AkramNadwi

ফিতনা ও মালাহিম সম্পর্কিত হাদিসের গবেষণা ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/5826

بسم الله الرحمن الرحيم.

|| প্রশ্ন:

মাকরামি ও মুহতারাম জনাব ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী মাদ্দাজিল্লাহুল আলী! আসসালামু আলাইকুম ও রহমতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।

হজরত মাওলানা আলী মিয়াঁ নদভী (রহ.) তার গ্রন্থ মারাকায়ে ঈমান ও মাদিয়াত (পৃষ্ঠা ১১৫)-এ “ফিতনা ও মালাহিম” সম্পর্কিত যে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন, যদি আপনার জ্ঞানে এ পর্যায়ের কোনো কাজ বিদ্যমান থাকে, তবে অনুগ্রহ করে দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।

আমি সবসময় আপনার সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করি। আশা করি, আপনি ভালো ও সুস্থ আছেন।

দোয়ার আবেদনকারী:
মুহাম্মদ জাকওয়ান নদভী
উইজডম ফাউন্ডেশন, লাখনউ
সম্পাদক, মাসিক ইশরাক হিন্দ

|| উত্তর:

ফিতনা ও মালাহিম সম্পর্কিত হাদিসের গবেষণার দুইটি দিক রয়েছে:

প্রথম দিক :

এই হাদিসগুলোর শ্রেণিবিন্যাস, অর্থাৎ ফিতনা ও মালাহিম সংক্রান্ত কোন হাদিসগুলো সহিহ এবং কোন হাদিসগুলো সহিহ নয়? এটি বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিসদের কাজ, এবং তারা এটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তী ব্যক্তিদের জন্য এ বিষয়ে কোনো অতিরিক্ত সংযোজনের সুযোগ নেই।

এই বিষয়ে সহিহ হাদিসগুলো কেবল সেগুলোই, যা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম-এ সংকলিত রয়েছে। ইমাম মুসলিম তার গ্রন্থে প্রচুর পরিমাণে হাদিসের অনুসরণ ও প্রমাণাদি সংগ্রহ করেছেন, যার বিভিন্ন দিক থেকে উপকারিতা রয়েছে। গবেষকদের মতে, সহিহ মুসলিম-এ কেবল সেই হাদিসগুলোই সহিহ, যেগুলো ইমাম মুসলিম তাবাকাত-ই উলা (প্রথম স্তরের) থেকে বর্ণনা করেছেন। এসব হাদিসকেই আহাদিসে উসুল (মূল হাদিস) বলা হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, সহিহ হাদিসগুলো কেবল সহিহ বুখারি-তে সংকলিত বা সহিহ মুসলিম-এর মূল হাদিসগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

কিছু মানুষ হাদিসকে সহিহ প্রমাণের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখান এবং এমনকি মুআল্লাল (গোপন ত্রুটিযুক্ত) ও শায (প্রত্যাখ্যাত) হাদিসগুলোকেও সহিহ বলে দেন। এজন্য হাদিস যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া জরুরি।

প্রকৃতপক্ষে, হজরত মাওলানা (রহ.) এখানে গবেষণা বলতে মুহাদ্দিসদের গবেষণাকে বোঝাননি। এই বিষয়ে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমের গবেষণার ওপর নির্ভর করা।

দ্বিতীয় দিক:

ফিতনা ও মালাহিম সংক্রান্ত হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা বা তাদের বাহ্যিক প্রয়োগ কী? অর্থাৎ, এগুলোর বাস্তবিক অর্থ কী? ইয়াজুজ-মাজুজ কারা? জুলকারনাইন যে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন, তা কোথায়? দাজ্জাল কে? ইত্যাদি।

বাহ্যিকভাবে মনে হয়, হজরত মাওলানা (রহ.) এর উদ্দেশ্য এই ধরনের গবেষণা। এই গবেষণা মানুষ সবসময় করে এসেছে এবং বর্তমান যুগে এর প্রতি প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। তবে, এই প্রচেষ্টার ফলে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, সেগুলো এতটাই পরস্পরবিরোধী যে এগুলোকে গবেষণা বলা ভুল হবে। বরং কিছু বিষয় এতটাই অবান্তর ও হাস্যকর যে, আমি পরামর্শ দেবো এগুলোর অধ্যয়নে সময় নষ্ট না করার জন্য।

এখানে অর্থ ও ব্যাখ্যা (তাওয়ীল) এর পার্থক্য বোঝা জরুরি। অর্থ মনের ধারণার সাথে সম্পর্কিত, আর ব্যাখ্যা বাহ্যিক বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত। যখন কুরআনে বলা হয় যে, “আল্লাহ তাআলা আরশের উপর সমুন্নত”, এর অর্থ একেবারে স্পষ্ট— অর্থাৎ, আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি উদাসীন হয়ে যাননি, বরং তাদের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা সরাসরি তাঁর হাতে রয়েছে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে আরশ কী এবং সমুন্নত হওয়া (ইস্তিওয়া) কিভাবে সংঘটিত হয়েছে, তা আমরা জানি না। আমরা এর অর্থ জানি, তবে এর প্রকৃত বাস্তবতা জানি না।

যখন ইউসুফ (আ.) স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রকে দেখলেন, তখন তার পিতা (ইয়াকুব আ.) এর একটি অর্থ বুঝলেন, যার মাধ্যমে তিনি অনুমান করলেন যে, এই স্বপ্ন ইউসুফ (আ.)-এর মহিমার প্রতি ইঙ্গিত করছে। তবে এর প্রকৃত ব্যাখ্যা তখনই স্পষ্ট হলো, যখন ইউসুফ (আ.)-এর পিতা ও ভাইয়েরা তার সামনে সিজদায় লিপ্ত হলেন। এ কারণেই তখন ইউসুফ (আ.) বলেছিলেন: “এই হলো আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা”।

ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর ভাষা সাধারণত স্বপ্নের মতো হয়ে থাকে। এদের অর্থ বিশেষজ্ঞরা বোঝেন, কিন্তু তাদের প্রকৃত ব্যাখ্যা তখনই প্রকাশ পায় যখন সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাস্তবে সংঘটিত হয়।

দাজ্জাল সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলো থেকে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) একটি অর্থ বুঝেছিলেন, তবে তারা এর প্রকৃত ব্যাখ্যা বুঝতে পারেননি। কিছু মানুষ ইবনে সাইয়াদকে দাজ্জাল মনে করতেন, আবার কেউ অন্য কিছু ভাবতেন। বর্তমান যুগে কিছু মানুষ মনে করে যে, দাজ্জাল সেই সামিরি ব্যক্তি, যে মুসা (আ.)-এর যুগে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

সঠিক কথা হলো, যখন দাজ্জাল বাস্তবে প্রকাশ পাবে, তখনই মানুষ এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর প্রকৃত ব্যাখ্যা বুঝতে পারবে। একই কথা ইয়াজুজ-মাজুজ ও অন্যান্য ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন এসব বাস্তবে সংঘটিত হবে, তখনই মানুষ তাদের প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে পারবে।

ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর উদ্দেশ্য কখনোই বাহ্যিক বাস্তবতাকে খুঁজে বের করা নয়। এগুলো কাউকে নবীও বানায় না।

একজন গবেষকের জন্য শোভনীয় আচরণ হলো, বিনয় অবলম্বন করা এবং এমন জ্ঞানের দাবি না করা যা তাকে প্রদান করা হয়নি। এ ধরনের দাবি বিভ্রান্তির সূচনা করে।

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে: যদি আমরা এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে না পারি, তাহলে এগুলোর উদ্দেশ্য কী?

এর উত্তর আমি বিস্তারিতভাবে এক প্রবন্ধে দিয়েছি। এর সংক্ষিপ্ত সারমর্ম হলো, এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর দুটি উপকারিতা রয়েছে:
একটি হলো এই যে, মুসলমানরা এই বিষয়গুলোর সামগ্রিক জ্ঞান রাখবে, যাতে যখন সেগুলো বাস্তবায়িত হবে, তখন তাদের ব্যাখ্যা বুঝতে সহজ হয়।
দ্বিতীয় হলো এই যে, প্রতিটি যুগের মুসলমানরা সর্বদা এই ভয় পোষণ করবে যে, কখন এই ফিতনাগুলো প্রকাশ পায় এবং তারা এর কবলে পড়ে যায়, ফলে তারা সবসময় আল্লাহর কাছে এই ফিতনাগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করবে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা এবং ঈমান ও আমলের উপর নির্ভর করবে না; বরং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করবে। যে আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে, সে সর্বদা দৃঢ় থাকে এবং নিরাপদ ও সুস্থ থাকে।

———————–

# হাদিস # ব্যখ্যা।

লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *