শিরোনাম : আমি এক পথহারা, ভাঙা হৃদয়ের মানুষ।
——————–
بسم الله الرحمن الرحيم.
আমি আমার কষ্টগুলো ঠিক সেইভাবে বলি না, যেমনটা লেখকেরা বলেন যখন তাদের মন শান্ত থাকে, বা যেমন চিন্তাশীলেরা বলেন যখন তারা ভয়মুক্ত হন, নিশ্চিত থাকেন যে কেউ দরজায় কড়া নেড়ে ঢুকবে না, আকাশ থেকে বোমা ঝরে পড়বে না, শিশুদের চোখে ভয়ের ছায়া থাকবে না। না, আমি সেভাবে লিখি না, যেমন কেউ আরামদায়ক কক্ষে বসে মৃদু আলোয়, বই আর ভাবনার ছায়ায় কলম চালায়।
আমি লিখি এক এমন মানুষের মতো, যে জীবনে কখনো নিরাপত্তা পায়নি, শান্তি বোঝেনি, স্বস্তির স্পর্শও পায়নি। আমি লিখি, যার জন্য পৃথিবী তীব্র রূপে সংকীর্ণ, যার জন্য আকাশে করুণা নেই, মাটিতে আশ্রয় নেই। আমি লেখি বিলাসিতা থেকে নয়, অবসরের ফাঁকে নয়—আমি লিখি এক হৃদয় থেকে, যে এতটাই ভরে গেছে কষ্টে, দুঃখে, নীরবতায়—যে এখন যেন ফেটে পড়তে চায়।
তোমরা কী রাত চেনো? গাজার রাত কল্পনা করতে পারো?
না, আমি মনে করি না তোমরা তা জানো। গাজার রাত সেই রাত নয় যা কবিরা গান করে, প্রেমিকেরা জেসমিন গাছের নিচে বা নীল নদের তীরে ফিসফিসিয়ে ভালোবাসে। গাজার রাত হলো ধোঁয়া—অন্ধকার, ঘন, বিষাক্ত ধোঁয়া। এ ধোঁয়া নেশা আনে না, মৃত্যু আনে। এটা ঘর থেকে ভেসে আসা কফির ধোঁয়া নয়—এটা দগ্ধ দেহের ধোঁয়া, যাদের শেষ বিদায়ও হয়নি। এটা ধ্বংস হওয়া ঘরের ধোঁয়া, যেখানে মানুষেরা চাপা পড়েছে। এটা সেই রকেটের ধোঁয়া, যা আকাশ থেকে নেমে আসে পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফিয়ে পড়া জন্তুর মতো।
আমি হাঁটি এই রাতে, পা দিয়ে নয়—হাঁটি হৃদয় দিয়ে।
হ্যাঁ, আমার হৃদয়—যে আর স্বস্তি চেনে না, আশা চেনে না, এমনকি আর স্বাভাবিকভাবে ধুকপুকও করে না—সেই হৃদয়ই আমাকে বয়ে নিয়ে চলে। সেই হৃদয়ই কাঁপে, পড়ে যায়, কাঁদে—কিন্তু কেউ তার কান্না শোনে না। আমি হাঁটি ঠিক যেমন এক বিদেশি তার নিজের ভিটায় হাঁটে—যেখানে কেউ স্বাগত জানায় না, যেখানে কেউ আপনাকে চেনে না—যেন সন্তান পরিচিত হয় কেবল তখনই, যখন সে শহীদ হয়, আহত হয়, বা নিখোঁজ।
নিজেকে প্রশ্ন করি:
আমি কোথায় যাচ্ছি ? সেই রাস্তাগুলোর দিকে ? কিন্তু আসলে তো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।”
কিন্তু গাজার রাস্তাগুলো কই?
সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ছাইয়ের নিচে… হ্যাঁ, সেই ছাইয়ের নিচে পড়ে আছে হাড়গোড়—শিশুদের হাড়, যারা মাত্র কয়েকদিন আগেও দৌড়াদৌড়ি করত, হাসত… আজ তারা ছাই হয়ে গেছে। আমি হাঁটি তাদের ওপর দিয়ে, অনুভব করি—মাটি যেন আমার জন্য কাঁদছে। আমি ক্ষমা চাই সেই হাড়গোড়গুলোর কাছে, ক্ষমা চাই সেই চোখগুলোর কাছে, যেগুলো ঠিকমতো বন্ধ হতেই পারেনি—কারণ তারা বোমায় পুড়ে গেছে।
আমি চলতে থাকি, ঠিক যেন আমি নিজের দেশেই এক শরণার্থী—নিজভূমিতেই পথহারা।
না আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, না আছে যাওয়ার দিশা।
প্রতিবার যখন হৃদয়কে কিছু জিজ্ঞেস করি, সে চুপ করে যায়।
নফসের কাছে কথা বলতে গেলেই, সে আমাকে অবহেলা করে।
আকাশের দিকে তাকালেই, দেখি সেখানে আলো নয়—মৃত্যুর ছায়া।
গাজার আকাশে বৃষ্টি নামে না, বিদ্যুৎ ঝলকে না, বজ্রও বাজে না—
আকাশ যেন এক ভয়ঙ্কর জানোয়ার, যা আগুন বর্ষণ করে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়,
যেন কিছুই হয়নি!
আর গাজা?
আহ্ গাজা!
এটা কি শহর?
না, এটা এক খোলা ক্ষত।
এক আর্তনাদ, যেটা কেউ শুনতে চায় না।
এক মা, যে ধ্বংসস্তূপে তার সন্তানদের খুঁজছে।
এই রাস্তা—এসব কি পথ না কবরে যাওয়ার সিঁড়ি?
এই বাড়ি—এসব কি আশ্রয় না কবরস্থান?
গাজার সবকিছুই যেন মৃত্যু হয়ে কথা বলে।
হাওয়া, মাটি, এমনকি পানি পর্যন্ত।
তারপর আমাদের বলা হয়—ধৈর্য ধরো!
বলা হয়—বিজয় আসবে শিগগিরই!
কিন্তু কী সেই বিজয়?
কী সেই ধৈর্য?
শিশুর ক্ষুধা কি ধৈর্য বোঝে?
আমরা কিভাবে তাকে বুঝাই—আশা হলো খাদ্য?
এক শিশুকে কিভাবে শেখাই—এই যুদ্ধবিমানগুলো শত্রু নয়,
যখন সে দেখেছে সেগুলো তার হাসি, তার খেলনা, তার শরীর পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়েছে?
এটা ধৈর্য নয়—এটা প্রতারণা।
এটা কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—এটা একটা ছল।
এটা আশা নয়—এটা এক মিথ্যে কথা, যেটা সম্মেলনে বলা হয়—
আর আমরা বসে থাকি কষ্টে হাত কামড়ে ধরে।
আমার মনে অনেক কথা আসে—শান্ত চিন্তা নয়—আগুনের মতো গরম ভাবনা।
চিৎকার করতে ইচ্ছা করে,
এই রাতকে অভিশাপ দিতে ইচ্ছা করে,
আকাশের মুখ ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে,
এই ঘুমন্ত পৃথিবীকে জাগিয়ে তুলতে ইচ্ছা করে,
যা হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে আছে।
আমি ক্লান্ত—আল্লাহর কসম, আমি ক্লান্ত।
এই লেখালেখিতে ক্লান্ত, কবিতায় ক্লান্ত,
তাদের কথায় ক্লান্ত—যারা শুধু বলে, কিন্তু কিছু করে না।
এই নীরবতা আর কতকাল চলবে?
এই মুখোশগুলো আর কবে খুলবে?
এই কলঙ্ক আর কতকাল গোপন থাকবে?
এটা কেমন বিশ্ব—যেখানে একজন শিশু জীবন্ত দগ্ধ হয়?
আর এক সপ্তাহ পর বৈঠক হয়,
কোনো ঘোষণা ছাড়াই শেষ হয় সব?
এটাই কি মানবতা?
এটাই কি সভ্যতা?
এটাই কি বিবেক?
না—এই তো এক বন্যতা—যা নিজের গায়ে জ্ঞানীর পোশাক পরে,
কিন্তু বনের জানোয়ারের চেয়েও অমানুষিক।