Skip to main content

AkramNadwi

খাব বা স্বপ্ন সম্পর্কে ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/1958

بسم اللّه الرحمن الرحيم.


————-

প্রত্যেক মানুষই স্বপ্ন দেখার অভিজ্ঞতা রাখে। স্বপ্ন সবসময় নিদ্রার অবস্থায় দেখা হয়—এটা রাতে যেমন হতে পারে, দিনের বেলাতেও হতে পারে। স্বপ্ন কখনো জাগ্রত অবস্থায় হয় না। জাগরণ বা আধো ঘুমের মধ্যে যা কিছু দেখা যায়, তার মূল্য সত্যিকার অর্থে কল্পনার চেয়েও কম। তবে কোনো নবী যদি কোনো অবস্থায় কিছু দেখেন এবং তা বর্ণনা করেন, তাহলে তা নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য।

জাগ্রত অবস্থায় মানুষের মনে অনেক ভিত্তিহীন চিন্তা আসে—কখনো সেগুলো গুছানো হয়, কখনো আবার এলোমেলো। এসবই কল্পনা বা অমূলক চিন্তা—এই ধরণের কল্পনা বা চিন্তা ঘুমের মধ্যেও দেখা যায়। এগুলোকে বলা হয় “অহলাম” (অমূলক স্বপ্ন), যেগুলো ভিত্তিহীন এবং যেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

কিছু স্বপ্ন বাস্তবতার প্রতীক বা বাস্তবতার আয়না হয়। এই ধরনের স্বপ্ন সবসময় গুছানো থাকে, জাগরণে স্মরণ থাকে এবং স্বপ্নদ্রষ্টার মনে হয় যে, এগুলোর কোনো গুরুত্ব আছে।

স্বপ্নের ভাষা জাগরণে ব্যবহৃত ভাষা থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এজন্য প্রত্যেক স্বপ্নের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এই ব্যাখ্যাকে বলা হয় ‘তাওয়ীল’ বা ‘তাবীর’। যেমন, দুধ পান করার তাবীর—জ্ঞান অর্জন করা; পোশাক পরার তাবীর—পরহেজগারিতা ও ধার্মিকতা; সূরা ফাতিহা পাঠ করার তাবীর—উদারতা ও সহজতা; আয়াতুল কুরসি পাঠ করার তাবীর—রক্ষা ও নিরাপত্তা; সাপ দেখার অর্থ—শত্রু; মৃত্যুর অর্থ—মুক্তি, ইত্যাদি।

সবচেয়ে সত্য স্বপ্ন হয় নবীদের স্বপ্ন। তাঁদের স্বপ্ন অহীর স্তরে পৌঁছে যায় এবং সময় হলে তাদের স্বপ্নের তাবীরের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। কারণ, যদি অহীর অর্থই পরিষ্কার না হয়, তাহলে সেটা অহীই নয়। নবীদের ওপর যে অহী আসে তা বেশিরভাগ সময় জাগ্রত অবস্থায় হজরত জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আসে এবং কিছু সময় তা স্বপ্নেও আসে। স্বপ্নে আসা অহী তাঁদের সামগ্রিক অহীর ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ হয়ে থাকে (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ, নবীদের প্রতি যে অহী আসে, যদি সেটাকে ভাগ করে দেখা হয়, তাহলে তার ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ হয় স্বপ্নের মাধ্যমে।

কিছু লোক ভুল করে ধরে নিয়েছে যে, সাধারণ মানুষের স্বপ্নও অহীর ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। এটা ভুল ধারণা। কারণ, সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে, এটা সত্য স্বপ্ন না মিথ্যা। আর যদি বুঝেও যায় যে এটা সত্য স্বপ্ন, তবুও তারা নিশ্চিতভাবে এর তাবীর জানে না। সেক্ষেত্রে এমন অহীর কী উপকার, যার অর্থই স্পষ্ট নয়?

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে একটি হাদিস আছে: নবী করিম (সা.) বলেছেন, “যে আমাকে স্বপ্নে দেখেছে, সে সত্যিই আমাকে দেখেছে, কারণ শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না।” এই হাদিসের ব্যাখ্যা সহিহ হাদিসের আরেক বর্ণনায় আছে: তিনি (সা.) বলেন, “যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে, সে আমাকে জাগ্রত অবস্থাতেও দেখবে।” এর অর্থ হলো, আপনার (সা.) জীবদ্দশায় কেউ যদি আপনাকে স্বপ্নে দেখে, তবে বাস্তবেও আপনাকে দেখার সৌভাগ্য তার হবে।

স্পষ্টতই, এই হাদিস আপনার (সা.) জীবদ্দশার সঙ্গেই সম্পর্কিত। কিছু সাহাবি এ থেকে বুঝেছেন, যে ব্যক্তি আপনাকে স্বপ্নে সেই রূপে দেখেছে, যা আপনার প্রকৃত রূপ, সে-ই আপনাকে দেখেছে। এজন্যই, নবীজির (সা.) ইন্তেকালের পর কেউ যদি তাঁকে স্বপ্নে দেখত, তখন সাহাবিগণ তার দেখা রূপের বিষয়ে পুরোপুরি যাচাই করতেন। যদি সেই রূপ নবীজির প্রকৃত রূপের সঙ্গে মিলে যেত, তাহলেই তাঁকে সত্যিকারভাবে স্বপ্নে দেখেছে বলা হতো; অন্যথায়, বলা হতো যে, সে নবীজিকে দেখেনি।

সাহাবায়ে কেরামের যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর আর সম্ভব নয় স্বপ্নদ্রষ্টা যে রূপ দেখেছে তা সত্যিই নবীজির রূপ কি না, তা যাচাই করা। তাই এখন নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, কেউ নবীজিকে দেখেছে—বরং এর তাবীর করা হবে, যেমন কেউ স্বপ্নে কুরআন দেখা, বা ইবরাহিম (আ.)-কে দেখা, বা আবু বকর (রা.)-কে দেখা ইত্যাদি, এসব স্বপ্নের প্রকৃত তাবীর আলাদা হয়।

একইভাবে, কেউ যদি স্বপ্নে নবীজিকে (সা.) দেখে, কখনো তা কোনো সুসংবাদ বহন করে, আবার কখনো তাতে কোনো ইঙ্গিত বা সতর্কতা থাকে। এমনও হয়, একই সময় দুই ব্যক্তি নবীজিকে স্বপ্নে দেখে এবং উভয়ের দেখা বিষয়বস্তু একে অপরের পরিপন্থী বা বিরোধপূর্ণ হয়। কিন্তু তাদের তাবীরে বিরোধ হয় না—তাবীর স্বপ্নদ্রষ্টার অবস্থা অনুযায়ী হয়ে থাকে।

অনেক মানুষ স্বপ্নে কোনো সূরা, দোআ বা দরূদ পড়ার নির্দেশ পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে সে অনুযায়ী আমল শুরু করে দেয় এবং অন্যদেরও তা শেখাতে থাকে। এটা পুরোপুরি ভুল। প্রতিটি স্বপ্নের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।

কুরআনে এমনকি নবী নয় এমন মানুষের স্বপ্নের তাবীরও বর্ণিত হয়েছে। নবী করিম (সা.) সাহাবায়ে কেরামের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতেন। আর এই উম্মতে প্রতিটি যুগেই এমন গবেষক আলেমগণ ছিলেন, যাঁরা স্বপ্নের তাবীর ব্যাখ্যা করতেন।

সুতরাং কেউ যদি স্বপ্ন দেখে, তাহলে সে যেন এর আক্ষরিক অর্থ কখনোই না বোঝে। বরং এমন কোনো ব্যক্তির কাছে যাক, যার মধ্যে দুটি শর্ত বিদ্যমান—একটা হলো, সে যেন স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান রাখে; এবং দ্বিতীয়টা হলো, সে যেন স্বপ্নদ্রষ্টার মঙ্গলচিন্তক হয়। না বুঝে স্বপ্নের অর্থ নির্ধারণ করা অথবা জ্ঞান ছাড়াই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়া ভুল এবং দায়িত্বহীন কাজ।

শেষে এই কথাটি মনে রাখা দরকার যে, এই দ্বীন (ইসলাম) সমস্ত বিবরণসহ পরিপূর্ণ। হিদায়াত লাভের জন্য আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া উচিত। স্বপ্নকে হিদায়াতের উৎস বানানো—দ্বীনে বিকৃতি আনার একটি পথ খুলে দেয়। স্বপ্নের প্রকৃতি হলো—তা এক প্রকার সুসংবাদ বা সতর্কবার্তা, তবে তা তখনই যখন তার সঠিক ব্যাখ্যা জানা যায়। এবং এ বিষয়টি দৃঢ়ভাবে স্মরণে রাখা উচিত যে, স্বপ্ন সাধারণত জাগ্রত অবস্থায় মানুষের কর্ম ও চিন্তার প্রতিফলন হয়। স্বপ্ন নিজে কোনো প্রভাবশালী বিষয় নয়—কোনো ব্যক্তি স্বপ্নের ভিত্তিতে সফল বা ব্যর্থ হয় না এবং কেউ স্বপ্নের কারণে জান্নাত বা জাহান্নামে যাবে না। অতএব, স্বপ্নকে স্বপ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত নয়।

——————–

✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *