চারপাশে প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আরও জরুরি। জ্ঞান ও আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা কখনোই তাদের জবাবদিহির বাইরে রাখার উপায়ে পরিণত হওয়া উচিত নয়।
একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা হলো, অসদাচরণ প্রকাশ করলে ইসলামের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। সত্য এর বিপরীত। অন্যায় গোপন করে ইসলামকে রক্ষা করা যায় না। কুরআনিক নৈতিকতা সত্য, ন্যায় ও জবাবদিহির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যায় গোপন করা, ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো, বৈধভাবে অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত করা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদন্ত থেকে রক্ষা করা দ্বীনের সেবা করে না; বরং তা দ্বীনকে দুর্বল করে।
অতএব নির্যাতনের ক্ষেত্রে একজন নীতিনিষ্ঠ মুসলিমের প্রতিক্রিয়া ন্যায়বিচার দিয়ে শুরু হওয়া উচিত। শিশুদের যৌন নির্যাতন বা শোষণের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগ আইন ও প্রতিষ্ঠিত সুরক্ষা-ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। ভুক্তভোগী ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে হবে, অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং তদন্ত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। অন্যায় প্রমাণিত হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এই জবাবদিহি মুসলিম সমাজের সম্মানের জন্য কোনো হুমকি নয়। বরং এটি তার নৈতিক নীতিরই প্রকাশ।
একই সঙ্গে, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কেবল ঘটনার পর শাস্তি দেওয়ার বিষয় নয়। প্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর উচিত এমন সুস্পষ্ট সীমারেখা ও পেশাগত মানদণ্ড তৈরি করা, যা নির্যাতনের সুযোগ কমিয়ে দেয়। শিশুদের উপযুক্ত ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নীতি শেখানো উচিত, অভিভাবকদের দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান করা উচিত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় একান্ত বা তত্ত্বাবধানহীন মেলামেশার পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের ব্যক্তিগত আস্থার ওপর একমাত্র নির্ভর না করে স্বচ্ছ পেশাগত কাঠামোর মধ্যে কাজ করা উচিত।
এই নীতি ধারাবাহিকভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কেউ আলেম, ইমাম, কুরআন শিক্ষক বা সমাজনেতা হলেই তিনি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যান না। সম্মান ও সতর্কতা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং যথাযথ সীমারেখা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই সুরক্ষা দেয় এবং শিক্ষার সম্পর্কের মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে বলে না; বরং শালীনতা, মর্যাদা, ভদ্রতা ও যথাযথ সীমারেখার নীতির মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেশাগত পরিবেশ এমনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব, যা নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক—নারীদের জনজীবন থেকে বাদ না দিয়েই।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা অংশগ্রহণকে আরও নিরাপদ করবে, নারীদের সমাজ থেকে অদৃশ্য করে দেবে না।
নারীদের প্রতি ইসলাম-পূর্ব যুগের দৃষ্টিভঙ্গির মোকাবিলায় ইসলামের ভূমিকার মধ্যেও কুরআনের একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। কুরআন জাহেলিয়াতের কিছু মানুষের কাছে কন্যাসন্তান জন্মের সংবাদ পৌঁছালে তাদের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করেছে: “তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অন্তরে দুঃখে ভরে যায়! যে দুঃসংবাদ তাকে দেওয়া হয়েছে, তার কারণে সে লোকদের কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সে কি তাকে অপমানের সঙ্গে রেখে দেবে, নাকি তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখো, তারা যে সিদ্ধান্ত নেয় তা কতই না নিকৃষ্ট!” (১৬:৫৮–৫৯)
এরপর কুরআন নৈতিক নিন্দার অন্যতম শক্তিশালী দৃশ্য উপস্থাপন করে: “আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (৮১:৮–৯)
কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা ইসলাম-পূর্ব আরবের কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যদিও এটিকে প্রতিটি গোত্র বা পরিবারের ওপর সাধারণীকরণ করা উচিত নয়। তবু কুরআন এই প্রথাকে এমন একটি সমাজের গভীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে, যেখানে একটি কন্যার অস্তিত্বকে মর্যাদার পরিবর্তে লজ্জার কারণ হিসেবে দেখা হতে পারত।
অন্যায়ের রূপ পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত মানসিকতা বিভিন্ন রূপে টিকে থাকতে পারে। আধুনিক সমাজ সাধারণত মেয়েদের শারীরিকভাবে মাটিতে পুঁতে দেয় না, কিন্তু আরও সূক্ষ্ম কিছু কবর থাকতে পারে: তাদের আকাঙ্ক্ষাকে কবর দেওয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ দমন করা, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ অস্বীকার করা, বৈধ অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া, অথবা তাদের বোঝানো যে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পুরুষদের তুলনায় স্বভাবতই গৌণ।
নারীদের দ্বীন বোঝার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা রূপক অর্থে দেহকে জীবিত রেখে মন ও আত্মাকে কবর দেওয়ার মতো হতে পারে। যে নারী জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, তিনি সহজে সেই নৈতিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারেন না, যা কুরআন নিজেই ধরে নিয়েছে যখন মুমিন নারীদের সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজ প্রতিহত করার কাজে অংশীদার ও সহযোগী হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অতএব প্রকৃত