষকে শরয়ি দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
এই ভূমিকা ক্বাযা নয়; বরং এটি তাহকীম (arbitration) বা মীমাংসা, যা ইসলামী ঐতিহ্যে চিরকাল বিদ্যমান ।
সারসংক্ষেপ:
তাকফির অত্যন্ত গুরুতর বিষয়; একে রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যবহার করা সর্বনাশ ডেকে আনে।
মতবাদ নিয়ে একাডেমিক সমালোচনা করা যেতে পারে; কিন্তু ব্যক্তির ওপর চূড়ান্ত ফয়সালা দেওয়া বৈধ নয়।
আলেমদের কমিটিগুলো ক্বাযি নয়; তারা মুফতি ও সংস্কারক।
তাদের মূল দায়িত্ব উম্মাহকে একত্র করা, ভেঙে দেওয়া নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ফিতনার এই সময়ে প্রজ্ঞা, ন্যায়, ভারসাম্য ও প্রশস্ত হৃদয় দান করুন; এবং উম্মাহকে পারস্পরিক সম্মান ও ভ্রাতৃত্বের নিয়ামতে সমৃদ্ধ করুন।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
————–
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, উপদেশ, ফিকাহ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8299