https://t.me/DrAkramNadwi/5962
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
————-
গতকাল (শনিবার রাত, ১৪৪৬ হিজরির শাওয়াল মাসের সপ্তম তারিখে) আমার মেয়ে ফাতেমা ও তার স্বামী ডা. ইমরান–এর ঘরে অক্সফোর্ডের John Radcliffe Hospital-এ একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। আমি তখন রিডিং শহরে মেয়ে আয়েশার সাথে ছিলাম এবং সেখানে কিছু পুরুষ ও নারীদের জন্য কুরআনের তাফসির পড়াচ্ছিলাম। যখন আমি দার্স (পাঠ) শেষ করে ফিরে এলাম, তখন এই খুশির সংবাদ আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি আল্লাহর অগণিত ও অপরিসীম নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রশংসা করলাম এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম।
এরপর নানা প্রয়োজন ও ব্যস্ততা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, কারণ আমি রোববার সকাল (৮ই শাওয়াল) ইনশাআল্লাহ ভারতে সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। ফলে বিকেল সাড়ে চারটার আগে আমি হাসপাতালে যেতে পারিনি। সেখানে পৌঁছে দেখলাম, নবজাতক ও তার মা দুজনেই সুস্থ আছেন। আমি আমার জামাতা ডা. ইমরানের সাথে কিছু বিষয়ে কথা বললাম। তারা তাদের কন্যার নাম রেখেছে “আয়েশা”। আমি বললাম, আমাদের বাড়িতে এই নামটি নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি হতে পারে, কারণ তার খালারও একই নাম । উল্লেখযোগ্য যে, ভারতে এমন এক প্রথা প্রচলিত আছে যে, একই পরিবারে তিন প্রজন্মের মধ্যে এক নাম পুনরাবৃত্তি করা হয় না, যেন সম্বোধনে বিভ্রান্তি না হয়।
ফাতেমা আমাকে জানাল যে, ইমরান নবজাতকের ডান কানে আজান দিয়েছে এবং বাম কানে ইকামত পড়েছে, যেভাবে আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে। যদিও এটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, তবে আলেমরা এই আমলকে পছন্দ করেছেন, কারণ তারা চান—নবজাতক তার জীবনের শুরুতেই যেন তাওহিদের বাণী শোনে, যেন সে “সম্পূর্ণ আহ্বান” দিয়ে জীবনের যাত্রা শুরু করে। কারণ, প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাহের ওপর জন্মগ্রহণ করে, আর আল্লাহর নাম ও তাঁর তাওহিদই এই ফিতরাহের প্রথম দাবি।
এরপর ফাতেমা আমাকে নবজাতককে তাহনিক করাতে বলল। সহিহ বুখারিতে এসেছে—আস্মা বিনতে আবু বকর (রাযি.) তাঁর সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়েরকে জন্ম দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যান। তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নেন এবং একটি খেজুর দিয়ে তাহনিক করেন, অতঃপর তার জন্য বরকতের দোয়া করেন। সহিহ বুখারিতে আরও এসেছে—আবু মূসা আশ’আরী (রাযি.) বলেন: “আমার একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিল, আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইব্রাহিম, তাহনিক করলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন।” এই মহান সুন্নাহ অনুসরণে আমিও নবজাতককে তাহনিক করালাম। খেজুর চুষে নেয়ার সময় তার মুখে এমন এক আনন্দ ফুটে উঠল, মনে হলো সে যেন আরও চাইছে!
ইমাম ফরাহী (রহ.) যথার্থই বলেছেন—ফিতরাহ শুধু দাবি করে না, বরং সে আনন্দ পায় ও উপভোগ করে, যখন তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু পায়। আর কষ্ট পায় যখন সে তার প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে বঞ্চিত হয়। ভালো-মন্দ উপলব্ধি করাও একটি ফিতরী ব্যাপার, যাকে আকল ও ওহী সহায়তা করে এবং এই দুয়ের মাধ্যমে তা সুস্পষ্ট হয়। যারা ভালো-মন্দকে শুধু আকল সঙ্গত বা কেবল শরঈ মনে করেছে, তারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সত্য এই যে, ভালো ও মন্দ—এই দুইটি মুলত ফিতরী, যার বিশদ ব্যাখ্যা ওহীর মাধ্যমে জানা যায়, এবং আকলও তা সমর্থন করে।
আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাঁর ওপর নির্ভরশীলতা প্রকাশ করা এবং তাঁর স্মরণে আনন্দিত হওয়া—এসব ফিতরার গভীর শিকড় থেকে উৎসারিত, যা আত্মিক পরিপূর্ণতা ও গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। কেননা, ফিতরাহর মাঝে চিরন্তন সত্য নিহিত থাকে। এই ফিতরাহ-ই ছিল ইবরাহিম (আ.)-এর অনুভব, যা তিনি যুক্তির সর্বোচ্চ মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফিতরাহ মানুষকে তার প্রকৃত প্রভুর প্রতি প্রবল আকর্ষণে উদ্বুদ্ধ করে, তার আত্মা তাতে সাড়া দেয় এবং উপচে পড়ে।
এ বিষয়ে কিছু মুফাসসিরের বাণী অত্যন্ত সুন্দর—
“এটা ফিতরাহর কণ্ঠ, যা ইবরাহিমের জবানিতে কথা বলে। তখনো তিনি নিজ বুদ্ধি ও উপলব্ধি দিয়ে তাঁর প্রভুকে খুঁজে পাননি, তবে তাঁর বিশুদ্ধ ফিতরাহ প্রথমেই অস্বীকার করেছে—এই মূর্তিগুলো তার প্রভু হতে পারে না। কারণ ইবরাহিম (আ.)-এর কওম, যারা ছিলেন ইরাকের কালদীয় সম্প্রদায়, তারা মূর্তি ও নক্ষত্র উপাসনা করত। কিন্তু সেই প্রভু, যাকে দুঃখ-সুখে ডাকা হয়, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ ও জীব—ইবরাহিম (আ.)-এর ফিতরাহ অনুযায়ী তিনি কখনোই পাথরের মূর্তি বা কাঠের প্রতিমা হতে পারেন না। যখন দেখা গেল এই মূর্তিগুলো সৃষ্টি করে না, রিজিক দেয় না, শুনে না, সাড়া দেয় না—তখন তা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তারা উপাসনার যোগ্য নয়। এমনকি তারা প্রকৃত ইলাহর সাথে মাধ্যম হিসেবেও গ্রহণযোগ্য নয়।”
আমরা হাসপাতালে কিছু সময় কাটালাম। সেখানে নতুন শিশুর আগমনে পরিবেশ ভরে উঠেছিল আনন্দ ও উল্লাসে। সবাই ছিল চরম খুশিতে, আর ফাতেমা ও ইমরান তাদের নবজাতককে ভালোবাসা ও দোয়ার আলিঙ্গনে ঘিরে রেখেছিল। একের পর এক দোয়া ও শুভেচ্ছা আসছিল, আমরা পারস্পরিকভাবে দোয়া বিনিময় করছিলাম।
আমরা নবজাতকটির জন্য দোয়া করলাম এবং আল্লাহর কাছে কাতরতা সহকারে চাইলাম—তিনি যেন তাতে বরকত দান করেন, তাকে সৎ ও ইবাদতগোজার বানান, তার জীবন আলো ও হিদায়াতে পূর্ণ করে দিন। হে আল্লাহ! তাকে তার পিতামাতার চোখের শীতলতা বানাও, তাদেরকে তার নেকী ও আনুগত্যে ধন্য করো। আমরা আশা করি—এই বরকতময় কন্যাশিশুটি তার পরিবারে সুখ ও শান্তির উৎস হবে এবং তার জীবন যেন সেই সূর্যালোকের মতো উদিত হয়, যা অন্ধকারকে দূর করে দেয়।
——————–
✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।