AkramNadwi

দুর্বল হাদিসের পরিচয় ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/2033

بسم الله الرحمن الرحيم


———-

তারা বলল: আপনি পূর্বে দুটি প্রবন্ধে সহীহ হাদিস ও হাসান হাদিসের অর্থ আমাদের জন্য সুস্পষ্ট করেছেন, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট ও পরিপূর্ণ ছিল। এখন আমাদের কাছে দুর্বল হাদিসের অর্থ ব্যাখ্যা করুন।
আমি বললাম: দুর্বল হাদিসের অর্থ না বোঝার কারণে মানুষ মারাত্মক ভুলের মধ্যে পতিত হয়েছে। কেউ একে একেবারে প্রত্যাখ্যান করে, কেউ সহীহ ও হাসান হাদিসের মতোই গ্রহণ করে, আবার কেউ আইন ও বিধানের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যান করে কিন্তু ফযীলত, উৎসাহ ও সতর্কতার ক্ষেত্রে গ্রহণ করে।

তারা বলল: এই দলগুলোর মধ্যে কোনটি সত্যের নিকটবর্তী?
আমি বললাম: প্রতিটি দলই কিছুটা সঠিক এবং কিছুটা ভুল করেছে। তবে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা একে অপরকে নানান অভিযোগে আক্রমণ করে—কখনও নম্রভাবে, কখনও কঠোরভাবে।
তারা বলল: মনে হচ্ছে আপনিও তাদের পথেই হাঁটছেন, অন্যের ভুল ধরছেন আর নিজেকে সঠিক বলে দাবি করছেন।
আমি বললাম: যদি আমি তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করি?
তারা বলল: তাহলে উপস্থাপন করুন, যদি আপনি সত্যবাদী হন।
আমি বললাম: শোনো এবং বুঝো:

হাদিসের ইমামগণ ছিলেন দক্ষ, সুসংহত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী, যারা এই শাস্ত্রে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রসিদ্ধ। তারা হাদিসগুলোকে যথাযথভাবে যাচাই করেছেন এবং নবী সা. এর নামে শুধুমাত্র সেগুলোকেই সংযুক্ত করেছেন যেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিলেন—যেগুলোতে পূর্বে বর্ণিত সহীহ হাদিসের শর্তগুলো পূর্ণ ছিল। আর যেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হয়নি, সেগুলোকে তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। যেগুলো মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলোকে তারা জাল ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। এভাবে সহীহ ও জাল হাদিসের মধ্যবর্তী অসংখ্য হাদিসকে তারা “দুর্বল” আখ্যা দিয়েছেন।

তারা বলল: তাহলে দুর্বল হাদিস সম্পর্কে তাদের অবস্থান কী? আমি বললাম: হাদিসবিদরা ছিলেন সর্বোত্তম ন্যায়পরায়ণ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তারা দুর্বল হাদিসগুলোর উপর একই রকম কঠোর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি; বরং পুনরায় সেগুলো পর্যালোচনা করে সতর্কতার সাথে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। তারা বলল: আমাদের কাছে তাদের সুন্দর শ্রেণিবিন্যাসটি পরিষ্কার করে বলুন, যাতে কোনো অবিচার, অতিরঞ্জন বা অবহেলা নেই। আমি বললাম: তারা দুর্বল হাদিসের বিষয়বস্তুকে ধারণ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এবং এগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন—গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যাত।

তারা বলল: এর মধ্যে কোনগুলো গ্রহণযোগ্য? আমি বললাম: এটি চার প্রকার:

প্রথম প্রকার: যে দুর্বল হাদিসকে ইমাম বুখারী ও মুসলিম (শাইখাইন) সহীহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তাদের গ্রন্থের মূল অংশে সংকলন করেছেন। এটি এমন হাদিস যাতে সহীহ হাদিসের শর্তগুলো পূর্ণ ছিল এবং যার অনেকগুলো সনদ রয়েছে। কোনো কোনো সনদে এমন বর্ণনাকারী থাকতে পারেন যার স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল, যা তাকে প্রথম শ্রেণির রাবীদের স্তর থেকে নিচে নামিয়ে দেয়। কিন্তু যখন হাদিসটি অন্যান্য সঠিক সনদ দ্বারা প্রমাণিত হয়, তখন শাইখাইন সেই দুর্বল রাবীর সনদেও হাদিসটি উল্লেখ করেন। এটি ইমাম বুখারীর একটি পদ্ধতি, কারণ তিনি একটি হাদিস থেকে অনেকগুলো মাসআলা বের করেন এবং একই সনদ বারবার উল্লেখ করতে তিনি অপছন্দ করেন। তাই তিনি কখনও কখনও সেই দুর্বল রাবীর সনদও ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, ইসমাঈল ইবনে আবি উয়াইস—যিনি যদি এককভাবে হাদিস বর্ণনা করেন, তবে তা দুর্বল হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি তিনি আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আত-তানীসী বা আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা আল-কা’নাবীর মতো নির্ভরযোগ্য রাবীদের সমর্থন পান, তাহলে বুখারী প্রয়োজনে ইসমাঈলের সনদেও হাদিসটি উল্লেখ করেন।

আবার কোনো হাদিস এমন হতে পারে যা নির্ভরযোগ্য সনদে প্রমাণিত, কিন্তু কোনো দুর্বল রাবী তা উচ্চস্তরের সনদে বর্ণনা করেছেন। যেমন, ইমাম মুসলিম হাফস ইবনে মাইসারার লেখা একটি সহীহ সনদযুক্ত পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তা নিম্নস্তরের সনদে বর্ণিত। অন্যদিকে সুওয়াইদ ইবনে সাঈদ আল-হারাবী তা উচ্চস্তরের সনদে বর্ণনা করেছেন, যদিও তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বলে স্বীকৃত। তবুও মুসলিম তার সনদে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, কারণ এটি অন্যান্য নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে সহীহ হিসেবে প্রমাণিত।

আবার কোনো দুর্বল রাবী এমন হতে পারেন যাকে অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাদিস বর্ণনার জন্য গ্রহণ করা যায়, যেমন ফুলাইহ ইবনে সুলাইমান।

জেনে রাখো, শাইখাইন দুর্বল রাবীদের হাদিস মূল গ্রন্থে দুটি শর্তে গ্রহণ করেছেন:
১. দুর্বলতা যেন অত্যধিক না হয়।
২. সেই দুর্বল রাবী যেন তাদের নিজস্ব শিক্ষক হন, কারণ তারা তাদের শিক্ষকদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানতেন।

দ্বিতীয় প্রকার: হাদিসের এক বা একাধিক সহীহ সনদ থাকলে, শাইখাইন মূল গ্রন্থে সেগুলোর উপর নির্ভর করেন। এরপর তারা সেই হাদিসের অন্যান্য সনদও উল্লেখ করেন, যেগুলোতে কিছুটা দুর্বল রাবী থাকতে পারেন। এটি সহীহ বুখারীতে কম এবং সহীহ মুসলিমে বেশি দেখা যায়।

তৃতীয় প্রকার: হাদিসের কোনো সহীহ সনদ না থাকলেও কিছুটা দুর্বল (কিন্তু গ্রহণযোগ্য) সনদ থাকলে, তাকে “হাসান” বলা হয়। যদি এর একাধিক সনদ থাকে, তবে তা “সহীহ লিগাইরিহী” (অন্যান্য সনদের কারণে সহীহ) বা “হাসান লিগাইরিহী” (অন্যান্য সনদের কারণে হাসান) পর্যায়ে উন্নীত হয়। তবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে “সহীহ লিগাইরিহী”, “হাসান লিযাতিহী” বা “হাসান লিগাইরিহী” এর কোনো উদাহরণ নেই। কেউ যদি এমন দাবি করে, তবে তা তার ভুল বুঝাবুঝির কারণে, সম্ভবত সে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকারের সাথে তৃতীয় প্রকারকে গুলিয়ে ফেলেছে।

চতুর্থ প্রকার: সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের মতো বড় তাবেঈদের মুরসাল হাদিস। ইমাম মালিক, আবু হানিফা ও অন্যান্য ফকীহগণ এগুলোকে সহীহ বলেছেন, যা একটি শক্তিশালী মত।

তারা বলল: দুর্বল হাদিসের মধ্যে কোনগুলো প্রত্যাখ্যাত? আমি বললাম: সেগুলোও চার প্রকার:

প্রথম প্রকার: যে হাদিসের সনদে বিচ্ছিন্নতা আছে বা নির্ভরযোগ্য কিন্তু “মু’আন’আন” সনদে বর্ণিত (যেখানে “অমুক থেকে বর্ণিত” বলা হয়েছে কিন্তু সরাসরি শোনার উল্লেখ নেই), তার দুর্বলতা অপেক্ষাকৃত কম। মানুষ সাধারণত ফযীলত, উৎসাহ ও সতর্কতার ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করে।

দ্বিতীয় প্রকার: যে হাদিস কেউ কেউ মারফু (নবীর কথা/কর্ম হিসেবে) বর্ণনা করেছেন, কিন্তু হাদিস বিশেষজ্ঞদের মতে এটি মাওকুফ (সাহাবীর কথা/কর্ম হিসেবে) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটিও ফযীলতের ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য।

তৃতীয় প্রকার: শায (বিচ্ছিন্ন) হাদিস—এটি এমন হাদিস যা কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী অন্যান্য নির্ভরযোগ্য রাবীদের বিপরীতে বর্ণনা করেছেন। শায হাদিস নির্ভরযোগ্য রাবীদের ভুল বা বিভ্রান্তির ফল। এ ধরনের হাদিস ধর্মীয় কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা জায়েজ নয়, এমনকি মুতাবিয়াত (সমর্থনকারী সনদ) বা শাহিদ (সাক্ষ্যদানকারী হাদিস) হিসেবেও গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু মানুষ ভুলবশত এগুলোকে মুতাবিয়াত বা শাহিদ হিসেবে ব্যবহার করে, যা হাদিসবিজ্ঞানীদের পদ্ধতি না বোঝার কারণে ঘটে। কারণ নির্ভরযোগ্য রাবীদের ভুল বা বিভ্রান্তি কোনো হাদিসকে শক্তিশালী করে না।

চতুর্থ প্রকার: মুনকার (অস্বীকৃত) হাদিস—এটি এমন হাদিস যা কোনো দুর্বল রাবী অধিক নির্ভরযোগ্য রাবীদের সমষ্টির বিপরীতে বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও যে হাদিসের বক্তব্য কুরআনের অর্থ, সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান বা যুক্তিবিরোধী, অথবা যা অগভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা বর্ণনা করেছেন—সবই মুনকারের অন্তর্ভুক্ত। এটি দুর্বল হাদিসের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকার এবং হাদিস বিশেষজ্ঞদের নিকট এটি প্রায় জাল হাদিসের কাছাকাছি পর্যায়ের।

তারা বলল : আমরা আপনার বক্তব্য বুঝতে পেরেছি এবং এতে সন্তুষ্ট হয়েছি।
আমি বললাম: তাহলে আল্লাহর প্রশংসা করো, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং তিনিই সঠিক পথের দিশা দেন।

——————–

✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *