Skip to main content

AkramNadwi

আমার গ্রামের এক মৃত্যুর গল্প ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/2949

بسم الله الرحمن الرحيم.

আজ আমার গ্রামের কথা মনে পড়ল, বারবার মনে পড়ল। শৈশবের সেই দিনগুলো বারবার আমাকে তাড়া করতে লাগল, যখন নতুন সভ্যতার কোনো চিহ্নই ছিল না। গ্রামে কুয়া , হ্যান্ড পাম্প, গরু এবং গরু গাড়ি ছিল। মহিষ, ছাগল, মাঠ আর ধানক্ষেত ছিল। ছিল কাঁচা ঘরবাড়ি এবং পাকা মসজিদ। রাতের অন্ধকারে লণ্ঠনের আলো জ্বলত কিংবা চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত। পুরো গ্রামে এক ধরনের গ্রাম্য সৌন্দর্য, সৌরভ আর মাধুর্য ছিল তখন । চারদিকে মুসলিম মর্যাদার বাতাবরণ ছড়িয়ে ছিল। কাওয়ালি, গল্প, পরীদের আর ডাইনিরর গল্প শোনা যেত। “আমীর হামজা” বা “ইউসুফ-জুলেখা”র কাহিনি পড়া হতো।

একজন বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি শাহ নি’মাতুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পড়তে খুব আগ্রহী ছিলেন। তিনি সেগুলো গেয়ে গেয়ে পড়তেন এবং পরে সেগুলোর ব্যাখ্যা গ্রাম্য ধাঁচে, উর্দু মিশ্রিত ভাষায় করতেন। তিনি আমাদের বলেছিলেন যে মির্জা গুলাম আহমদ কাদিয়ানি এবং মাওলানা আহমদ রেজা খান তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর কারণেই আবির্ভূত হয়েছেন।

গ্রামের লোকদের মধ্যে সরলতা ছিল—খাওয়া-দাওয়ায় সরলতা, পরিধানে সরলতা, মেলামেশায় সরলতা এবং কথাবার্তায়ও সরলতা। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বও ছিল এবং শত্রুতাও ছিল, কিন্তু সেই শত্রুতার মধ্যে বিদ্বেষ বা ঈর্ষা ছিল না। বিয়ে বা শোকের সময় গভীর শত্রুতাও বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়ে যেত। এবং দুই শত্রু মুহূর্তেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যেত।

কল্লু চাচা আর সাধু চাচা ছিলেন প্রতিবেশী। বড়দের কাছে শোনা যায়, শৈশবে তারা বন্ধু ছিলেন এবং যৌবন পর্যন্ত তারা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাদের ক্ষেতগুলোও একে অপরের পাশেই ছিল। তাদের বন্ধুত্বের গল্প শোনা হতো এবং বারবার শোনা যেত। কিন্তু যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি, তাদেরকে সবসময় একে অপরের শত্রু হিসেবেই দেখেছি।

তাদের ঘরবাড়ি একে অপরের লাগোয়া ছিল। প্রতিদিনই বহুবার তাদের মুখোমুখি হতো, কিন্তু না কোনো সম্ভাষণ, না কোনো কথা বা বার্তা হতো তাদের মাঝে। বরং তারা একে অপরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো। কোনো সভায় যদি দু’জন থাকতেন, তবে সেই সভার প্রাণশক্তি যেন ম্লান হয়ে যেতো। এবং এমন লাগতো যেন কোনো শোক বা মাতম চলছে।

এই শত্রুতা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। দুই পরিবারের একে অপরের বাড়িতে যাওয়া-আসা বন্ধ ছিলো। এত গভীর শত্রুতা—কিন্তু কখনো কেউ জানতে চায়নি এই শত্রুতার সূচনা কীভাবে হলো, আর কেউ কখনো কিছু বলেওনি। এমন মনে হতো যে তাদের সম্পর্ক যেনো এক রহস্যের মতো। এবং সবাই এ বিষয়ে কথা বলতে কুণ্ঠিত বা এমনও মনে হতো যে এটি এমন এক রহস্যময় এবং ভয়ঙ্কর গল্প, যা উল্লেখ করে কেউ পরিবেশ নষ্ট করতে চায় না।
একটি ছোট গ্রাম, এবং এই শত্রুতা যেন তার দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

গ্রামে ঝগড়া-বিবাদ দেখা গেছে।
মানুষকে একে অপরের সঙ্গে হাতাহাতি করতে দেখা যেতো। কখনো কখনো লাঠি বেরিয়ে আসতো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ঝগড়াকারীরা বন্ধু হয়ে যেতো এবং সেই ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃত স্মৃতিতে পরিণত হতো। তবে কল্লু চাচা এবং সাধু চাচার শত্রুতা স্থায়ী ছিলো। বলা যায়, তারা শত্রুতাতেও মর্যাদাশীল ছিলেন। সবাই নিশ্চিত ছিল যে, এই শত্রুতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এমনই চলতে থাকবে, যেমনটি মুঘল সাম্রাজ্য পরিবারে চলে আসতো।

তারপর একদিন এমন হলো যে, কল্লু চাচার হঠাৎ পেটে ব্যথা শুরু হলো। কিছুক্ষণ পরেই তিনি একজন বিধবা স্ত্রী এবং এতিম সন্তানদের রেখে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। বাড়ির লোকজনের উপর মৃত ব্যক্তির শোকে আচ্ছন্ন থাকার পাশাপাশি তারা আরও বেশি ভীত হয়ে পড়েছিলো শত্রুতা ও প্রতিশোধের সেই আগুন থেকে, যা এখন সহজেই তাদের পোড়াতে পারতো। গ্রামের প্রতিটি মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে, এখন সাধু চাচা তার শত্রুতার প্রতিশোধ দুর্বল বিধবা ও অসহায় এতিমদের কাছ থেকে নেবেন, তাদের জমি দখল করে নেবেন এবং প্রতিদিন তাদের নতুন নতুন বিপদে ফেলে দেবেন। গ্রামের ভদ্র মানুষরা এক অজানা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের আত্মা এবং হৃদয় একসঙ্গে কাঁপছিল। এক কথায়, পুরো গ্রামে একটি ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিলো।

আপনি হয়তো আমার এই বর্ণনাকে কাব্যিক কল্পনা বলবেন, অথবা এটিকে অতিরঞ্জনা বলে ধরে নিতে পারেন। অথবা হয়তো আপনি ভাববেন যে, মাতৃভূমির ভালোবাসার উন্মাদনায় আমার চোখে আবেগ জন্ম নিয়েছে। আপনি বিশ্বাস করুন, এমন কিছু নয়। আজকাল মৃত্যু এত বেশি ঘটছে যে, মৃত্যুর ভয় মানুষের মন থেকে মুছে গেছে। সেই সময়ে গ্রামে মৃত্যু খুবই বিরল ছিল। অল্প বয়সে মৃত্যু আরও বিরল ছিল। আরও একটি বিষয়, কল্লু চাচার আকস্মিক মৃত্যু এক রহস্যময় ঘটনার চেয়ে কম ছিলো না । যখন জনসংখ্যা কম হয়, তখন মৃত্যু আরও ভীতিকর হয়। আর অনুভূতির তীব্রতা বেশি হলে কথা সংক্ষেপ করা সম্ভব হয় না।

এই ভয় এবং আতঙ্কের পরিস্থিতিতে, আমরা বড়দের সঙ্গে কল্লু চাচার বাড়ির দিকে রওনা হলাম। প্রতি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীতে বসন্ত শেষ হয়ে গেছে বা পৃথিবী যেন কিছু সময়ের জন্য শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে পৌঁছে আমাদের বিস্ময়ের কোনো সীমা রইল না, যখন দেখলাম সাধু চাচা সেখানে সবার আগে উপস্থিত। এটি কি বিদ্রুপ ছিল বা কোনো শয়তানি কৌশল?

তিনি দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করছিলেন। তার স্ত্রী বিধবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। তাদের সন্তানরা এতিমদের সঙ্গে মিশে সময় কাটাচ্ছিলো। কয়েকদিন যাবত সাধু চাচার বাড়ি থেকে মৃতের বাড়িতে খাবার পাঠানো হতো।

কল্লু চাচার মৃত্যুর পর সাধু চাচা তাদের পরিবারের প্রতি যে যত্নশীল ছিলেন, তার উদাহরণ মেলা ভার। তিনি তাদের সন্তানদের নিজের সন্তানদের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন, তাদের ক্ষেতখামারের যত্ন নিতেন এবং তাদের সুখ-দুঃখে সঙ্গ দিতেন। এই পরিবর্তন গ্রামের পরিবেশকে সম্পূর্ণভাবে শুদ্ধ করে দেয়। গ্রামে আর কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না, কোনো রহস্যময় অস্থিরতা ছিল না। বরং গ্রামের জীবন শান্তিতে ভরে উঠেছিল, এবং চারদিকে স্বাভাবিক চাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল।

যেমনটি আমরা তাদের শত্রুতার কারণ জানতে পারিনি, ঠিক তেমনই এই বন্ধুত্বের রহস্যও আমাদের কাছে উন্মোচিত হলো না। মানুষকে বলতে শোনা গেল যে, মৃত্যুর ভয় সাধু চাচার জীবনকে বদলে দিয়েছে, অথবা তিনি নিজেই নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করেছেন। কেউ কেউ বলল, সজ্জন ব্যক্তি মৃত্যুর পর শত্রুতা ধরে রাখেন না। তারা মৃতের সঙ্গে শত্রুতাকেও সমাধিস্থ করে দেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য তারা দয়ালু হয়ে ওঠেন এবং তাদের মুখের কথা বা হাতের কাজের মাধ্যমে কোনো কষ্ট দেন না।

যদি সজ্জনের এই প্রথা সত্য হয়, তবে আমার গ্রাম ছিল একটি পরীর রাজ্য বা কোনো জাদুর কারখানা, যেখানে চোখ বুজিয়েই জাদু করা হতো, এবং মনের শান্তি ও স্নিগ্ধতা রাজত্ব করতো। হায়, যদি আমার বুকে দুটি হৃদয় থাকতো! একটি বর্তমানের জন্য, আরেকটি অতীতে ভ্রমণ করতো! কতই না ভালো হতো যদি পৃথিবী আমার গ্রামের প্রতিচ্ছবি হতো! যেখানে ভালোবাসা থাকতো, ঘৃণা থাকত না। যেখানে বন্ধুত্ব থাকত, শত্রুতা থাকত না। আর যদি শত্রুতা থাকতো , তবে তা কোনো সাধারণ ঘটনায় বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়ে যেতো। অথবা যদি কল্লু চাচা ও সাধু চাচার মতো দীর্ঘ শত্রুতা থাকতো, তবে অন্তত মৃত্যুই সেই শত্রুতার অবসান ঘটাতো।

———-

# স্মৃতিচারণ # শিক্ষনীয় ঘটনা

> মূল :
ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য।
> অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *