AkramNadwi

কিন্তু যখন সেই দুয়া নিজের মুখে পড়ে, তখন মনে হয় আসল

কিন্তু যখন সেই দুয়া নিজের মুখে পড়ে, তখন মনে হয় আসলে সে-ই তো তার অন্তরের কথা।

||উত্তর:

আযকারে কুরআন ও হাদিসের শব্দাবলির অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। কারণ, এগুলো সরাসরি আল্লাহর ওহি এবং নবুওতের ভাষা থেকে বের হয়েছে। এ শব্দগুলোতে বরকত, প্রভাব ও পূর্ণতা সর্বোচ্চ মাত্রায় রয়েছে। এজন্যই আলেমরা সবসময় জোর দিয়েছেন যেন আযকারে আসা শব্দগুলোরই ব্যবহার করা হয়, আর সেগুলো উপেক্ষা করাকে গাফিলতি বলেছেন।

একইভাবে আখিরাতসংক্রান্ত দুয়াতেও মসনূন শব্দ বেছে নেওয়া কল্যাণকর ও বরকতময়। কারণ, এগুলোতে নবীগণ ও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পছন্দের ভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত। বান্দা যখন এসব দুয়া মুখে আনে, তখন সে আসলে সেই বরকতময় পথেই হাঁটে, যে ভঙ্গিতে আল্লাহ নিজেই সন্তুষ্ট হয়েছেন।

তবে এর পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে মানুষ নিজের ভাষায় ও নিজস্ব শব্দে দুয়া করলে তা অধিক কার্যকর ও অধিক উপকারী হয়। কারণ, নিজের মুখ থেকে বের হওয়া দুয়া-ই হৃদয়ের অবস্থা ও আন্তরিকতার প্রকৃত প্রতিফলন। বান্দা যখন নিজের পরিস্থিতি, নিজের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর কাছে মিনতি করে, তখন তাতে মনোযোগ, বিনয় এবং সত্যতার গভীরতা বেড়ে যায়। আর এ-ই হলো দুয়ার প্রকৃত রুহ, যা আল্লাহর নিকট প্রিয়।

বিশেষত দুনিয়াবি প্রয়োজনের জন্য অবশ্যই নিজের ভাষায় দুয়া করা উচিত। কারণ, প্রতিটি মানুষের চাহিদা ভিন্ন—কারও রিজিকের প্রাচুর্য দরকার, কারও রোগমুক্তি, কারও কর্মসংস্থানে স্বাচ্ছন্দ্য, আবার কারও গৃহস্থালিতে শান্তি। তাই ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী দুয়া করা কবুল হওয়ার অধিক কাছাকাছি। নিজের ভাষায় দুয়া করলে মন ভেঙে আসে, চোখে পানি চলে আসে, আর বান্দার বিনয় ও ভক্তি গভীর হয়। এ অবস্থাকেই কুরআন বর্ণনা করেছে—
“তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনয়ে ও গোপনে।”

|| প্রশ্ন ৪:

দুয়া অন্যদের জানানো ও শেয়ার করাও তো আসলে একধরনের শিক্ষা—যাতে অন্যরা আল্লাহর কাছে চাইবার ধরণ শিখতে পারে এবং তাঁদের সমস্যাও দূর হয়। তাহলে ভালো ভালো দুয়া শেয়ার করার মধ্যে কী সমস্যা থাকতে পারে?

|| উত্তর:

দুয়া স্মরণ করিয়ে দেওয়া অত্যন্ত উপকারী ও কল্যাণকর। কারণ, মানুষ প্রায়ই গাফিল হয়ে যায় এবং তাকে বারবার মনে করানোর প্রয়োজন হয়। অনুরূপভাবে আযকার ও ওরাদে মনোযোগী করা এবং তা পুনরাবৃত্তির প্রতি উৎসাহ দেওয়া কোনোভাবেই অনুচিত নয়; বরং এটি হৃদয়কে জীবন্ত করে এবং জিহ্বাকে আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত করার সর্বোত্তম উপায়।

একইভাবে দুনিয়াবি প্রয়োজন ও চাহিদার জন্য দুয়ায় উৎসাহিত করা এবং মানুষকে এর মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ সৃষ্টিজগতের ছোট-বড় সবকিছুই আল্লাহর হাতের মুঠোয়, তাঁর অনুমতি ছাড়া কিছুই সংঘটিত হয় না। তাই বান্দার উচিত প্রতিটি চাহিদায় সরাসরি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দুয়ার শব্দাবলি নির্দিষ্ট আকারে অন্যকে জানানো বা শেয়ার করা মোটেই আবশ্যক নয়। আসল উদ্দেশ্য হলো দুয়ার মর্ম ও অন্তরের অবস্থা—শুধু শব্দ নয়। প্রত্যেকে নিজের ভাষায়, নিজের অবস্থান থেকে দুয়া করুক। কারণ, আল্লাহ অন্তরের ডাক শোনেন এবং নিয়তের আন্তরিকতাই দেখেন। এজন্যই সলফে সালেহীন মানুষকে দুয়ায় উৎসাহ দিতেন, কিন্তু শব্দের বাঁধনে আবদ্ধ করাকে পছন্দ করতেন না।

||প্রশ্ন ৫:

আমার ধারণা অনুযায়ী ব্যক্তিগত দুয়া একান্তে করা উত্তম, তবে যে দুয়া সমাজের সাধারণ বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, তা তো জনসমক্ষে করা উচিত। কিন্তু আপনার বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে জনসমক্ষে দুয়া করা সঠিক নয়। অথচ বদর যুদ্ধ, ইস্তিসকা, ঈদের নামাজ এবং আরও কিছু ক্ষেত্রে নবী ﷺ সাহাবাদের সামনে দুয়া করেছেন। অনুগ্রহ করে এ বিষয়ে পরিষ্কার করে বলুন।

||উত্তর:

সমষ্টিগত দুয়া কেবল সেগুলোই গ্রহণযোগ্য ও শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো স্পষ্টভাবে হাদিসে এসেছে। শরিয়তের মূলনীতি হলো ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য নির্জনতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং বান্দার সঙ্গে তার রবের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন। আসল ‘বন্দেগি’র রুহ এ-ই যে বান্দা একান্ত বিনয়ের সঙ্গে, নিভৃতে, আল্লাহর সামনে হাত তোলে, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং নিজের প্রয়োজন পেশ করে।

তবে যেখানে শরিয়ত স্পষ্টভাবে জামাতে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে—যেমন জুমার দিন, ঈদের নামাজ, ইস্তিসকার নামাজ বা অন্যান্য নির্দিষ্ট উপলক্ষ—সেখানে সমষ্টিগত দুয়া مشروع (শরিয়তসম্মত) এবং মসনূন। কিন্তু এ ছাড়া সাধারণ অবস্থায় ইবাদত, বিশেষ করে দুয়াকে সমষ্টিগত রূপ দেওয়া শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

সমষ্টিগত দুয়ার অনেক ক্ষতি রয়েছে। এতে বান্দার অন্তর্গত সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, আন্তরিকতায় ভাটা পড়ে, আর প্রায়ই এমন দুয়া প্রকৃত দুয়া না হয়ে কেবল বাহ্যিক প্রতিবাদ, প্রদর্শন বা জনমানসে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এর ফলে দুয়াকে তার আসল উদ্দেশ্য ও রুহ থেকে সরিয়ে অন্য কিছুর মাধ্যম বানানো হয়—যা শুধু অনুপযুক্তই নয়, বরং গুরুতর বিদআত।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *