AkramNadwi

কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নে একটি মৌলিক নীতি হলো, গবেষণ

কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নে একটি মৌলিক নীতি হলো, গবেষণার সূচনা করতে হবে প্রশ্ন ও অনুসন্ধান দিয়ে।
এখানে ‘সন্দেহ’ বলতে অস্বীকার বোঝানো হচ্ছে না; বরং চিন্তা, গভীর মনন ও অনুসন্ধানের দরজা খুলে দেওয়া বোঝানো হচ্ছে। এটাই ছিল সকল নবী আলাইহিমুস সালামের পথ। সত্য যে, দার্শনিকরাও সন্দেহকে গ্রহণ করেন; তবে পার্থক্য এই, নবীগণ সন্দেহকে জ্ঞান ও নিশ্চিত বিশ্বাসে পৌঁছানোর সেতু বানান, আর বহু দার্শনিক সন্দেহকেই শেষ গন্তব্য ভেবে বসেন।

আপনি যখন কুরআন মাজিদের কোনো আয়াত পড়বেন, তখন যেন শুধু চোখ বুলিয়ে এগিয়ে না যান। থামুন, ভাবুন, আয়াতটির অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই আয়াতের অর্থ কি কেবল এটুকুই, না এর পরিসরে আরও অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে? যদি একাধিক অর্থের অবকাশ থাকে, তবে যাচাই করুন—কোন অর্থটি প্রমাণের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী, প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কুরআনের সামগ্রিক মেজাজের সঙ্গে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। আর কেন একটি অর্থ অন্যটির তুলনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজুন।

যতক্ষণ না হৃদয় ও বুদ্ধি উভয়ই সন্তুষ্ট হয়ে কোনো একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, ততক্ষণ গবেষণা ও অনুসন্ধানের পথ ছাড়বেন না। এই উদ্দেশ্যে তাফসির ও কুরআন অনুধাবনের নীতিমালা বিষয়ে আল্লামা ইবন তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহর রচনাগুলোর গভীর ও মনোযোগী অধ্যয়ন করুন। তাঁর লেখাগুলো আপনাকে নসের ব্যাখ্যায় ভারসাম্য, যুক্তি ও সংযমের শিক্ষা দেবে। একইভাবে মাওলানা হামিদুদ্দীন ফারাহি রহিমাহুল্লাহর গ্রন্থগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ুন। কুরআনের নাজম, আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভেতরের ঐক্য বোঝার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি দান করেন। এই দুই মনীষীর চিন্তাধারা আপনাকে এমন যোগ্যতা দেবে, যাতে আপনি কুরআন শুধু পাঠই করবেন না, বরং তার অর্থের গভীরে পৌঁছাতে পারবেন এবং তার বার্তাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করতে পারবেন।

ঠিক তেমনিভাবে হাদিস অধ্যয়নের সময় কেবল পাঠ্যাংশেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। বরং মুহাদ্দিসগণ হাদিসের সহিহ হওয়ার জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো নির্ধারণ করেছেন, সেগুলোর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা অনুধাবনের চেষ্টা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই শর্তগুলো কেন স্থির করা হলো? এগুলোর মধ্যে কোনো ঘাটতি বা সংযোজনের অবকাশ আছে কি না? ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রহিমাহুমাল্লাহ এই শর্তগুলোর অনুসরণে কতটা পরিশ্রম ও সাফল্য প্রদর্শন করেছেন? সনদের অধ্যয়ন করুন, রাবিদের জীবন ও চরিত্র জানুন, আর ইলালুল হাদিস নিয়ে চিন্তা করুন, কারণ হাদিসের বিশুদ্ধতার মূল নির্ভরতা এসব শাস্ত্রের ওপরই।

এরপর হাদিসের মূল বক্তব্যের ওপর গভীর চিন্তা করুন। একে নিছক কিছু শব্দের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত ও বাস্তব নির্দেশনা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করুন। প্রতিটি হাদিস সম্পর্কে মনে রাখুন, নবী করিম সা. এটি কোন পরিস্থিতিতে বলেছেন, কোন প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশ বা বাণী উচ্চারিত হয়েছে, এবং এর মূল মুখাতব কে ছিলেন। বহু হুকুম ও নির্দেশের প্রকৃত অর্থ তখনই স্পষ্ট হয়, যখন তার সময়কালীন, সামাজিক ও ব্যবহারিক প্রেক্ষাপট সামনে রাখা হয়।

হাদিসের এই পটভূমি ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝা সঠিক হাদিস-অনুধাবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়, কোন হাদিস সাধারণ, কোনটি বিশেষ; কোনটি স্থায়ী, আর কোনটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিনির্ভর। এই উদ্দেশ্যে মুহাদ্দিসদের নির্ভরযোগ্য শারহ ও গ্রন্থসমূহ নিয়মিত অধ্যয়নের সঙ্গী বানান। বিশেষভাবে ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহর শরহে সহিহ মুসলিম, হাফিজ ইবন হাজার রহিমাহুল্লাহর ফাতহুল বারি, ইমাম ইবন হাযম রহিমাহুল্লাহর আল-মুহাল্লা এবং আল্লামা শাওকানী রহিমাহুল্লাহর নাইলুল আওতার—এসব গ্রন্থকে আপনার স্থায়ী অধ্যয়নসম্পদে পরিণত করুন। এগুলো আপনাকে হাদিসের শব্দ, তার গভীর অর্থ, ফিকহি ফলাফল এবং আলেমদের মতভেদের ভিত্তি বুঝতে সহায়তা করবে। ফলে আপনি হাদিসে নববী সা?-কে আরও গভীরতা, ভারসাম্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

যখন আপনি কুরআন ও সুন্নাহর এই নীতিগুলোতে দৃঢ়তা অর্জন করবেন, তখন সেগুলোকে নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করুন। এরপর পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দিন এবং বিবেচনা করুন, এই বাস্তবতায় কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও দ্বীনের খেদমত করার কোন পথটি সম্ভব। যখন সেই সময় আসবে, ইন শা আল্লাহ, আল্লাহ তাআলাই আপনাকে পথ দেখাবেন এবং আপনার কাছ থেকে সেই কাজই নেবেন, যার জন্য তিনি আপনাকে প্রস্তুত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে উপকারী জ্ঞান, সৎ আমল, সঠিক চিন্তাধারা ও পরিপূর্ণ ইখলাস দান করুন, এবং আপনাকে দ্বীনের সত্যিকারের খাদিমদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

——————–

| ক্যাটাগরি : পরামর্শ, তালিম , তাজকিয়াহ।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7984

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *