Skip to main content

AkramNadwi

খোদা “ভালো”

https://t.me/DrAkramNadwi/6218

بسم الله الرحمن الرحيم.

———-

আমরা প্রায়ই অন্যদের শব্দ, পরিভাষা ও অভিব্যক্তি তাদের আসল অর্থ বা প্রেক্ষাপট না বুঝেই গ্রহণ করে ফেলি এবং নির্দ্বিধায় সেগুলোকে আমাদের বৌদ্ধিক বা চিন্তাগত বক্তব্যে অন্তর্ভুক্ত করি। বিষয়টি তখন বিশেষভাবে জটিল হয়ে ওঠে যখন ওই শব্দ বা পরিভাষা এমন কোনো সভ্যতা বা দার্শনিক ঐতিহ্য থেকে গৃহীত হয়, যার চিন্তাগত ভিত্তি আমাদের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এটি উপেক্ষিত থাকে যে যেসব শব্দ বা ধারণা আমরা ব্যবহার করি, সেগুলো নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক, চিন্তাগত ও বিশ্বাসগত ভিত্তি ধারণ করে। এগুলোকে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যে অন্তর্ভুক্ত করার আগে এদের চিন্তাগত গঠন, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং দার্শনিক ভিত্তি বোঝা অপরিহার্য।

এই ধরনেরই একটি বাক্য, যা প্রায়ই উচ্চারিত হয় এবং যা কালামি ও সুফি চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা হলো: “খোদা ভালো।”

যখন প্লেটো ও অন্যান্য গ্রিক দার্শনিকরা এই অভিব্যক্তি ব্যবহার করেন, তখন তাদের উদ্দেশ্য থাকে না আল্লাহর ব্যক্তিগত গুণাবলি বা সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বোঝানো। বরং, তারা “ভালো”-কে একটি পরাবাস্তব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা হিসেবে বিবেচনা করেন। প্লেটোর মতে, “ভালো” (The Good) একটি মানসিক ধারণা বা আদর্শ রূপ (Ideal Form), যা বাস্তবতার সর্বোচ্চ স্তরে প্রতিষ্ঠিত। “খোদা”-কে তিনি এই “পরম ভালত্ব”-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন, কোনো সচেতন, ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন বা গুণসম্পন্ন প্রভু হিসেবে নয়।

প্লেটোর এই ধারণা পরবর্তীতে সুফি চিন্তায় এবং কিছু দার্শনিক ও কালামি চিন্তাধারায় প্রবেশ করে, যেখানে “খোদা”-কে “পরম ভালত্ব”, “চিরন্তন সৌন্দর্য” বা “বিশুদ্ধ আলো” হিসেবে ভাবা হতে থাকে। এরিস্টটল প্লেটোর এই ধারণার সমালোচনা করেন এবং একে অপ্রয়োগযোগ্য মনে করেন, কারণ তাঁর মতে “ভালত্ব”-এর মতো বিমূর্ত ধারণাকে বাস্তবতার বাহ্যিক ব্যবস্থায় প্রাথমিক কারণ হিসেবে মানা অযৌক্তিক।

ইসলামে আল্লাহ তাআলার ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুরআন ও হাদীসের আলোকে, আল্লাহ তাআলা শুধু পরম ভালত্ব নন, বরং ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন, জ্ঞানী, অবগত, এবং সৃষ্টির প্রতি প্রেম ও সম্পর্ক রাখেন — এমন এক প্রভু।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহর গুণাবলি দুটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত:

১. তাসবিহি গুণাবলি: অর্থাৎ, আল্লাহ সব ধরনের ত্রুটি, ঘাটতি, দুর্বলতা ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র (সুবহানাল্লাহ);
২. তাহমিদি গুণাবলি: অর্থাৎ, তিনি স্রষ্টা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, পরম করুণাময় ও দয়ালু, এবং তিনি তাঁর সৃষ্টির মঙ্গল চান।

সহীহ হাদীসে এসেছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”
এই হাদীসের প্রেক্ষাপট দর্শনভিত্তিক “খোদা ভালো” এই অভিব্যক্তি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে “সৌন্দর্য” বলতে বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা, অন্তরের উত্তম গুণ, চরিত্রের সৌন্দর্য এবং কর্মের সৌন্দর্য বোঝানো হয়েছে, কোনো পরাবাস্তব বা প্লেটোনিক ভালত্ব বোঝানো হয়নি।

তবে সুফিগণ সাধারণত এই হাদীসকে প্লেটোনিক “পরম ভালত্ব” (The Good) ধারণার সমর্থনে উপস্থাপন করেন, অথবা অন্ততপক্ষে এই ধারণাকে ইসলামী রঙ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেন। এই ব্যাখ্যা যদিও নিয়তের দিক থেকে সদিচ্ছা-প্রসূত হতে পারে, তথাপি জ্ঞান ও বিশ্বাসের দিক থেকে একে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা জরুরি, কারণ প্লেটোনিক দর্শন এবং ইসলামী আল্লাহর ধারণার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।

“খোদা ভালো” — এই বাক্যটি এমনই, যেন বলা হয় “আকাশ ভালো”, “ফুল ভালো”, বা “জীবন ভালো”। এটি একটি উপমামূলক ও অসম্পূর্ণ অভিব্যক্তি। এই বাক্যটিতে না আছে আল্লাহর তাসবিহ, না আছে তাহমিদ।

কারণ আকাশ নিঃসন্দেহে সুন্দর, কিন্তু তা ত্রুটিমুক্ত নয়; ফুল সুগন্ধি, কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী; জীবন সুন্দর হতে পারে, কিন্তু তাতে আছে কষ্ট, দুঃখ ও ধ্বংসের দিক। এই জিনিসগুলোকে “ভালো” বলা একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা সৌন্দর্যবোধসম্পর্কিত মূল্যায়ন, যা কেবল বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে করা হয় — আসল গুণাবলি বা অস্তিত্বগত মর্যাদার ভিত্তিতে নয়।

যদি আমরা এই একই পৃষ্ঠতলীয় মানদণ্ড আল্লাহর জন্যও ব্যবহার করি, তাহলে বাস্তবে আমরা তাঁকে সৃষ্টির মাপকাঠিতে বিচার করতে থাকি, অথচ তিনি ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র, সব সৃষ্টির ঊর্ধ্বে এবং পরিপূর্ণ গুণাবলিসম্পন্ন।

“খোদা ভালো” — এই বাক্যটি দেখতে একটি ইতিবাচক ও সহজ উক্তি মনে হলেও, বাস্তবে এটি “ওয়াজিবুল উজুদ”-এর মতো এক অইসলামী আল্লাহ-ধারণাকে শক্তিশালী করে তোলে। এই অভিব্যক্তি গ্রিক দর্শনের পরাবাস্তব চিন্তার অংশ, যা ইসলামী প্রভু-ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার বিপরীতে, ইসলাম আল্লাহকে এক, অদ্বিতীয়, পূর্ণ গুণাবলিসম্পন্ন, সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা এবং যা ইচ্ছা তা করার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে বিশ্বাস করে। তিনি শুধু সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা নন, বরং প্রতিটি সৃষ্টির খবর রাখেন, তাদের ভালোবাসেন এবং তাদের পথনির্দেশনার জন্য নবী পাঠান।

———-

✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *