https://t.me/DrAkramNadwi/5859
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
——————–
আজ ভোরবেলায়ই এক ভদ্রলোক এসে দরজায় প্রচণ্ড জোরে কড়া নাড়তে লাগলেন। ফজরের পর আমি সাধারণত কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন থাকি। আল্লাহর কিতাবের স্বাদ ও আনন্দের তুলনায় পৃথিবীর সব বিনোদন তুচ্ছ মনে হয়। আন্তরিক বন্ধুদের আগমনও তখন বিরক্তিকর ঠেকে। আমি তিলাওয়াতে নিমগ্ন রইলাম এবং ভাবলাম, যদি কোনো উত্তর না দিই, তবে এই আকস্মিক বিপদ আপনা-আপনিই কেটে যাবে। কিন্তু আগন্তুক যেন কোনো মহাপ্রলয়ের চেয়ে কম কিছু ছিল না! সে একনাগাড়ে দরজা ধাক্কাতে লাগল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, যদি দরজাই ভেঙে যায়, কিংবা প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে না যায়!
অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দরজা খুললাম। দেখলাম, আমার বন্ধু মুফতি সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। মুফতি সাহেবের জাঁদরেল ব্যক্তিত্বে কে না প্রভাবিত হবে! আমার রাগ নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। কৃত্রিম ভদ্রতার সঙ্গে বললাম, “কিবলা! এ সময়ে আপনার আগমন! সব ঠিকঠাক তো?”
তিনি বললেন, “তোমার কাছে আসা কি তোমার খারাপ লাগল? একজন মুসলমান যখন কারও দরজায় আসে, তখন হাসিমুখে তার অভ্যর্থনা করা উচিত। আর তুমি তো মুখ গোমড়া করে রেখেছ!”
আমি বললাম, “না মুফতি সাহেব, ব্যাপারটা এমন নয়। আসলে আমি এই সময়ে তিলাওয়াত করি, আর কুরআনের গভীর চিন্তায় বিঘ্ন ঘটলে ভালো লাগে না।”
মুফতি সাহেব আমার কথা যেন কানে তুললেনই না! জোর করে ঘরে ঢুকে অতিথিকক্ষে সোফায় শুয়ে পড়লেন। এরপর গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বললেন, “বেটা, অনুতপ্ত হবে তুমি! মৃত্যুর পর আমার মূল্য বুঝবে। এই শের মনে রেখো:
কী বর্ণনা করবে, আমার জন্য কাঁদবে বন্ধুরা,
কিন্তু তখন আমার বিপর্যস্ত জবান থাকবে চুপচাপ!
শোনো! আমার আগমনকে বিঘ্ন মনে কোরো না, বরং এটিকেও তোমার তিলাওয়াতের অংশ হিসেবে ধরে নাও। আমি আজ তোমার কাছে আমার একটি কুরআনি গভীর ভাবনা শোনাতে এসেছি। তিলাওয়াত করতে করতে এক আশ্চর্য বিষয় আমার মনে এলো, যা আর গোপন রাখতে পারলাম না!”
আমি হেসে বললাম, “মুফতি সাহেব! ঋতুস্রাব ও প্রসবকাল সংক্রান্ত মাসায়েল থেকে কি অবসর পেয়ে গেছেন? আজকাল কি তালাক, ইদ্দত, তিন তালাক ও হিল্লা সংক্রান্ত কোনো ফতোয়া আসা বন্ধ হয়ে গেছে?”
মুফতি সাহেবের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। তিনি বললেন, “তোমার ভেতর অহংকার আর আত্মগরিমা বেশি! তুমি মনে করো, তোমার ছাড়া কেউ কুরআন বোঝে না! সর্বজ্ঞতার দাবি করা শয়তানিও হতে পারে। শোনো, আমি তাফসির ও হাদিস পড়েছি!”
আমি বললাম, “জালালাইন তাফসির একবার পড়ে নিলে কুরআনের মর্ম বোঝা যায় না! আপনি ফিকহের কিছু কিতাব গভীরভাবে পড়েছেন, তাই ফিকহ সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান হয়েছে এবং ‘মুফতি’ উপাধিও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি তাফসির ও হাদিসের মতো ফিকহের পূর্ণ অধ্যয়ন করতেন, তাহলে ফিকহ সম্পর্কেও শুধু বরকতের জন্য সামান্য জ্ঞানই অর্জিত হতো!”
তিনি বললেন, “তোমার এই কথাগুলোই আমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়!”
আমি বললাম, “মুফতি সাহেব, ঠিক আছে, মজা বন্ধ করছি। এবার বলুন, আপনার কী নতুন গবেষণা এসেছে? জীবনে প্রথমবার কুরআনের গভীরে ডুব দিয়েছেন, দেখি, কোনো মুক্তা খুঁজে পেয়েছেন নাকি…?”
তিনি দাঁত চেপে বললেন, “এভাবে কটাক্ষ করতে থাকলে আমি চলে যাব!”
আমি বললাম, “হুজুর, আমি ক্ষমাপ্রার্থী! বলুন, আপনার নতুন গবেষণা কী?”
কোনো ভূমিকা ছাড়াই তিনি বললেন, “আজ সূরা ইউসুফের তিলাওয়াত করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম যে ইউসুফ (আ.)-কে তার ভাইয়েরা বিক্রি করেছিল!”
আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। বললাম, “এটা কী ধরনের সাধারণ কথা! কোনো ফুটপাথ থেকে ইউসুফ-জুলেখার কোনো গল্প নামমাত্র মূল্যে কিনে পড়েছেন নাকি? আর এখন সেটাকে কুরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করছেন! আপনার এই তথাকথিত চিন্তাশক্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি, এবং আপনার গবেষণাকে নিয়ে হতাশ হচ্ছি!”
এবার তো মুফতি সাহেব প্রচণ্ড রেগে গেলেন। আমার ওপর তার সমস্ত রাগ উগরে দিয়ে বললেন, “তাহলে তুমি কী মনে করো? কোনো নেকড়ে কি ইউসুফ (আ.)-কে বিক্রি করেছিল?”
আমি বললাম, “মুফতি সাহেব, হুঁশে আসুন! আপনার এই গবেষণা আমাকে বাগদাদের সেই ওয়ায়েজের গল্প মনে করিয়ে দিলো, যে একবার ওয়াজের মাঝে শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করল: ‘সে নেকড়ের নাম কী, যে ইউসুফ (আ.)-কে খেয়ে ফেলেছিল?’
শ্রোতারা একসঙ্গে বলে উঠল, ‘নেকড়ে তো ইউসুফকে খায়ইনি!’
ওয়ায়েজ কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, তাহলে সেই নেকড়ের নাম বলো, যে ইউসুফ (আ.)-কে খায়নি!'”
মুফতি সাহেব এবার গম্ভীর হয়ে বললেন, “দেখো, হাসি-তামাশা বন্ধ করো। যখন তুমি আমার কথার সত্যতা বুঝবে, তখন বাহবা দেবে!”
আমি বললাম, “হুজুর! কিছু গল্প-কাহিনির বইতে আপনার বলা কথাটি লেখা আছে, কিন্তু কুরআনে নেই। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ইউসুফ (আ.)-কে তার ভাইয়েরা কুয়োতে ফেলে দিয়েছিল। এরপর তারা আবার কুয়োর কাছে ফিরে এসেছে—এমন কোনো উল্লেখ নেই।
আল্লাহ তাআলা কেবল এটুকু বলেছেন যে, এক কাফেলা সেই কুয়োর কাছে পৌঁছল। তারা একজন লোককে পানি আনার জন্য পাঠাল। সে যখন কুয়ো থেকে বালতি টানল, তখন দেখল, তাতে একটি ছেলে উঠে এসেছে! তারা বিস্মিত হলো। এরপর তারা তাকে মালপত্রের মাঝে লুকিয়ে রাখল, যেন পরে কোথাও বিক্রি করে দিতে পারে।
এরপর কুরআনে এসেছে: “وَشَرَوْهُ بِثَمَنٍ بَخْسٍ” (তারা তাকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করে দিল), কারণ তারা ভয় পাচ্ছিল যে, তাদের গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাবে।”
এটাই কোরআনের বর্ণনা, “শারাউহু” (وَشَرَوْهُ) ক্রিয়ার কর্তা হলো কাফেলার লোকেরা, ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর ভাইরা নয়।
মুফতি সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “শেষ পর্যন্ত ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে কুয়ায় ফেলে কে দিয়েছিল?”
আমি বললাম, “এর দ্বারা কী আসে যায়?”
তিনি বললেন, “আসে যায়! যদি তুমি কাউকে লাঠি দিয়ে মারো, তাহলে মারার কৃতিত্ব তোমার দিকেই যাবে। বরং, যদি তুমি কোনো কুকুরকে পাথর মারো, তাহলে কুকুরটি তোমার পেছনে ছুটবে, পাথরের পেছনে নয়।
ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) কখনো কাফেলার লোকদের দোষারোপ করেননি, বরং তিনি তার ভাইদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
‘هل علمتم ما فعلتم بيوسف وأخيه’
(তোমরা কি জানো, তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সঙ্গে কী করেছিলে?)
এই ভিত্তিতেই আমি বলছি— ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে তার ভাইয়েরাই বিক্রি করেছিল।
এ কথা শুনে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম!
আমার মুখ থেকে আপনাতেই বেরিয়ে এলো:
‘مشكل زتوجه تو آساں، آساں زتجاہل تو مشكل’
(তোমার মনোযোগ দেওয়ার ফলে কঠিন ব্যাপারও সহজ হয়ে যায়, আর তোমার উদাসীনতার কারণে সহজ জিনিসও কঠিন হয়ে যায়।)
আমি বললাম, “হুজুর! এই ব্যাখ্যা উচ্চস্তরের চিন্তার ফল হতে পারে না। হয়তো এটা স্বপ্নে দেখা কোনো বিষয়, অথবা কোনো ইলহামের (আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ইঙ্গিত) ফল।”
তিনি বললেন, “তুমি এটাকে ইলহামই মনে করো।”
আমি বললাম, “এই ইলহামের পেছনের প্রেক্ষাপট কী?”
তিনি বললেন, “আমি ফিলিস্তিনের খবর দেখছিলাম, তখন আমার মনে এ ধারণা এলো—
আরবরা ফিলিস্তিনিদের কুয়ায় ফেলে দিয়েছে, আর এখন ইহুদিরা তাদের কুয়া থেকে তুলে আমেরিকানদের হাতে বিক্রি করে দিচ্ছে।
তাই আমি বলবো:
ফিলিস্তিনিদের তাদের ভাইয়েরাই বিক্রি করেছে!”
——————–
# আলোচনা পর্যালোচনা /কথোপকথন # তাফসীর
লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।